তৈরি পোশাক শিল্পে সংকট: বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় দরকার প্রযুক্তিনির্ভর ও পরিবেশবান্ধব শিল্পকারখানা
তৈরি পোশাক শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশ আসে এই খাত থেকেই।
নানা কারণে বর্তমানে তৈরি পোশাক শিল্প সংকটের মুখে দাঁড়িয়েছে। পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক বাস্তবতায় কেবল 'সস্তা শ্রম'-এর ওপর নির্ভর করে টিকে থাকার দিন শেষ হয়ে আসছে। ২০২৬ সালে এলডিসি উত্তরণ, শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি এই খাতকে নতুন করে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে গ্রিন কারখানা, রোবোটিক্স, এআই এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-চালিত কোয়ালিটি কন্ট্রোল বা মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এখন আর বিলাসিতা নয়, অপরিহার্যতা।
বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান ধরে রাখতে হলে এখনই সুনির্দিষ্ট ও কৌশলগত কর্মপরিকল্পনা বা রোডম্যাপ গ্রহণ করতে হবে। এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো গ্রিন কারখানা। একটি সাধারণ কারখানাকে গ্রিন ফ্যাক্টরি বা পরিবেশবান্ধব কারখানায় রূপান্তর করতে মূলত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত লিডারশিপ ইন এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ডিজাইন (এলইইডি) সার্টিফিকেশনের মানদণ্ড এবং স্থানীয় পরিবেশগত আইন অনুসরণ করতে হয়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো জ্বালানি সাশ্রয়, কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং প্রাকৃতিক সম্পদের টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করা।
বিশ্ববাজারে টিকে থাকতে আরও বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ বাস্তবায়ন করতে হবে। বর্তমান শ্রমিকদের রি-স্কিলিং (নতুন কাজের দক্ষতা অর্জন) এবং আপ-স্কিলিং (বিদ্যমান দক্ষতার উন্নয়ন) করতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে (পিপিপি) বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে। সেখানে শ্রমিকদের রোবোটিক্স, ডিজিটাল প্যাটার্ন মেকিং এবং অটোমেটেড মেশিন পরিচালনার প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
বাংলাদেশে ইতোমধ্যে বিশ্বমানের বেশ কিছু পরিবেশবান্ধব কারখানা রয়েছে। এই সংখ্যা আরও বাড়াতে হবে এবং ধাপে ধাপে সব কারখানাকে পরিবেশবান্ধব কারখানায় রূপান্তর করতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন হলে মাঝারি ও ক্ষুদ্র কারখানাগুলোকে গ্রিন ফ্যাক্টরিতে রূপান্তরের জন্য স্বল্প সুদে ব্যাংকঋণের ব্যবস্থা করতে হবে।
বিশ্বের বড় ব্র্যান্ডগুলোর কাছে পরিবেশবান্ধব পোশাকের চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। বাংলাদেশকে 'গ্রিন ম্যানুফ্যাকচারিং'-এর বৈশ্বিক হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। গ্রিন ফ্যাক্টরি তৈরিতে শুরুতে বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি বিদ্যুৎ ও পানির খরচ প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনতে পারে। ফলে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকা সহজ হয়।
শ্রমের ক্রমবর্ধমান ব্যয়, ভূ-রাজনৈতিক কারণে সরবরাহশৃঙ্খলের ওপর চাপ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও রোবোটিক অটোমেশনের দ্রুত বিকাশ এই খাতের সামনে যেমন নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে, তেমনি সম্ভাবনারও নতুন দ্বার খুলে দিয়েছে। বিশ্ববাজারে টিকে থাকতে হলে বাংলাদেশকে কম মূল্যের শ্রমভিত্তিক মডেল থেকে বেরিয়ে এসে প্রযুক্তিনির্ভর ও পরিবেশবান্ধব শিল্পকারখানায় রূপান্তর করতে হবে।
