Skip to main content
  • অর্থনীতি
  • বাংলাদেশ
  • আন্তর্জাতিক
  • খেলা
  • বিনোদন
  • ফিচার
  • ইজেল
  • মতামত
  • অফবিট
  • সারাদেশ
  • কর্পোরেট
  • চাকরি
  • প্রবাস
  • English
The Business Standard বাংলা

বলের পেছনে এক শতাব্দী: প্রাগৈতিহাসিক ফুটবল থেকে মারাকানার কান্না

আধুনিক যে ফুটবলকে নিয়ে দুনিয়াব্যাপী এত উন্মাদনা, তার আসল রূপটি তৈরি হলো ইংল্যান্ডের পাবলিক স্কুলগুলোতে। ঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে একেক স্কুল একেক নিয়মে খেলত। কেমব্রিজ আর অক্সফোর্ডের ছাত্ররা যখন একসঙ্গে খেলতে যেত, তখন নিয়ম নিয়ে মারামারি বেধে যেত। ঝগড়া-কাজিয়া লেগেই থাকত। কেউ কেউ বল হাতে নিয়ে রাগবির মতো দৌড়াত। কেউ কেউ শুধু পায়ে পায়ে খেলত। ১৮৬৩ সালে লন্ডনের এক সরাইখানায় বসে প্রথমবার ফুটবলের একটা ‘রুলবুক’ তৈরি হলো।
বলের পেছনে এক শতাব্দী: প্রাগৈতিহাসিক ফুটবল থেকে মারাকানার কান্না

ইজেল

পারভেজ নূরী
23 June, 2026, 10:50 pm
Last modified: 23 June, 2026, 10:49 pm

Related News

  • বিশ্বকাপের প্রথম হ্যাটট্রিক করেছিলেন এই মার্কিন ফুটবলার, নিজেও জানতেন না; জানা যায় ৭৬ বছর পর
  • মেসি সম্ভবত সর্বকালের সেরা ফুটবলার—তবু কেন বারবার পেনাল্টি মিস করেন?
  • বয়স ৩৯ ছুঁইছুঁই, তবুও এখনও যেভাবে সেই আগের মতোই অদম্য মেসি
  • ‘মনে হচ্ছে আর্জেন্টিনায় আছি’: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বড় পর্দায় মেসিদের খেলা দেখতে এসে আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রদূত
  • বিরল খনিজের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় ব্রাজিলকে কৌশলগত অংশীদার করছে ইইউ

বলের পেছনে এক শতাব্দী: প্রাগৈতিহাসিক ফুটবল থেকে মারাকানার কান্না

আধুনিক যে ফুটবলকে নিয়ে দুনিয়াব্যাপী এত উন্মাদনা, তার আসল রূপটি তৈরি হলো ইংল্যান্ডের পাবলিক স্কুলগুলোতে। ঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে একেক স্কুল একেক নিয়মে খেলত। কেমব্রিজ আর অক্সফোর্ডের ছাত্ররা যখন একসঙ্গে খেলতে যেত, তখন নিয়ম নিয়ে মারামারি বেধে যেত। ঝগড়া-কাজিয়া লেগেই থাকত। কেউ কেউ বল হাতে নিয়ে রাগবির মতো দৌড়াত। কেউ কেউ শুধু পায়ে পায়ে খেলত। ১৮৬৩ সালে লন্ডনের এক সরাইখানায় বসে প্রথমবার ফুটবলের একটা ‘রুলবুক’ তৈরি হলো।
পারভেজ নূরী
23 June, 2026, 10:50 pm
Last modified: 23 June, 2026, 10:49 pm

ফুটবল যখন যুদ্ধের মাঠ: আদি পর্বের গল্প

ফুটবলের আদি ইতিহাস খুঁজতে গেলে আমাদের খুব বেশি পেছনে তাকানোর দরকার নেই; কারণ, ফিফার অফিশিয়াল নথিপত্রই বলছে, এই খেলার প্রথম লাথিটা পড়েছিল প্রাচীন চীনে। আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে, হান রাজবংশের আমলে 'সু জু' নামে একটা খেলা হতো। চীনের জিবো শহরের সামরিক ছাউনিগুলোতে সেনাদের চাঙা রাখতে আর পায়ের জোর বাড়াতে চামড়ার বলের ভেতর পাখির পালক আর চুল ঢুকিয়ে দেওয়া হতো। লক্ষ্য ছিল বাঁশের তৈরি উঁঁচু জাল বা নেটের ভেতর বল গলানো। হাত লাগানো ছিল কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। সেই অর্থে ওই ছিল ফুটবলের প্রথম খসড়া। সামরিক শক্তির পরীক্ষা আর বিনোদনের এই মিশেলের মানিক জোড় যে একদিন গোটা দুনিয়াকে এক জায়গায় নিয়ে আসবে, তা তখন ভাবেনি কেউ ।

কিন্তু আধুনিক যে ফুটবলকে নিয়ে দুনিয়াব্যাপী এত উন্মাদনা, তার আসল রূপটি তৈরি হলো ইংল্যান্ডের পাবলিক স্কুলগুলোতে। ঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে একেক স্কুল একেক নিয়মে খেলত। কেমব্রিজ আর অক্সফোর্ডের ছাত্ররা যখন একসঙ্গে খেলতে যেত, তখন নিয়ম নিয়ে মারামারি বেধে যেত। ঝগড়া-কাজিয়া লেগেই থাকত। কেউ কেউ বল হাতে নিয়ে রাগবির মতো দৌড়াত। কেউ কেউ শুধু পায়ে পায়ে খেলত। ১৮৬৩ সালে লন্ডনের এক সরাইখানায় বসে প্রথমবার ফুটবলের একটা অলিখিত নিয়মকানুন বা 'রুলবুক' তৈরি হলো। সেখান থেকেই রাগবি আর অ্যাসোসিয়েশন ফুটবল আলাদা হয়ে গেল। ১৯০৪ সালে যখন প্যারিসে ফিফা গঠিত হলো, তখন থেকেই ফুটবল কর্তাদের মাথায় একটা ভূত চাপল—অলিম্পিকের বাইরে এমন একটা টুর্নামেন্ট করতে হবে, যেখানে শুধু ফুটবল দিয়েই দুনিয়া শাসন করা যাবে। ফিফার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জুলে রিমে এই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে নিজের জীবনের সর্বস্ব বাজি ধরেছিলেন। সেই স্বপ্নের ফসল হলো ১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপ। 

