বাবা যখন বিজ্ঞানীদের বিষোদগার করছেন, কন্যা তখন আইসক্রিমের গল্প করছেন
"আজ জানলাম দারুণ মজার সানডে আইসক্রিমের উৎপত্তি এখানেই"– প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বড় মেয়ে এবং হোয়াইট হাউসের সিনিওর উপদেষ্টা ইভাঙ্কা ট্রাম্প উইসকনসিন অঙ্গরাজ্যের সবচেয়ে বড় শহর মিলওয়াকির আলোছায়ায় ঘেরা ছোট্ট এক স্টেজে এভাবেই আনন্দ প্রকাশ করেন।
আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেয়ার পর যাকে ট্রাম্পের পাশে সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে তিনি এই ইভাঙ্কা। ফার্স্ট লেডি মেলানিয়ার চাইতে অনেক বেশি সপ্রতিভ ছিলেন ইভাঙ্কাই। গতবারের মত এবারেও বাবার নির্বাচনী প্রচারণায় ইভাঙ্কা কাজ করে চলেছেন সামনের সারি থেকে।
হান্টার বাইডেন, হিলারি ক্লিনটন, বারাক 'হুসেইন' ওবামা , চীনা ভাইরাস, জাদুর কারসাজি, মিডিয়ার গুজব বা নির্বাচনে কারচুপির কোন উল্লেখ সেদিন তাঁর কথার ভেতরে উঠে আসেনি।
অথচ তার অনেক আগে থেকেই বাবা ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী জোসেফ আর. বাইডেনকে 'অপরাধী', হোয়াইট হাউজের রোগ সংক্রমণ বিশেষজ্ঞ অ্যান্থনি ফাউচিকে 'বিপর্যয়', সরকারি দলের বিজ্ঞানীদের 'গর্দভ' এবং সংবাদমাধ্যমের সদস্যবৃন্দকে 'প্রকৃত আবর্জনা' হিসেবে আখ্যায়িত করে চলেছেন!
"শুনেছি উইসকনসিনের বাসিন্দারা বছরে ২১ গ্যালনের মত আইসক্রিমই খায়"- ডিনারে লাল-মাংস রেখে বলা যায় ট্রাম্প কন্যা শুরুটাই করলেন ডেসার্ট দিয়ে।
কথার মাঝে জানালেন, শহরতলী ভ্রমণে এলে রাস্তা থেকে ছোটখাট স্যুভেনির সংগ্রহ করা চাই তাঁর। বাড়ি ফিরে সেগুলোই তুলে দেবেন তাঁর শিশু সন্তানদের কাছে।
"আমার বাচ্চারা তো এসব শুনে এখনই উইসকনসিনে চলে আসতে চায়। ভবিষ্যতে হয়ত এ শহরের অলিগলিতেই কুশনারদের দেখা মিলবে" – কথার জাদু ভালই শিখেছেন বলা যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা।
আলোচনা সভাটির টার্গেট ছিলেন মূলত শহরতলীর শ্বেতাঙ্গ নারীরা। ট্রাম্পের পুনর্নির্বাচিত হওয়ার ক্ষেত্রে উইসকনসিন, মিশিগান ও পেনসিলভানিয়া অঙ্গরাজ্যের ফলাফলকে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করছেন তাঁর উপদেষ্টারা। তবে প্রকৃত চিত্র হলো এবারে এসব শহরের উপকণ্ঠে বসবাসরত নারীরা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জোটকে এতটাই অবজ্ঞার চোখে দেখছেন যে ট্রাম্প সম্প্রতি অনেকটা তাদের কাছে হাত জোড়ের পর্যায়ে উপনীত হয়েছেন।
"আপনারা কি আমায় পছন্দ করবেন, শহরতলির নারীগণ?"-রাষ্ট্রপতি গত সপ্তাহে পেনসিলভানিয়ায় একটি সমাবেশে এভাবেই আবেদন করে ওঠেন সবার সামনে।
নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসছে আর এদিকে জনমত জরিপে কে কতটা এগিয়ে সেসব জানতে সারা দেশের লোকজন ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। গতবার যারা ট্রাম্পের শিবিরে কাজ করেছিলেন তাদের অনেকেই এবার মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন।
নিউ ইয়র্ক টাইমস ও সিয়েনা কলেজ কর্তৃক পরিচালিত একটি জরিপে, শতকরা ৫৬ ভাগ শ্বেতাঙ্গ নারী বলেছেন, তাঁরা বর্তমান রাষ্ট্রপতির প্রতি অত্যন্ত প্রতিকূল দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন।
এদের মধ্যে অনেক স্বতন্ত্র এবং প্রাক্তন রিপাবলিকান অন্তর্ভুক্ত, বর্তমানে যারা নিজেদের মধ্যপন্থী বা রক্ষণশীল হিসাবে পরিচয় দিচ্ছেন। রাষ্ট্রপতির অভব্য মন্তব্য ও আচরণের জন্য সম্ভাবনা রয়েছে, নির্বাচন বাকি থাকতেই আরো অনেকে ট্রাম্প শিবির থেকে বিদায় নেবেন।
শহরতলীর মার্জিত, রুচিশীল এবং অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর এসব নারী ভোটারের কাছে ভিড়তে তাই এমন মৃদু ও বন্ধুসুলভ প্রচারণা কৌশল ট্রাম্প কন্যার।
উইসকনসিনে যেমন ট্রাম্পের প্রতি গভীর ভক্তির মানুষ আছে তেমনি একদম বিপক্ষের বিরোধী মানুষেও এ অঙ্গরাজ্যপূর্ণ। অন্য রাজ্যগুলোর মতই এটিতে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং বিভক্তি।
প্রেসিডেন্টের সব কিছু দাবিয়ে নিজের করে নেয়ার যে প্রবণতা এবং গোলমেলে প্রচারণা, মিডিয়ার ওপর আক্রোশ সব মিলিয়ে এবারের নির্বাচন ট্রাম্পের জন্য যে সহজ হতে যাচ্ছেনা সেটি নিশ্চিত।
তবে উইসকনসিনের রিপাবলিকান, সিনেটর রন জনসন গত সপ্তাহান্তে জেনসভিলে ট্রাম্পের একটি সমাবেশে বলেছিলেন যে মি. বাইডেনের সমর্থকরা "বিশেষত আমেরিকাকে ভালবাসে না।"
হোয়াইট হাউসের প্রাক্তন কর্মকর্তা এবং ক্যাম্পেইন সারোগেট মার্সিডেজ শ্লাপকে ফ্রাঙ্কলিনে ট্রাম্প কন্যার আলোচনাসভা নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, "রাষ্ট্রপতিসহ তাঁর পরিবারের সবারই একেবারে ভিন্ন রকম প্রচারণা হবে এবার।"
সাক্ষাত্কারে মিস শ্লাপ ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষ নিয়ে আরো বলেন, "স্বল্প সময়ের ভেতরেই রাষ্ট্রপতি আমেরিকার জন্য কী কী করেছেন সে সম্পর্কে বলাটা গুরুত্বপূর্ণ,"
"মূলধারার গণমাধ্যমে যেসব গোলমেলে সংবাদ প্রচারিত হচ্ছে তাতে হারিয়ে না যাওয়াটাই শ্রেয়"।
কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেই কি সেসব গোলমালের জন্য দায়ী নন-এরপরেই শ্লাপকে পালটা প্রশ্ন করা হলে হাসতে হাসতে তিনি জানান, "দেখুন প্রেসিডেন্টের যদি কাউকে আঘাতও করার প্রয়োজন পড়ে তাহলে সে ব্যক্তির প্রতি তিনি সেই আচরণই করবেন"।
