জিডিপির মতো অন্যান্য লক্ষ্যমাত্রা আমরা অর্জন করতে পারছি না কেন?
মোট দেশজ উৎপাদনে প্রবৃদ্ধির তথ্যের বাস্তবতা দেখতে হলে প্রথমেই দেখতে হবে এর ডাইরেকশন ঠিক আছে কি না। অর্থাৎ জিডিপির আকার আগের চাইতে বেড়েছে কি না।
বর্তমান সময়ের হাই ফ্রিকোয়েন্সি বৃদ্ধি সম্পর্কিত সূচক যেমন রপ্তানি, আমদানি, বেসরকারি খাতের ঋণ, বিনিয়োগ বা সঞ্চয়ের মত সূচকগুলোতে চলতি অর্থবছর আগের বছরের চাইতে ভালো অবস্থানে রয়েছে। এ হিসাবে জিডিপির আকার বৃদ্ধির তথ্যটি একেবারেই যৌক্তিক।
এখন প্রশ্ন হলো ৭.২৫% প্রবৃদ্ধির যে সংখ্যাটা প্রকাশ করা হয়েছে এটা কতটা গ্রহণযোগ্য। এখানে মোটা দাগে দুইটি প্রশ্ন চলে আসে।
চলতি অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার সময় সরকারের পক্ষ থেকে ৭.২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ঘোষণা করা হয়েছিল। পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাময়িক হিসাবে অর্জন এই লক্ষ্যের সঙ্গে আশ্চর্যজনকভাবে মিলে যাচ্ছে।
বাজেটের আগে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যটা অর্থ মন্ত্রণালয় ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় যৌথভাবেই দিয়ে থাকে। করোনার দুই বছর ছাড়া প্রতিবারই এর কাছাকাছি প্রবৃদ্ধি অর্জন হয়ে থাকে।
এখন প্রশ্ন হলো বাজেটে বেধে দেয়া ব্যয়, রাজস্ব আহরণ, উন্নয়ন ব্যয়, বিদেশি সহায়তা, ব্যাংক ঋণ ও সঞ্চয়পত্র বিক্রির মত লক্ষ্যগুলো কখনই পূরণ হয় না। জিডিপি প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে এত দক্ষতা থাকলে অন্যান্য সূচকে কেন থাকবে না?
দ্বিতীয় প্রশ্ন হলো জিডিপির প্রবৃদ্ধি মূলত কোন খাত থেকে এসেছে, এবং সেই খাতের সূচকগুলোর যৌক্তিকতা কতটুকু?
এবারের জিডিপি প্রবৃদ্ধি এসেছে শিল্প খাতের হাত ধরে, আর এতে মূল চালিকাশক্তির ভূমিকা রেখেছে ম্যানুফ্যাকচারিং সেক্টর।
ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের তিন উপখাতেই এবার প্রায় ১২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ২০২০ অর্থবছরে এই সব উপখাতে বড় ধস হওয়ায় গত বছরের ডাবল ডিজিট প্রবৃদ্ধি কিছুটা যৌক্তিক ছিল। এবার আরও বেশি প্রবৃদ্ধি কোথা থেকে আসল এই প্রশ্নটা থেকেই যায়।
প্রাক বাজেট আলোচনায় এফবিসিসিআই, এমসিসিআই, ডিসিসিআই, বিকেএমইর মতো ব্যবসায়ীদের সংগঠনগুলোর পাশাপাশি এসএমই ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কোভিডে সৃষ্ট খাদ থেকে তারা নিজেদের শতভাগ পুনরুদ্ধার করতে পারেনি। এই যুক্তিতে তারা কর হার কমানোসহ বিভিন্ন প্রণোদনা চেয়েছে। এই অবস্থায় প্রাক কোভিড পর্যায়ের প্রবৃদ্ধি কিছুটা অযোৗক্তিক মনে হচ্ছে।
এখন তো মনে হচ্ছে প্রণোদনার আর দরকার নেই। কারণ কুটির শিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, বৃহৎ শিল্প সবারই ডাবল ডিজিট গ্রোথ হয়েছে। বিদ্যুত ও গ্যাসে প্রবৃদ্ধি আগের বছরের চেয়ে কম প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এ অবস্থায় ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে ডাবল ডিজিট প্রবৃদ্ধি মেলানো যাচ্ছে না।
জিডিপির আকার বাড়লে মাথাপিছু আয়ও বাড়বে। এক্ষেত্রে বাড়তি মাথাপিছু আয় কতটা দরিদ্র মানুষের পক্ষে যায় সেটাই মূল বিবেচ্য বিষয়।
দরিদ্র মানুষের আয় বাড়লে তাদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে। এর ফলে দারিদ্র্য হারও কিছুটা কমে আসার কথা। তবে বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় দরিদ্র মানুষের সংখ্যা কমছে না।
সরকার এক কোটি পরিবারের জন্য কম দামে খাদ্য কেনার কার্ড চালু করেছে। টিসিবির পণ্য বিক্রয় কর্মসূচির আওতাও বেড়েছে। এরপরেও টিসিবির লাইনে মানুষের সংখ্যা কমছে না। নিম্ন মাধ্যম আয়ের লোকজনও লাইনে নেমে আসছে।
তৈরি পোশাক খাতের মালিকরা বলছেন, রপ্তানি বাড়লেও তাদের মুনাফা বাড়ছে না। মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির তুলনায় মজুরিও বেড়েছে কম হারে। তা হলে বাড়তি আয় কার কাছে গেল?
(দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের সিনিয়র স্টাফ করেসপন্ডেন্ট জাহিদুল ইসলামের সঙ্গে এ বিষয়ে ফোনে কথা বলেছেন ড. জাহিদ হোসেন )