মন্টেভিডিওর উন্মাদনা: ১৯৩০ সালের প্রথম কামড়

প্রথম বিশ্বকাপ ফুটবল ইতিহাসের একমাত্র আসর, যা কোনো প্রকার কোয়ালিফাইং বা বাছাইপর্ব ছাড়াই অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং পুরো টুর্নামেন্টটি হয়েছিল মাত্র একটি শহরে—মন্টেভিডিও। উরুগুয়ে তাদের স্বাধীনতার শতবর্ষ উদযাপন করছিল, তাই তারা এই টুর্নামেন্ট আয়োজনের দায়িত্ব পায়। কিন্তু ইউরোপের দেশগুলোর নাক উঁচু স্বভাব এতে প্রকাশ পেল। আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে এত দূরে গিয়ে ফুটবল খেলতে অনেকেই রাজি ছিল না। তখনকার দিনে জাহাজে করে তিন সপ্তাহ সফর করা চাট্টিখানি কথা ছিল না। খেলোয়াড়দের ফর্ম নষ্ট হওয়ার ভয় ছিল, ক্লাবের আপত্তির মুখে পড়তে হচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত উরুগুয়ে সরকার সব দলের যাতায়াত আর থাকার খরচর বহনে রাজি হলো। তারপরও ইউরোপ থেকে মাত্র চারটা দেশ—ফ্রান্স, বেলজিয়াম, রোমানিয়া আর যুগোশ্লাভিয়া রাজি হলো অংশ নিতে। 

'এসএস কোত ভার্দে' নামক এক বিশাল জাহাজে চড়ে জুলে রিমে স্বয়ং ট্রফি বগলে নিয়ে দলবলসহ লাতিন আমেরিকার উদ্দেশে রওনা দিলেন। তেরোটা দল নিয়ে শুরু হলো ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপ।

এক হাতের ফরোয়ার্ডের রূপকথা

উরুগুয়ে দলের অন্যতম সেরা অস্ত্র ছিলেন হেক্টর কাস্ত্রো। শৈশবে একটা ইলেকট্রিক করাত দিয়ে কাঠ কাটার সময় তার ডান হাতের কনুইয়ের নিচের অংশ কাটা পড়েছিল। সেই থেকে তার নাম হয়ে যায় 'এল মানকো' বা এক হাতা। শারীরিক এই খামতি কাস্ত্রোকে দমাতে পারেনি। তার ড্রিবলিং আর গোল করার ক্ষমতা দেখে বিপক্ষ ডিফেন্ডাররা ভড়কে যেত। গ্রুপপর্বের প্রথম ম্যাচে পেরুর বিরুদ্ধে একমাত্র জয়সূচক গোলটি তিনিই করেছিলেন। আর ফাইনালের গল্পটা তো আরও অবিশ্বাস্য। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে যখন খেলা ৩-২ স্কোরলাইনে টানটান উত্তেজনায় কাঁপছে, ঠিক ৮৯ মিনিটের মাথায় এক হাতা কাস্ত্রো হেডের মাধ্যমে গোল করে আর্জেন্টিনার কফিনে শেষ পেরেকটি পুঁতে দেন। ৪-২ গোলে ম্যাচ জিতে প্রথম বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় উরুগুয়ে। কাস্ত্রো প্রমাণ করেছিলেন, ফুটবলের জন্য আস্ত দুটো হাতের চেয়ে একটা আস্ত কলিজার বেশি প্রয়োজন। সারা মন্টেভিডিও সেদিন এই এক হাতা বীরের নামে জয়ধ্বনি দিয়েছিল।

উরুগুয়ের এক হাতের ফুটবলার হেক্টর কাস্ত্রো।

বল নিয়ে মারামারি আর দুই বলের ফাইনাল

ফাইনাল ম্যাচের আগেই আর্জেন্টিনা আর উরুগুয়ের মধ্যে তীব্র মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছিল। উরুগুয়ের সমর্থকেরা বেলজিয়ান রেফারি জন ল্যাঙ্গেনাসকে প্রাণনাশের হুমকি পর্যন্ত দিয়েছিল। আর্জেন্টিনা থেকে হাজার হাজার সমর্থক বুয়েনস এইরেস থেকে নদী পার হয়ে মন্টেভিডিওতে আসছিল। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত ছিল যে স্টেডিয়ামের গেটে দর্শকদের তল্লাশি করে শত শত রিভলভার আর পিস্তল বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল। রেফারি ল্যাঙ্গেনাস এতটাই আতঙ্কে ছিলেন, তিনি মাঠে নামার আগে শর্ত দিয়েছিলেন—ম্যাচ শেষ হওয়ার ঠিক এক ঘণ্টার মধ্যে যেন একটা দ্রুতগামী স্টিমার বন্দরে তার জন্য প্রস্তত অবস্থায় রাখা হয়। কেন? হ্যাঁ, উরুগুয়ে হারলে ক্ষুব্ধ দর্শকদের হাত থেকে বাঁচতে তিনি স্টিমার চেপে সোজা দেশ ছেড়ে পালাতে পারেন। 

সবচেয়ে বড় গ্যাড়াকলটা লাগল বল নিয়ে। আর্জেন্টিনা বলল, তারা তাদের দেশে তৈরি বল দিয়ে খেলবে। উরুগুয়ের দাবি, বল হবে তাদের। খেলাপূর্ব সভায় বলের বিষয় নিয়ে প্রায় বলপ্রয়োগের মতো পরিস্থিতির তৈরি হলো। দুই দেশের কর্মকর্তারা প্রায় হাতাহাতিতে জড়িয়ে যাবেন যে কোনো সময়। রেফারি বিপদে পড়ে এক অভিনব সমাধান দিলেন। টসের মাধ্যমে ঠিক হলো, প্রথমার্ধে খেলা হবে আর্জেন্টিনার বল দিয়ে।  আর দ্বিতীয়ার্ধে ২২ জনের লাথির ধকল সামলাবে উরুগুয়ের বল।

ব্রাজিলের ঐতিহাসিক মারাকানা ফুটবল স্টেডিয়াম; ১৯৫০-এর বিশ্বকাপে ব্রাজিল-উরুগুয়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত ফাইনাল ম্যাচ।

মজার ব্যাপার হলো, প্রথমার্ধে যখন আর্জেন্টিনার বল দিয়ে খেলা চলল, তখন আর্জেন্টিনা তাদের হালকা আর চেনা বলের সুবিধা নিয়ে ২-১ ব্যবধানে রইল এগিয়ে। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে যখন উরুগুয়ের ভারী আর শক্ত বলটা মাঠে নামানো হলো, তখন পাশা উল্টে গেল। উরুগুয়ের খেলোয়াড়েরা নিজেদের বল চমৎকারভাবেই চিনে। লাথির মুখে বলের আচরণ সম্পর্কে জানে। কাজেই এই জ্ঞান আর অভিজ্ঞতার পায়ে পায়ে পথ চিনে একের পর এক আক্রমণ করে আরও ৩টি গোল দিয়ে বসল। বলের এই অদ্ভুত রাজনীতি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা কৌতুক হয়ে আছে।

কার্লোস গারদেলের গান এবং একজন পাগলাটে ডাক্তার

আর্জেন্টিনার বিখ্যাত ট্যাঙ্গো গায়ক কার্লোস গারদেল ছিলেন তখনকার সুপারস্টার। দুই দেশের খেলোয়াড়দের ওপর মানসিক চাপ এত বেশি ছিল, গারদেল টুর্নামেন্ট শুরুর আগে আর্জেন্টিনা এবং উরুগুয়ে—উভয় দলের হোটেলেই হাজির হয়েছিলেন। তিনি জানতেন এই দুই প্রতিবেশী দেশের ফুটবল দ্বৈরথ কতটা ভয়ানক হতে পারে। তিনি দুই দলের জন্যই গান গেয়ে শোনান, যাতে মাঠে কোনো রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ না বেধে যায়। যদিও মাঠের ভেতর লাথালাথি কম হয়নি। ফাউলের পর ফাউল চলায় মাঠের আবহাওয়া সব সময় গরম থাকত।

আর্জেন্টিনার বিখ্যাত ট্যাঙ্গো গায়ক কার্লোস গারদেল ছিলেন তখনকার সুপারস্টার।

আরেকটার ঘটনা: আর্জেন্টিনা আর আমেরিকার মধ্যকার সেমিফাইনাল ম্যাচে আমেরিকার এক খেলোয়াড় মারাত্মক চোট পান। মার্কিন দলের ট্রেনার বা ডাক্তার জ্যাক কোল মাঠের ভেতর দৌড়ে আসেন রেফারির ওপর ক্ষোভ ঝাড়তে। তার ধারণা ছিল, রেফারি ইচ্ছে করে আর্জেন্টিনার ফাউল ধরছেন না। রাগের মাথায় তিনি ওষুধের ব্যাগটা মাঠের ওপর আছাড় মারেন। ব্যাগের ভেতর থাকা ক্লোরোফর্মের বোতল ভেঙে গিয়ে গ্যাস ছড়াতে শুরু করে। রেফারি তো দূরে সরলেনই, স্বয়ং মার্কিন ডাক্তার নিজেই সেই গ্যাসের ঝাঁজে অচেতন হয়ে মাঠের ওপর ধপাস করে পড়ে যান। পরে স্ট্রেচারে করে আহত খেলোয়াড়ের বদলে অজ্ঞান ডাক্তারকেই মাঠের বাইরে নিয়ে যেতে হয়েছিল, যা দেখে গ্যালারির দর্শকেরা হেসেই খুন।

ইতালির কালো ছায়া: ১৯৩৪ এবং মুসোলিনির বুট

১৯৩৪ সালের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ ফুটবল খেলার চেয়ে বেশি ছিল একনায়ক বেনিতো মুসোলিনির ফ্যাসিবাদী প্রচারণা। মুসোলিনি খুব ভালো করেই বুঝেছিলেন, ইতালির জনগণকে এক পতাকার তলে আনতে আর নিজের ক্ষমতা জাহির করতে ফুটবলের চেয়ে বড় অস্ত্র আর নেই। তিনি রোমের রাস্তায় রাস্তায় বিশাল পোস্টার সাঁটলেন, যেখানে ফুটবলারদের পাশাপাশি ফ্যাসিস্ট স্যালুটের ছবি ছিল। তিনি স্পষ্ট বলে দিয়েছিলেন, ইতালিকে এই বিশ্বকাপ জিততেই হবে, যেকোনো মূল্যে। এটা কোনো অনুরোধ ছিল না, ছিল এক স্বৈরাচারীর হুকুম। এবং ইতালি চোকোস্লোভাকিয়াকে ২-১ গোলে ফাইনালে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল।

ওরিয়ুন্দি বিতর্ক ও রেফারিদের কাঁপুনি

ইতালিকে জেতাতে মুসোলিনি এক নতুন ফন্দি খাটালেন। আর্জেন্টিনার বেশ কয়েকজন বিশ্বমানের খেলোয়াড়, যেমন লুইস মন্টি, রাইমুন্ডো ওরসি আর এনরিকে গুয়াইতা—যাদের পূর্বপুরুষ ইতালীয় ছিলেন, তাদের জোর করে রাতারাতি ইতালির নাগরিকত্ব দেওয়া হলো। এদের বলা হতো 'ওরিয়ুন্দি'। লুইস মন্টি তো চার বছর আগে আর্জেন্টিনার হয়ে উরুগুয়ের বিরুদ্ধে ফাইনাল খেলেছিলেন, এবার তিনি খেললেন ইতালির নীল জার্সিতে। মন্টির ওপর চাপ এত বেশি ছিল যে তিনি পরে বলেছিলেন, '১৯৩০ সালে উরুগুয়েতে আমাকে হুমকি দেওয়া হয়েছিল—হারলে মেরে ফেলা হবে, আর ১৯৩৪ সালে ইতালিতে হুমকি দেওয়া হলো জিততে না পারলে মেরে ফেলা হবে!'

মুসোলিনির ভয়ে রেফারিদের অবস্থা ছিল করুণ। ম্যাচের আগের দিন মুসোলিনি রেফারিদের নিজের প্রাসাদে ডেকে নৈশভোজ করাতেন, যা ছিল আসলে একধরনের প্রচ্ছন্ন হুমকি। কোয়ার্টার ফাইনালে স্পেনের বিরুদ্ধে ইতালির ম্যাচটি ছিল রীতিমতো কুস্তির ময়দান। ইতালির খেলোয়াড়দের একের পর এক ফাউল রেফারি রেনে মার্সেট দেখেও না দেখার ভান করেছিলেন। স্পেনের সাতজন খেলোয়াড় সেই ম্যাচে আহত হয়ে মাঠ ছাড়েন, যার মধ্যে কিংবদন্তি গোলকিপার রিকার্ডো জামোরাও ছিলেন। ম্যাচটি ড্র হওয়ার পর পরের দিন রি-প্লে ম্যাচে ইতালি ১-০ গোলে জেতে। স্প্যানিশরা অভিযোগ করেছিল, রেফারি নিজেই ইতালির হয়ে খেলছিলেন। টুর্নামেন্ট শেষে স্পেনের আপত্তির মুখে ফিফা ওই রেফারিকে আজীবন নিষিদ্ধ করতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু ইতালির ততক্ষণে সেমিফাইনালে টিকিট পাকা।