বিশ্বনেতাদের সঙ্গে বিভিন্ন সময় বাবার হয়ে সফর ও মিটিংয়ে অংশ নেয়া ট্রাম্প কন্যার নিজের গল্প রয়েছে এবং সেটি বলার ধরনটিও একান্তই তাঁর নিজস্ব।
" যা নিয়ে তোমার উৎসাহ তাতেই মনোনিবেশ করো। কারণ প্রকৃত সুখ সেখানেই পাবে"- বাবা শিখিয়েছেন ইভাঙ্কাকে। আলোচনা সভায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অনুকূলে যায় এমন বিষয়গুলোর দিকেই গুরুত্বারোপ করা উচিত ছিল তাঁর।
শহরের উপকন্ঠে শিশুদের জন্য স্কুল নির্ধারণে সংকট এবং শিক্ষাব্যবস্থায় সংস্কার নিয়ে তিনি অভিভাবকদের উদ্বিগ্নতার সাথে একাত্মতা প্রকাশ করতে পারতেন। করোনা মহামারী চলাকালীন শিক্ষার্থীদের যে ক্ষতি হয়েছে সে বিষয়ে আলোকপাত করতে পারতেন। আবার অভিবাসন, ক্যারাভান বা পারিবারিক বিচ্ছেদের মত ব্যাপারগুলো এড়িয়ে গেলে ভাল হতো।
"রাষ্ট্রপতি পরিবারের সদস্য হিসেবে একজন নির্বাচনী প্রচারণার মাঝেও কিছুটা মৃদু এবং হৃদয়স্পর্শী বক্তব্য দিতে পারে"- এমন মতামত গিল ট্রয়ের যিনি বিভিন্ন রাষ্ট্রপতি পরিবারের ওপর লেখনীর জন্য সুপরিচিত।
জনমতের সবটাই দুই মেরুতে আবদ্ধ হয়ে পড়েনি এখনো। সেসব মধ্যমপন্থী রিপাবলিকানদের জন্য ইভাঙ্কা কিছুটা আশ্বাসের প্রস্তাব দিতে পারেন যারা তাঁর বাবাকে পছন্দ না করলেও মিঃ বাইডেনকে এখনো সমর্থন করছেন না।
"ইভাঙ্কা প্রয়োজনে এভাবেও বলতে পারে যে, দেখুন যতটা আপনারা তাকে ভাবছেন, তিনি ততটাও মন্দ নন", পরামর্শের সুরে বলেন গিল।
"ঝড়ের মধ্যে যেন উলটো বন্দর হবার চেষ্টা করছে সে"। আসলে এখনকার প্রচারণাগুলোতে ভোটারদের নিজেদের শিবিরে ভেড়ানোর পরিবর্তে যেন বিপক্ষ দলকে আক্রমণটাই মুখ্য। গত সপ্তাহে ট্রাম্প পুত্র এরিক ট্রাম্পের প্রচারণার কর্কশ ভাষাই এর উদাহরণ।
ইভাঙ্কার কাছে শুরু থেকেই তাঁর পিতা এবং ভাইদের মত বিতর্ক এড়ানোর সুযোগ থাকলেও তাকে ঘিরে বিভিন্ন সময় সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। তাঁর নীতিহীনতা ও কাজকর্ম অনেকের কাছেই রীতিমত 'বিরক্তিকর' ঠেকেছে। তাঁর বক্তব্যকে সমালোচকেরা 'অপরামর্শ' হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
ইভাঙ্কা সমালোচিত হয়েছেন বিভিন্ন সময় তাঁর পিতার বিতর্কিত বিষয় নিয়ে নীরব থেকেও। আমেরিকার জনগণ কন্যার চাইতে ট্রাম্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী হিসেবে তাঁর ভূমিকা বেশি কামনা করেছে। ইভাঙ্কা আশ্চর্য কুশলতা দেখিয়েছেন বিস্মৃত আচরণেও! সীমান্ত এজেন্টদের দ্বারা অভিবাসী শিশুদের যখন জোর করে তাদের মায়েদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়া হচ্ছিল, সে সময় তিনি তাঁর নিজের দুই বছরের শিশুপুত্রকে জড়িয়ে ধরে আদরমাখা টুইট করেন যার জন্যে সমালোচকদের নিন্দার ঝড় ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে।
