চরম মুদ্রাস্ফীতির সময়েই বিশ্বকাপ জিতেছে আর্জেন্টিনা: মেসি কি পারবেন সেই ‘মিথ’ ভাঙতে?
আজ নিজের ৩৯তম জন্মদিনে ফুটবল ইতিহাসে নতুন সব অধ্যায় লিখছেন লিওনেল মেসি। তবে আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসের দিকে তাকালে একটি অদ্ভুত ও নিষ্ঠুর সমান্তরাল চিত্র চোখে পড়ে—যতবারই আর্জেন্টিনা ফিফা বিশ্বকাপের ট্রফি উঁচিয়ে ধরেছে, দেশটির নাগরিকরা তখন পার করেছেন ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট বা মুদ্রাস্ফীতি।
১৯৭৮ সালে যখন আর্জেন্টিনা প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের স্বাগতিক হয় এবং শিরোপা জেতে, তখন দেশটিতে বার্ষিক মুদ্রাস্ফীতির হার ছিল ১৭৬ শতাংশ। ১৯৮৬ সালে যখন দিয়েগো ম্যারাডোনা আর্জেন্টিনাকে বিশ্বজয়ের স্বাদ এনে দেন, সে বছর গড় মুদ্রাস্ফীতি ছিল ১১৬ শতাংশ।
এরপর এলো কাতার বিশ্বকাপ ২০২২। আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনস আইরেসের রাস্তায় যখন লাখ লাখ মানুষ বিজয়ের আনন্দে মাতোয়ারা, সেই ডিসেম্বর মাসেই দেশটিতে বার্ষিক মুদ্রাস্ফীতির হার ছিল ৯৫ শতাংশ—যা ছিল তিন দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। অর্থনীতিবিদরা তখন ধারণা করেছিলেন এটি দ্রুতই তিন অঙ্কের ঘর ছাড়িয়ে যাবে। অর্থাৎ, দেশের অর্থনীতি যখন নিভৃতে পুড়ছিল, আর্জেন্টিনা তখন জিতেছিল বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম পুরস্কার।
এই অদ্ভুত ধারায় এবারই প্রথম ভিন্ন পরিস্থিতিতে বিশ্বকাপে অংশ নিচ্ছে আর্জেন্টিনা। ২০২৬ বিশ্বকাপে তারা শিরোপা ধরে রাখার লড়াইয়ে এমন এক সময়ে নেমেছে, যখন দেশটির মুদ্রাস্ফীতি আগের যেকোনো শিরোপাজয়ী বছরের তুলনায় নাটকীয়ভাবে কম। এখন প্রশ্ন উঠেছে—আর্জেন্টিনা কি তবে সেই 'অভিশাপ' বা মিথ ভেঙে এবারও চ্যাম্পিয়ন হতে পারবে?
রেকর্ড ভাঙার নেশায় মেসি
আজ ২৪ জুন, ২০২৬—ফুটবল বিশ্বের মধ্যমণি লিওনেল মেসির ৩৯তম জন্মদিন। এই টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই তিনি বিধ্বংসী ফর্মে রয়েছেন। উদ্বোধনী ম্যাচে আলজেরিয়ার বিপক্ষে তিনি বিশ্বকাপে নিজের প্রথম হ্যাটট্রিক করেন। এর মাধ্যমে তিনি জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসার করা বিশ্বকাপে ১৬ গোলের সর্বকালীন রেকর্ড স্পর্শ করেন।
এরপর অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল করে নিজের মোট গোলসংখ্যাকে ১৮-তে নিয়ে যান মেসি। এর মাধ্যমে তিনি ফিফা বিশ্বকাপের ইতিহাসে এককভাবে সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে বসেন। ৩৯তম জন্মদিনের কয়েক দিন আগেই আর্জেন্টিনার করা টুর্নামেন্টের পাঁচটি গোলের সবকটিই এসেছে তাঁর পা থেকে।
প্রেসিডেন্ট মিলের অধীনে স্বস্তিতে আর্জেন্টিনা
সরকারি পরিসংখ্যান সংস্থা ইনডেক-এর তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাসে আর্জেন্টিনার মুদ্রাস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৩৩.২ শতাংশ। ২০২৩ সালের শেষের দিকে প্রেসিডেন্ট জাভিয়ের মিলে যখন ক্ষমতায় আসেন, তখন মুদ্রাস্ফীতি ছিল ২০০ শতাংশের ওপরে। আকাশচুম্বী মূল্যবৃদ্ধি কমানো এবং দীর্ঘস্থায়ী রাজস্ব ঘাটতি দূর করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি। দুই বছর পর তাঁর কঠোর কৃচ্ছ্রসাধন নীতি ও সংস্কারের ফলে দেশটি এখন বিরল বাজেট উদ্বৃত্ত দেখছে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন করেছে।
ফুটবল: সব দুঃখ ভোলার মাধ্যম
আর্জেন্টাইনরা কেন কঠিন সময়ে ফুটবলকে আঁকড়ে ধরে, তার একটি বিশেষ কারণ রয়েছে। ব্লুমবার্গের প্রতিবেদন অনুযায়ী, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি আর্জেন্টিনার ইতিহাসের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, তবে এটি বিশ্বকাপ জয়ের কোনো গ্যারান্টি বা সূচক নয়। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৯০ সালে যখন মুদ্রাস্ফীতি প্রায় ২০০০ শতাংশ ছিল, তখন আর্জেন্টিনা ফাইনালে হেরেছিল। আবার ২০১৪ সালে যখন তারা হেরেছিল, তখন অফিশিয়াল মুদ্রাস্ফীতি ছিল মাত্র ২২ শতাংশ।
মাঠের বল যেমন মুদ্রার মান বোঝে না, গ্যালারির দর্শকও গান গাওয়ার আগে মুদ্রাস্ফীতির তথ্য যাচাই করে না। তবে ২০২৬ সালকে যা অনন্য করে তুলেছে, তা হলো লিওনেল মেসি। এটি মেসির ষষ্ঠ এবং নিশ্চিতভাবেই শেষ বিশ্বকাপ। ২০১৬ সালে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েও ফিরে আসা এবং এরপর ২০২১ সালে কোপা আমেরিকা ও ২০২২ সালে বিশ্বকাপ জয়ের মাধ্যমে তিনি নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। ৩৯ বছর বয়সেও মেসি বিশ্বকে মনে করিয়ে দিচ্ছেন কেন তিনি সর্বকালের অন্যতম সেরা—রেকর্ড ভাঙছেন আর প্রতিনিয়ত নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করছেন।