'জিতবে না হলে মরবে

ফাইনালে চেকোস্লোভাকিয়ার মুখোমুখি হওয়ার আগে ইতালির ড্রেসিংরুমে মুসোলিনির কাছ থেকে একটা সংক্ষিপ্ত বার্তা এসেছিল—'উইন অর ডাই' (জেতো অথবা মরো)। এটা কোনো রূপক কথা ছিল না, ইতালির কোচ ভিত্তোরিও পোজো এবং খেলোয়াড়েরা জানতেন, হারলে তাদের কপালে সোজা সাইবেরিয়ার বন্দিশালা বা ফায়ারিং স্কোয়াড জুটবে। ইতালির খেলোয়াড়েরা মাঠে নেমেছিলেন জীবনের সবচেয়ে বড় জুয়া খেলতে।

মুসোলিনি।

খেলার ৭১ মিনিটের মাথায় চেকোস্লোভাকিয়া যখন গোল করে এগিয়ে যায়, তখন পুরো স্টেডিয়ামে শ্মশানের নীরবতা নেমে এসেছিল। ভিআইপি বক্সে বসা মুসোলিনির মুখ কালো হয়ে গিয়েছিল, তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠেছিল। কিন্তু মৃত্যুর ভয় মানুষকে দিয়ে অলৌকিক কিছু করিয়ে নিতে পারে। শেষ মুহূর্তের ঠিক নয় মিনিট আগে ইতালির ওরসি এক দুর্দান্ত শটে গোল শোধ করেন এবং খেলা অতিরিক্ত সময়ে গড়ায়। অতিরিক্ত সময়ে ডঞ্জেলো স্কিয়াভিও জয়সূচক গোলটি এনে দেন। ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজার সাথে সাথে ইতালির খেলোয়াড়েরা যেভাবে কেঁদেছিলেন, তা আনন্দের কান্না ছিল না, ওটা ছিল জীবন ফিরে পাওয়ার স্বস্তি। তারা জানতেন, কাপ জেতার মাধ্যমে তারা আসলে নিজেদের প্রাণটা বাঁচিয়ে বাড়ি ফিরতে পারছেন।

ফ্রান্স ১৯৩৮: বারুদের স্তূপের ওপর ফুটবল

১৯৩৮ সালের তৃতীয় বিশ্বকাপ যখন ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, তখন পুরো ইউরোপ একটা জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি। এডলফ হিটলারের নাৎসি বাহিনী তত দিনে অস্ট্রিয়া দখল করে নিয়েছে। স্পেনে চলছে গৃহযুদ্ধ। রাজনীতির এই নোংরা থাবা থেকে ফুটবলও রেহাই পায়নি। ফিফা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে এবারও টুর্নামেন্ট ইউরোপে হবে, যার প্রতিবাদে আর্জেন্টিনা ও উরুগুয়ে এই আসর বয়কট করে। লাতিন আমেরিকা থেকে কেবল ব্রাজিল অংশ নেয়।

অস্ট্রিয়ার অন্তর্ধান ও সিনডেলারের একগুঁয়েমি

অস্ট্রিয়ার ভুন্ডারটিম (বিস্ময়কর দল বা জাদুকরি দল) বা দানুবিয়ান স্কোয়াড (দানিয়ুব নদীর নামে এ নামকরণ করা হয়)  ছিল তখনকার ইউরোপের অন্যতম সেরা ফুটবল শক্তি। তারা অনায়াসে বিশ্বকাপের যোগ্যতা অর্জন করেছিল। কিন্তু হিটলারের জার্মানি অস্ট্রিয়াকে মানচিত্র থেকে মুছে দেওয়ার পর নির্দেশ এল—থার্ড রাইখের শ্রেষ্ঠত্ব ফুটবল মাঠেও প্রমাণ করা যায়, তাই অস্ট্রিয়ার সব খেলোয়াড়কে জার্মানির হয়ে খেলতে হবে।

কিন্তু অস্ট্রিয়ার ফুটবল জাদুকর ম্যাথিয়াস সিনডেলার, যাকে তার হালকা গড়ন আর অবিশ্বাস্য ড্রিবলিংয়ের জন্য 'ফুটবলের মোজার্ট' বলা হতো, তিনি নাৎসি জার্সিতে খেলতে সাফ মানা করে দিলেন। তিনি বুক চিতিয়ে বলেছিলেন, যে দেশ আমার মাতৃভূমিকে গিলে খেয়েছে, তাদের স্বৈরাচারী পতাকার নিচে আমি লাথি দেব না। তিনি চোটের বাহানা করে জার্মান ক্যাম্পে যাননি। এর মাত্র কয়েক মাস পর, ১৯৩৯ সালের শুরুতে সিনডেলারকে তার অ্যাপার্টমেন্টে রহস্যজনকভাবে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। সরকারিভাবে বলা হয়েছিল, কার্বন মনোক্সাইড গ্যাসের বিষক্রিয়া, কিন্তু অনেকেই বিশ্বাস করেন, নাৎসিদের অবাধ্য হওয়ার মাশুল তাকে নিজের জীবন দিয়ে দিতে হয়েছিল। তিনি হয়ে ওঠেন ফুটবলের প্রথম রাজনৈতিক আত্মোৎসর্গকারী।

খালি পায়ে জাদুকর লিওনিদাস

এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর দল ছিল ব্রাজিল। আর তাদের প্রধান সেনাপতি ছিলেন লিওনিদাস দা সিলভা, যাকে দুনিয়া চিনত 'ব্ল্যাক ডায়মন্ড' বা 'রবার ম্যান' নামে। বাইসাইকেল কিকের জনক বলা হয় এই লিওনিদাসকে। পোল্যান্ডের বিরুদ্ধে নকআউট পর্বের এক ম্যাচ চলাকালীন আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামল। ফ্রান্সের স্ট্রাসবার্গের মাঠ মুহূর্তের মধ্যে কাদার সাগরে পরিণত হলো। লিওনিদাসের মনে হলো ভারী চামড়ার বুট পরে এই কাদায় ড্রিবলিং করা যাচ্ছে না, বল পায়ে আটকানো যাচ্ছে না। তিনি মাঠের মধ্যেই বুট জোড়া খুলে সাইডলাইনের বাইরে ছুড়ে ফেলে দিলেন।

খালি পায়ে খেলা ব্রাজিলের লিওনিদাস।

এরপর খালি পায়ে কাদার ভেতর নাচতে নাচতে পোলিশ ডিফেন্ডারদের বোকা বানিয়ে একটা দর্শনীয় গোল করলেন। রেফারি প্রথমে খেয়াল না করলেও পরে যখন দেখলেন, ব্রাজিলের ১০ নম্বর খালি পায়ে দৌড়াচ্ছে এবং তার পা কাদায় মাখামাখি, তখন তিনি খেলা থামিয়ে লিওনিদাসকে আবার বুট পরতে বাধ্য করেন। রেফারি বলেছিলেন খালি পায়ে খেললে নিয়মের লঙ্ঘন হবে। সেই ম্যাচে ব্রাজিল ৬-৫ ব্যবধানে জিতেছিল এবং লিওনিদাস একাই করেছিলেন হ্যাটট্রিকসহ ৪ গোল। খালি পায়ের সেই গোলের গল্প ফুটবল লোকগাথার অংশ হয়ে আছে।

প্যান্ট খসে পড়া পেনাল্টি

সেমিফাইনালে ব্রাজিলের মুখোমুখি হয়েছিল চ্যাম্পিয়ন ইতালি। ইতালির অধিনায়ক ছিলেন কিংবদন্তি জিউসেপ্পে মেয়াজ্জা (যার নামে আজ মিলানের বিখ্যাত স্টেডিয়াম)। ব্রাজিল কোচ এতটাই আত্মবিশ্বাসী ছিলেন যে তিনি লিওনিদাসকে এই ম্যাচে বিশ্রাম দিয়েছিলেন ফাইনালের জন্য বাঁচিয়ে রাখতে, যা ছিল এক মস্ত বড় ভুল। ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে ইতালি যখন একটা পেনাল্টি পেল, তখন মেয়াজ্জা শট নেওয়ার জন্য এগিয়ে এলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে তার শর্টসের ইলাস্টিক বা ফিতে ছিঁড়ে গেল। মেয়াজ্জা দমে যাওয়ার পাত্র ছিলেন না। তিনি এক হাত দিয়ে শর্টস বা প্যান্ট ধরে রেখেই মেপে মেপে দৌড়ে এসে শট নিলেন এবং ব্রাজিলের গোলকিপারকে পরাস্ত করে বল জালে জড়ালেন।

মেয়াজ্জা হাফ প্যান্ট খামচে ধরে পেনাল্টি শট নিচ্ছেন।

গোল করার পর তার সতীর্থরা যখন তাকে জড়িয়ে ধরতে এলেন, তখন মেয়াজ্জা দুই হাত দিয়ে প্যান্ট টেনে ধরে রাখায় এক হাস্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। এই গোলের ওপর ভর করেই ইতালি ২-১ গোলে জিতে ফাইনালে যায় এবং পরে হাঙ্গেরিকে ৪-২ ব্যবধানে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়। জুলে রিমে ট্রফিটি তারা আবার রোমে নিয়ে যায় এবং বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইতালির ফুটবল ফেডারেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ওত্তোরিনো বারাসি ট্রফিটি হিটলারের নাৎসিদের হাত থেকে বাঁচাতে পুরো যুদ্ধের সময়টা নিজের বিছানার নিচে একটা জুতো রাখার বাক্সে লুকিয়ে রেখেছিলেন।

ব্রাজিল ১৯৫০: মারাকানার সেই নীরবতা যা দেশটাকে বদলে দিয়েছিল

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে দীর্ঘ ১২ বছর বিশ্বকাপ বন্ধ ছিল। ১৯৪২ আর ১৯৪৬ সালের আসর নস্যাৎ হয়ে যাওয়ার পর ১৯৫০ সালে যখন টুর্নামেন্ট আবার আলোর মুখ দেখল, তখন আয়োজক হওয়ার সাহস দেখাল কেবল লাতিন আমেরিকার দেশ ব্রাজিল। যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউরোপ তখন নিজেদের ঘর গোছাতে ব্যস্ত, তাদের স্টেডিয়ামগুলো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। ইংল্যান্ড এবারই প্রথম অহংকার ভেঙে বিশ্বকাপে অংশ নিতে রাজি হলো, যদিও তারা গ্রুপপর্বে আমেরিকার কাছে হেরে বিদায় নিয়েছিল।

এই টুর্নামেন্টের নিয়মটা ছিল বেশ অদ্ভুত। এখনকার মতো কোনো প্রথাগত সেমিফাইনাল বা ফাইনাল ম্যাচ তখন ছিল না। চার গ্রুপের সেরা চার দল—ব্রাজিল, উরুগুয়ে, স্পেন ও সুইডেনকে নিয়ে গড়া হয়েছিল একটা চূড়ান্ত গ্রুপ বা 'ফাইনাল রাউন্ড'। নিয়ম ছিল, এই চার দল একে অপরের মুখোমুখি হবে এবং লিগ শেষে যে দলের পয়েন্ট সবচেয়ে বেশি থাকবে, তারাই হবে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। তবে ভাগ্যের পরিহাসে লিগের একেবারে শেষ ম্যাচে মুখোমুখি হলো ব্রাজিল আর উরুগুয়ে, আর সেই ম্যাচটাই রূপ নিল অঘোষিত এক ফাইনালে।

বিশ্বকাপ উপলক্ষে রিও ডি জেনিরোতে ব্রাজিল তৈরি করে পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ফুটবল স্টেডিয়াম—মারাকানা। প্রায় দুই লাখ মানুষের ধারণক্ষমতাসম্পন্ন এই কংক্রিটের দানবটি ছিল ব্রাজিলের উদীয়মান অর্থনৈতিক ও ফুটবল শক্তির প্রতীক। ফাইনাল রাউন্ডের প্রথম দুই ম্যাচে সুইডেনকে ৭-১ এবং স্পেনকে ৬-১ গোলে উড়িয়ে দিয়ে ব্রাজিল দল তখন আকাশে উড়ছিল। তাদের আটকানোর সাধ্য কারও আছে বলে মনে হতো না। শেষ ম্যাচে উরুগুয়ের বিরুদ্ধে ব্রাজিলের দরকার ছিল মাত্র একটা ড্র। উরুগুয়ে যদি জিততে না পারে, তবে ট্রফি ব্রাজিলের।

ইতালির ফ্যাসিস্ট স্যালুট।

ব্রাজিলিয়ানদের আত্মবিশ্বাস তখন অহংকারে রূপ নিয়েছে। ম্যাচের আগের দিন রিওর মেয়র জনসমক্ষে ঘোষণা করে দিলেন, 'তোমরা যারা নিজেদের চ্যাম্পিয়ন ভাবছ, আমি তাদের স্যালুট জানাই।' স্থানীয় পত্রিকাগুলো ম্যাচের সকালের সংস্করণে ব্রাজিলের খেলোয়াড়দের ছবি ছেপে হেডলাইন দিল—'এরাই আমাদের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন'। প্রায় বিশ লাখ চ্যাম্পিয়নশিপ মেডেল আগে থেকেই তৈরি করে রাখা হয়েছিল, যাতে ব্রাজিলের প্রত্যেক খেলোয়াড়ের নাম খোদাই করা ছিল। পুরো রিও শহরে কার্নিভালের আবহ, মানুষ রাস্তায় নেমে নাচছিল, জয় উদযাপনের জন্য হাজার হাজার আতশবাজি কিনে রাখা হয়েছিল।