নির্বাচনী প্রচারণার বাইরে ইভাঙ্কা এবং তাঁর স্বামী জ্যারেড কুশনারের ব্যস্ততায় নতুন করে যোগ হয়েছে লিংকন প্রজেক্টের কুশীলবদের সাথে বাকবিতণ্ডা । সম্প্রতি এই ট্রাম্প পরিপন্থী জোটের লোকজন ইভাঙ্কা এবং জ্যারেডকে নিয়ে টাইমস স্কয়ারে বিলবোর্ড স্থাপন করেছে। ট্রাম্পের কন্যা ও জামাতা তাদের বিরুদ্ধে আইনী পদক্ষেপ নেবেন বলে জানিয়েছেন।
২০১৭ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনীতির মাঠে ইভাঙ্কা ট্রাম্পের হাতেখড়ি। সমালোচনার ভিড়ে প্রশংসাও কুড়িয়েছেন বিভিন্ন সময়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাবার মত হুটহাট কিছু পোস্ট করে বসেন না।
ফ্রাংকলিনের আলোচনা সভাতেও তাঁর নির্বাচনী আলোচনাসভা অনেক সমর্থকের কাছে ভাল লেগেছে।
"এত এত ইতিবাচক কথা শুনে মনে হলো যেন একবুক তাজা বাতাস টেনে নিলাম"- জো ক্রুপা নামক একজন উচ্ছ্বসিত সমর্থক নেভি ব্লু মাস্কের ভেতর থেকেই বলে ওঠেন। ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য যে বিদ্বেষ ভরে উঠেছে মানুষের মনে তার জন্য তিনি ডেমোক্র্যাটস এবং পক্ষপাতপূর্ণ আমেরিকান মিডিয়াকে দায়ী করেন।
এমনকি বাইডেনপুত্র হান্টার বাইডেন যে একটি ইউক্রেনীয় কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন, এটি তাঁর কাছে ওয়াটারগেটের চেয়েও বড় কেলেঙ্কারি হিসেবে মনে হয়! ট্রাম্পের যোগ্য সমর্থকই বলতে হয় ক্রুপা কে।
ফিরে আসা যাক ট্রাম্প-তনয়ার কাছেই।
"এই যে আপনি প্রতিদিন বিরোধীদের কাছ থেকে এত সমালোচনা সহ্য করছেন তা কেন করছেন? সমস্ত আক্রমণ, পক্ষপাতিত্ব, বিদ্বেষ এগুলো প্রতিদিন কীভাবে সামলান?- মার্সিডিজ শ্লাপ প্রশ্ন রাখেন ইভাঙ্কার প্রতি।
সংক্ষেপে ইভাংকা যা বললেন তার অর্থ এটিই যে, বাবার মতই তিনিও এসব নিছক ভালবাসার টানে সহ্য করে যান প্রতিনিয়ত।
"আমরা এই দেশকে আর দেশের মানুষকে ভালবাসি। সমস্ত নেতিবাচকতা, গোলমেলে বক্তব্য, রাষ্ট্রপতি ও তাঁর পরিবারকে কেন্দ্র করে গণমাধ্যমের পক্ষপাতিত্বপূর্ণ সংবাদ রচনা- সবকিছুর উর্ধ্বে আমাদের কাছে মানুষের ভালবাসাটাই মুখ্য"।
"ভালবাসা বাকি সব হিংসা, দ্বেষ, ক্ষতি পুষিয়ে দেয়"- একটু থেমে আবারো বক্তব্যে যোগ করেন তিনি।
ইভাঙ্কা নিজেও কী তাঁর বক্তব্যে চার বছর ধরে চলে আসা ট্রাম্প প্রশাসনের ব্যর্থতা এবং চলমান প্রচারণার অস্থির কৌশলগুলো তাঁর সেই সানডে আইসক্রিমের মতো মিষ্টতায় পুষিয়ে দিতে চাইছেন না!
- সূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস
