অপরাধ করলেন একজন, সাজা খাটছেন অন্যজন
মাঝরাতে ঘরের দরজায় ঠক ঠক শব্দে ঘুম ভাঙে জামসু’র। আধো ঘুমে চোখ কচলাতে কচলাতে ঘরের দরজা খুলে দেন তিনি। কিছু বুঝে ওঠার আগেই, তাকে ধরে নিয়ে যায় পুলিশের একটি দল।
জামসুকে এভাবে আটক করার ঘটনায় হতবিহবল হয়ে যায় তার স্ত্রী ও পুত্র। কারণ পরিবারের এই মানুষটিকে কেনো পুলিশ ধরে নিয়ে যাচ্ছে তা তাদের কাউকেই জানানো হয়নি।
যখন তারা জানতে পারে জামসুকে পুলিশ একটি যৌতুকের মামলায় গ্রেপ্তার করেছে তখন জামসুর ছেলে এবং শ্যালক থানায় গিয়ে পুলিশকে জানায়, এই মামলার সাথে আদতে জামসুর কোনও সম্পর্ক নেই। তবে তাদের সে আর্জি গ্রাহ্যই করেনি থানার পুলিশ।
যৌতুকের ওই মামলার আসামির সাথে শুধুমাত্র ‘নামের মিল’ থাকাতেই জামসুকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তবে জামসু যে আসলেই নির্দোষ সেটা বেরিয়ে আসে অনেক পরে।
আদলতের নির্দেশের পর পুলিশী তদন্তে প্রমাণ হয়, এই জামসু সেই জামসু নয়। ততদিনে সময় পেরিয়েছে ৩৪ দিন। বিনা কারণে এখনো জেল খাটছেন কিশোরগঞ্জের ইটনা থানার উদিয়া পাড়া গ্রামের এই ব্যক্তি।
যৌতুকের এই মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তিটির নাম জামসু মিয়া (৩৭)। দুই জামসুই একই গ্রামের বাসিন্দা।
২০১৫ সালে জামসু মিয়ার স্ত্রী মানসুরা খাতুন যৌতুক বিরোধী আইনে তার স্বামীর বিরুদ্ধে একটি মামলা করেন। সে মামলায় একবছরের জন্য সাজা খাটতে হয় জামসু মিয়াকে।
২০১৬ সালে জামসু মিয়া জামিনে জেল থেকে ছাড়া পেয়েই আফ্রিকার দেশ মরিশাসে চলে যান। মামলার বিচার কাজ ঝুলে থাকায় পরবর্তীতে ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট জামসু মিয়াকে গ্রেপ্তারে পরোয়ানা জারি করে।
গত ৭ আগস্ট সোর্সের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে ইটনা থানার পুলিশ ওই গ্রামে গিয়ে জামসু মিয়ার পরিবর্তে জামসুকে গ্রেপ্তার করে।
পরদিন ৮ আগস্ট স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের একজন সাবেক চেয়ারম্যান এবং আওয়ামী লীগের স্থানীয় একজন নেতা থানায় গিয়ে জামসুকে ‘ভুল কারণে’ গ্রেপ্তার করার বিষয়টি পুলিশকে জানান। তবে তাদের কথাও পুলিশ কানে নেন নি। বরং সেদিনই ইটনা থানার পুলিশ জামসুকে কিশোরগঞ্জ আদালতে পাঠিয়ে দেয়। এরপর আদালত জামসুকে জেলে পাঠায়। গত ৩৪ দিন জেলেই আছেন জামসু।
জামসুর আইনজীবী এডভোকেট তানজির সিদ্দিকী রিয়াদ ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে জামসুর মুক্তি এবং তাকে ভুল কারণে গ্রেপ্তার করার বিষয়ে তদন্তের আবেদন জানান।
জামসুর আইনজীবীর আবেদনের প্রেক্ষিতে গত ২৫ আগস্ট আদালত ইটনা থানাকে একটি কারণ দর্শানোর নোটিস দেয় এবং জামসুর পরিচয় নিশ্চিত করার নির্দেশ দেয়।
ইটনা থানা তাদের তদন্তে খুঁজে পায়, থানার এসআই আব্দুল হালিম ‘ভুল করে’ এক জামসুকে গ্রেপ্তার করতে গিয়ে অন্য জামসুকে গ্রেপ্তার করে।
ইটনা থানার ওসি মোরশেদ জামান এজন্য আদালতে ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং জামসুর মুক্তির আবেদন জানান।
গত ৯ সেপ্টেম্বর শুনানির দিন, জামসুর ছেলে তুষার অভিযুক্ত আসামির স্ত্রী মানসুরা খাতুনকে আদালতে নিয়ে আসেন। মানসুরা আদালতে বলেন, এই জামসু তার স্বামী না।
সেদিনই ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টের ম্যাজিস্ট্রেট মিল্লাত হোসেন জামসু’র মুক্তির আদেশ দেন।
তবে মুক্তির আদেশের পর আরও পাঁচ দিন পেরিয়ে গেলেও জামসু এখনো জেলেই আছেন। ঢাকার আদালতের এই আদেশের কপি কিশোরগঞ্জের আদালতে পৌঁছানোর পর তার ইটনা পুলিশ স্টেশনে পৌঁছাবে। এরপরই মুক্তি মিলবে বিনা দোষে জেল খাটা জামসুর।