উরুগুয়ে দলের অধিনায়ক ওব্দুলিও ভ্যারেলা ছিলেন এক অন্য ধাতুতে গড়া মানুষ। তিনি জানতেন, মানসিক লড়াইয়ে হেরে গেলে মাঠের লড়াইয়ে জেতা অসম্ভব। ম্যাচের দিন সকালে হোটেলের লবিতে যখন ব্রাজিলের পত্রিকাগুলো উরুগুয়ের খেলোয়াড়দের দেখানো হলো, যেখানে ব্রাজিলকে আগেই চ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করা হয়েছে, তখন দলের তরুণেরা কিছুটা ঘাবড়ে গিয়েছিলেন। ভ্যারেলা তখন নিজের পকেটের টাকা দিয়ে সব কটি পত্রিকা কিনে এনে হোটেলের বাথরুমে নিয়ে যান এবং সতীর্থদের বলেন, 'এগুলোর ওপর গিয়ে মূত্রত্যাগ করো। এরা আমাদের অপমান করেছে।'

তিনি ড্রেসিংরুমে দলটিকে গোল হয়ে দাঁড় করিয়ে বলেছিলেন, 'বাইরে দুই লাখ মানুষ চিৎকার করছে করুক, ওগুলো স্রেফ কাঠের পুতুল। মাঠে খেলা হবে এগারোজনের বিরুদ্ধে এগারোজন। তোমরা যদি ওদের দিকে না তাকিয়ে শুধু বলের দিকে তাকাও, তবে ওরাই কাঁপবে। আমরা এখানে হারতে আসিনি।' ভ্যারেলার এই সিংহের মতো গর্জন উরুগুয়ের খেলোয়াড়দের রক্তে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল।

প্রেস্টনের ন্যাশনাল ফুটবল মিউজিয়ামে ১৯৩০ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ ফাইনালে ব্যবহৃত ফুটবল। উরুগুয়ের বেছে নেওয়া এই বলটি ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে ব্যবহার করা হয়েছিল।

মারাকানাজো: দুই লাখ মানুষের সমাধি: ১৬ জুলাই ১৯৫০। মারাকানায় অফিশিয়াল হিসাবে দর্শক ছিল ১ লক্ষ ৭৩ হাজার ৮৫০ জন, কিন্তু বাস্তবে তা ২ লাখ ছাড়িয়ে গিয়েছিল। মানুষ গাদাগাদি করে দাঁড়িয়েছিল, বসার কোনো জায়গা ছিল না। পুরো স্টেডিয়াম তখন সাদা জার্সির বন্যায় ভাসছে।

খেলার ৪৭ মিনিটে ব্রাজিলের ফ্রিয়াকা যখন প্রথম গোলটা করলেন, তখন মারাকানার ছাদ ফেটে যাওয়ার উপক্রম। পটকা, তুবড়ি আর গগনবিদারী চিৎকারে উরুগুয়ে দল যেন হারিয়ে যাওয়ার জোগাড়। কিন্তু সিংহের মতো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রইলেন ভ্যারেলা। তিনি চতুরতার সাথে বলটা বগলে নিয়ে রেফারির কাছে গিয়ে অফসাইডের অজুহাতে তর্ক জুড়ে দিলেন। তিনি জানতেন, রেফারি ইংরেজি বোঝেন না, তা-ও তিনি সময় নষ্ট করতে লাগলেন। প্রায় দুই মিনিট তিনি খেলা বন্ধ রাখলেন। এই দুই মিনিটে স্টেডিয়ামের সেই আদিম উন্মাদনা কিছুটা থিতিয়ে এল, দর্শকেরা শান্ত হলো আর ব্রাজিলের খেলোয়াড়দের আক্রমণের সেই ধারালো ছন্দটা কেটে গেল। এটাই ছিল ভ্যারেলার মস্ত বড় চাল।

৬৬ মিনিটে উরুগুয়ের জুয়ান আলবার্তো শিয়াফিনো এক দুর্দান্ত ক্রসে পা ছুঁইয়ে গোল করে ম্যাচ ১-১ সমতায় নিয়ে এলেন। তখনো ব্রাজিল চ্যাম্পিয়ন; কারণ, ড্র করলেই তাদের চলবে। ব্রাজিলিয়ানরা ভাবল ঠিক আছে, ম্যাচ তো ড্র হচ্ছেই। কিন্তু আসল নাটক বাকি ছিল ৭৯ মিনিটে। উরুগুয়ের উইঙ্গার আলসিডেস ঘিঘিয়া বল নিয়ে ডান প্রান্ত দিয়ে বিদ্যুতের গতিতে ব্রাজিলের ডি-বক্সে ঢুকে পড়লেন। ব্রাজিলের গোলকিপার মোয়াসির বারবোসা ভেবেছিলেন, ঘিঘিয়া হয়তো সেন্টারিং বা ক্রস করবেন মাঝখানে থাকা শিয়াফিনোর উদ্দেশ্যে; কারণ, আগের গোলটা ওভাবেই হয়েছিল। বারবোসা একটু এগিয়ে এলেন ক্রস ব্লক করতে, নিজের পজিশন ছেড়ে দিলেন।

মকির বারবোসাকে ফাঁকি দিয়ে বল জালে ঢুকে যাচ্ছে।

কিন্তু ঘিঘিয়া ছিলেন ধূর্ত। তিনি ক্রস না করে বারবোসা আর গোলপোস্টের মাঝখানের ওই সামান্য ফাঁক গলে একটা মাটিঘেঁষা জোরালো শট নিলেন। বল যখন ব্রাজিলের জালের ভেতর গিয়ে ছটফট করছে, ঠিক সেই মুহূর্তে পুরো মারাকানা স্টেডিয়াম এক লহমায় স্তব্ধ হয়ে গেল। ফুটবল ইতিহাসে একে বলা হয় 'মারাকানাজো' (The Maracanazo) বা মারাকানার বিপর্যয়। দুই লাখ মানুষের সেই বিশাল সমাগম এতটাই চুপ হয়ে গিয়েছিল, বলা হয় একটা মাছি উড়লে তার ডানার শব্দও শোনা যেত। ঘিঘিয়া পরবর্তীকালে একটা বিখ্যাত ইন্টারভিউতে বলেছিলেন, 'ইতিহাসে মাত্র তিনজন মানুষ এক শটে মারাকানাকে স্তব্ধ করতে পেরেছে—পোপ ফ্রাঙ্কিস, ফ্রাঙ্ক সিনাত্রা আর আমি।' (এখানে তিনি মূলত তিনটি ভিন্ন জগতের 'সবচেয়ে প্রভাবশালী' ব্যক্তিত্বের তুলনা টেনেছেন: পোপ: খ্রিষ্টধর্মের সর্বোচ্চ ধর্মীয় গুরু। পোপ যখন হাত তোলেন বা কথা বলেন, তখন লক্ষ লক্ষ মানুষ শ্রদ্ধা আর শান্তিতে চুপ হয়ে যায়। ফ্রাঙ্ক সিনাত্রা: বিংশ শতাব্দীর আমেরিকার ইতিহাসের অন্যতম জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী পপ গায়ক। তিনি যখন মঞ্চে গান শুরু করতেন, তখন হাজার হাজার উন্মাতাল দর্শক এক মায়াবী মোহাবিষ্টতায় শান্ত হয়ে যেত। (১৯৮০ সালে এই মারাকানা স্টেডিয়ামেই সিনাত্রার কনসার্টে ১ লক্ষ ৭৫ হাজার মানুষ স্তব্ধ হয়ে তার গান শুনেছিল)। আলসিডেস ঘিগিয়া (নিজে): একজন সাধারণ ফুটবলার, যিনি কোনো ধর্মীয় বাণী বা সুরের মায়াজাল ছাড়াই, কেবল তার পায়ের 'একটি শটে' ২ লক্ষ মানুষের উৎসবকে একনিমেষে কান্নায় রূপ দিয়ে পুরো স্টেডিয়ামকে স্তব্ধ করে দিয়েছিলেন।)

ম্যাচের বাকি সময়ে ব্রাজিল আর গোল শোধ করতে পারেনি। রেফারি যখন শেষ বাঁশি বাজালেন, তখন ব্রাজিলিয়ান খেলোয়াড়েরা মাঠের ওপর আছাড় খেয়ে কাঁদতে লাগলেন। গ্যালারিতে বসে থাকা অনেকে হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হন বলেও খবর ছিল। জুলে রিমে নিজে এত অবাক হয়েছিলেন যে তিনি উরুগুয়েকে ট্রফি দেওয়ার জন্য কোনো আনুষ্ঠানিক মঞ্চ খুঁজে পাননি, ভিড়ের মধ্যে ভ্যারেলার হাতে ট্রফিটা গুঁজে দিয়ে কেটে পড়েছিলেন।

বারবোসার চিরদিনের অভিশাপ

উরুগুয়ে ২-১ গোলে ম্যাচ জিতে দ্বিতীয়বারের মতো জুলে রিমে ট্রফি ঘরে তুলল। কিন্তু এই ম্যাচ ব্রাজিলের গোলকিপার বারবোসার জীবনকে নরক বানিয়ে দিয়েছিল। ব্রাজিলিয়ানরা এই পরাজয়কে কোনো সাধারণ ফুটবল ম্যাচ হিসেবে নেয়নি, ওটা ছিল তাদের জাতীয় মর্যাদার অবমাননা, এক চিরকালীন কলঙ্ক। আর এর সমস্ত দোষ চাপানো হলো কালো চামড়ার গোলকিপার বারবোসার ওপর। সমাজ তাকে একঘরে করে দিল। মানুষ রাস্তায় তাকে দেখলে আঙুল উঁচিয়ে বলত, 'ঐ দেখো, যে লোকটা পুরো ব্রাজিলকে কাঁদিয়েছিল।'

মকির বারবোসা সারা জীবনের জন্য ভিলেনে পরিনত হলেন।

১৯৯৩ সালে ব্রাজিল দল যখন আবার বিশ্বকাপের প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখন বারবোসা ক্যাম্পে গিয়েছিলেন খেলোয়াড়দের শুভকামনা জানাতে। কিন্তু তৎকালীন কোচ মারিও জাগালো তাকে অপয়া বলে ক্যাম্প থেকে বের করে দিয়েছিলেন। মৃত্যুর কিছুদিন আগে বারবোসা আক্ষেপ করে বলেছিলেন, 'ব্রাজিলের আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি হলো ত্রিশ বছরের জেল। কিন্তু আমি একটা ভুলের জন্য বিগত পঞ্চাশ বছর ধরে শাস্তি পাচ্ছি, যে অপরাধ আমি একাকী করিনি। আমার দেশের মানুষ আমাকে ক্ষমা করতে পারেনি।' ২০০০ সালে যখন বারবোসা হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান, তখন তার পকেটে একটা কানাকড়িও ছিল না, আর সমাজ তাকে আমৃত্যু একজন অপরাধী হিসেবেই দূরে ঠেলে রেখেছিল।

ব্রাজিলের সাদা জার্সির চিরবিদায়

মারাকানার এই ট্র্যাজেডিকে লাতিন আমেরিকার ফুটবল ইতিহাসে 'মারাকানাজো' (The Maracanazo) বলে ডাকা হয়। এই পরাজয়ের ধাক্কা এত তীব্র ছিল, ব্রাজিল দল সিদ্ধান্ত নিল এই সাদা জার্সিটাই অপয়া, এর মধ্যেই সমস্ত অমঙ্গল লুকিয়ে আছে। সাদা কাপড়ের ওপর নীল কলার দেওয়া যে জার্সি পরে তারা মাঠে নেমেছিল, তা চিরদিনের জন্য নিষিদ্ধ করা হলো। তারা ঠিক করল, দেশের পতাকার রঙের সাথে মিলিয়ে নতুন জার্সি তৈরি করা হবে।

এক দেশব্যাপী প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ১৯৫৩ সালে ব্রাজিলের এক উনিশ বছর বয়সী তরুণ ডিজাইনার চার্লস শ্যাল্ড তৈরি করলেন সবুজ-হলুদ আর নীলের মিশ্রণে তৈরি সেই বিখ্যাত 'ক্যানারিনহো' বা লিটল ক্যানারি জার্সি। ১৯৫৪ সালের সুইজারল্যান্ড বিশ্বকাপ থেকে ব্রাজিল এই নতুন জার্সি পরে খেলতে নামে, যা পরবর্তী সময়ে পেলের হাত ধরে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে চেনা এবং ভীতিজাগানিয়া পোশাকে পরিণত হয়। সাদা জার্সি বিসর্জনের মাধ্যমেই যেন ব্রাজিলের ফুটবলে এক নতুন সূর্যোদয় ঘটেছিল।

মারাকানা ফুটবল স্টেডিয়াম।

প্রথম বিশ্বকাপের সেই আদিম ও বুনো জোশ থেকে শুরু করে মারাকানার বুকভাঙা কান্না—ফুটবল বিশ্বকাপের এই ইতিহাস আমাদের এটাই শেখায়, এই খেলা কখনোই শুধু বাইশটা পায়ের আর একটা চামড়ার বলের গল্প ছিল না। এটা ছিল যুদ্ধ, স্বৈরাচারীদের দাপট, বেঁচে থাকার লড়াই আর কোটি মানুষের আবেগের এক মহাকাব্যিক পানিপথ। প্রতিটি ম্যাচের ঘাসের নিচে চাপা পড়ে আছে কত শত চেনা-অচেনা মানুষের দীর্ঘশ্বাস, কান্না আর বীরত্বের ইতিহাস, যা এই টুর্নামেন্টকে সাধারণ একটা খেলার ঊর্ধ্বে নিয়ে গেছে।

১৯৩০ সালের মন্টেভিডিওর সেই এক হাতের ফরোয়ার্ডের লড়াই থেকে শুরু করে ২০২২ সালের কাতারের মরুভূমির বুকে মেসির রাজকীয় ট্রফি জয়—বিশ্বকাপ ফুটবল কেবলই মাঠের জয়-পরাজয় নয়। এটি আসলে মানুষের টিকে থাকার গল্প। যেখানে এক টুকরো চামড়ার বলের সমান্তরালে মিশে থাকে কোটি মানুষের কান্নার পানিপথ, একনায়কদের রক্তচক্ষু, মাফিয়াদের বুলেট আর কিছু সাধারণ মানুষের অমর বীরে পরিণত হওয়ার এক জীবন্ত মহাকাব্য।

Related Topics

টপ নিউজ

মারাকানা / মারাকানা ট্র্যাডেজি / ব্রাজিল / ফুটবল / ফুটবল বিশ্বকাপ / ইতালি / আর্জেন্টিনা

Comments

While most comments will be posted if they are on-topic and not abusive, moderation decisions are subjective. Published comments are readers’ own views and The Business Standard does not endorse any of the readers’ comments.

MOST VIEWED

  • প্রতীকী ছবি: সংগৃহীত
    ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভূমিকম্প, উৎপত্তিস্থল নারায়ণগঞ্জ
  • ৭১,৮৫০ কোটি টাকার ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পে বিদেশি ঋণ খুঁজছে সরকার
    ৭১,৮৫০ কোটি টাকার ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পে বিদেশি ঋণ খুঁজছে সরকার
  • ছবি: টিবিএস
    খুলনার পুনর্বাসন কেন্দ্রে ১৯ দিন, খাবার মুখে তোলেনি খান জাহান আলীর দিঘির বিরল কুমির
  • সদ্য পদত্যাগ করা ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ও লেবার পার্টির নেতা কিয়ার স্টারমার। ছবি: লিওন নিল
    ১০ বছরে ৭ প্রধানমন্ত্রী: ব্রিটেনে কেন এই অস্থিতিশীলতা?
  • স্যাটেলাইট থেকে তোলা ছবিতে দেখা যাচ্ছে ইরানের প্রধান জ্বালানি তেল রপ্তানিকেন্দ্র খারগ দ্বীপের তেলের টার্মিনাল। ছবি: প্ল্যানেট ল্যাবস/ ভায়া রয়টার্স
    চূড়ান্ত চুক্তি নিয়ে আলোচনার মাঝেই ইরানের তেল বিক্রির অনুমতি দিল যুক্তরাষ্ট্র
  • সাবেক মন্ত্রী হাসানুল হক ইনু ও রাশেদ খান মেননকে একই আদালতে হাজির করা হয়। ছবি: টিবিএস
    'লাল-সবুজ' খাতায় আদালতের মামলার হিসাব রাখছেন; ইনুর বক্তব্য ‘হুমকি’র শামিল: আইনজীবী

Related News

  • বিশ্বকাপের প্রথম হ্যাটট্রিক করেছিলেন এই মার্কিন ফুটবলার, নিজেও জানতেন না; জানা যায় ৭৬ বছর পর
  • মেসি সম্ভবত সর্বকালের সেরা ফুটবলার—তবু কেন বারবার পেনাল্টি মিস করেন?
  • বয়স ৩৯ ছুঁইছুঁই, তবুও এখনও যেভাবে সেই আগের মতোই অদম্য মেসি
  • ‘মনে হচ্ছে আর্জেন্টিনায় আছি’: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বড় পর্দায় মেসিদের খেলা দেখতে এসে আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রদূত
  • বিরল খনিজের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় ব্রাজিলকে কৌশলগত অংশীদার করছে ইইউ

Most Read

1
প্রতীকী ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশ

ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভূমিকম্প, উৎপত্তিস্থল নারায়ণগঞ্জ

2
৭১,৮৫০ কোটি টাকার ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পে বিদেশি ঋণ খুঁজছে সরকার
বাংলাদেশ

৭১,৮৫০ কোটি টাকার ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পে বিদেশি ঋণ খুঁজছে সরকার

3
ছবি: টিবিএস
বাংলাদেশ

খুলনার পুনর্বাসন কেন্দ্রে ১৯ দিন, খাবার মুখে তোলেনি খান জাহান আলীর দিঘির বিরল কুমির

4
সদ্য পদত্যাগ করা ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ও লেবার পার্টির নেতা কিয়ার স্টারমার। ছবি: লিওন নিল
আন্তর্জাতিক

১০ বছরে ৭ প্রধানমন্ত্রী: ব্রিটেনে কেন এই অস্থিতিশীলতা?

5
স্যাটেলাইট থেকে তোলা ছবিতে দেখা যাচ্ছে ইরানের প্রধান জ্বালানি তেল রপ্তানিকেন্দ্র খারগ দ্বীপের তেলের টার্মিনাল। ছবি: প্ল্যানেট ল্যাবস/ ভায়া রয়টার্স
আন্তর্জাতিক

চূড়ান্ত চুক্তি নিয়ে আলোচনার মাঝেই ইরানের তেল বিক্রির অনুমতি দিল যুক্তরাষ্ট্র

6
সাবেক মন্ত্রী হাসানুল হক ইনু ও রাশেদ খান মেননকে একই আদালতে হাজির করা হয়। ছবি: টিবিএস
বাংলাদেশ

'লাল-সবুজ' খাতায় আদালতের মামলার হিসাব রাখছেন; ইনুর বক্তব্য ‘হুমকি’র শামিল: আইনজীবী

The Business Standard
Top

Contact Us

The Business Standard

Main Office -4/A, Eskaton Garden, Dhaka- 1000

Phone: +8801847 416158 - 59

Send Opinion articles to - oped.tbs@gmail.com

For advertisement- sales@tbsnews.net

Copyright © 2022 THE BUSINESS STANDARD All rights reserved. Technical Partner: RSI Lab