শুধু টি-শার্ট বা ট্রাউজারের মতো বেসিক পোশাকে সীমাবদ্ধ না থেকে উচ্চমূল্যের বাজারে প্রবেশ করতে হবে। সুতির কাপড়ের পাশাপাশি ম্যান-মেড ফাইবার যেমন পলিয়েস্টার, নাইলন ও সিনথেটিক কাপড়ের পোশাক তৈরিতে জোর দিতে হবে। স্পোর্টসওয়্যার, টেকনিক্যাল টেক্সটাইল, যেমন অগ্নিপ্রতিরোধক পোশাক ও মেডিকেল গাউন, এবং শীতকালীন জ্যাকেটের মতো উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদনেও গুরুত্ব দিতে হবে।
বাংলাদেশের এখন অন্যতম প্রধান সমস্যা গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট। বিদ্যুৎ সংকটের কারণে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে অথবা উৎপাদন সীমিত করতে বাধ্য হয়েছে। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল স্থাপন করতে হবে এবং কারখানাগুলোতে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়াতে হবে।
একই সঙ্গে পানি সাশ্রয়ের জন্য 'জিরো লিকুইড ডিসচার্জ' ও ইটিপি প্রযুক্তির শতভাগ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। পোশাক তৈরির পর অবশিষ্ট ঝুট বা উচ্ছিষ্ট কাপড় ফেলে দেওয়া কিংবা স্বল্প মূল্যে বিক্রি না করে সেগুলো থেকে নতুন সুতা ও কাপড় তৈরি করতে হবে।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে নতুন একটি হুমকি হলো রোবোটিক্স ও অটোমেশনের উত্থান। উন্নত দেশগুলো এখন 'নিয়ার-শোরিং' বা নিজেদের কাছাকাছি দেশে স্বয়ংক্রিয় রোবট ব্যবহার করে পোশাক তৈরি করছে। এটি বাংলাদেশের ভৌগোলিক দূরত্বের যে সুবিধা ছিল, সেটিকেও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে।
একই সঙ্গে ফাস্ট ফ্যাশনের ধরনও বদলে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং বিগ ডেটা ব্যবহার করে বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলো দ্রুত পরিবর্তনশীল ফ্যাশন ট্রেন্ড অনুসরণ করছে।
দ্রুততম সময়ে পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য বৈশ্বিক বাজারে এক ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। এ কারণে প্রযুক্তিনির্ভর মেশিনের ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
এআই-চালিত থ্রিডি ডিজাইনিং এবং অটোমেটেড কাটিং মেশিনের ব্যবহার বাড়াতে হবে। এতে একদিকে ফেব্রিকের অপচয় সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামবে, অন্যদিকে দ্রুত স্যাম্পল তৈরি করা সম্ভব হবে।
জটিল সেলাইয়ের কাজ এবং নিখুঁত কোয়ালিটি চেকিংয়ের জন্য রোবোটিক আর্ম ও কম্পিউটার ভিশন প্রযুক্তিরও প্রবর্তন করতে হবে। বিদেশি ডিজাইনারদের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশেই আন্তর্জাতিক মানের ডিজাইন ইনস্টিটিউট ও আরঅ্যান্ডডি সেন্টার গড়ে তুলতে হবে।
শিল্পের কাঁচামাল আমদানি থেকে শুরু করে শিপমেন্ট পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া ডেটা-চালিত সাপ্লাই চেইনের মাধ্যমে পরিচালিত করতে হবে। এ জন্য ব্লকচেইন ও ইআরপি সফটওয়্যারের ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
কারখানাগুলোতে অটোমেশন বাড়লে সাধারণ শ্রমিকদের একটি অংশ কর্মসংস্থান হারাতে পারে। এ কারণে দক্ষ ও প্রযুক্তিবান্ধব শ্রমিক তৈরি করতে হবে। সাধারণ অপারেটরদের অটোমেটেড মেশিন পরিচালনা, কম্পিউটার-চালিত ডিজাইন এবং রক্ষণাবেক্ষণের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে বিজিএমইএ, বিকেএমইএ এবং সরকারি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়ে দেশব্যাপী 'আরএমজি স্কিল ডেভেলপমেন্ট হাব' তৈরি করতে হবে।
ব্যবস্থাপনা স্তরেও প্রযুক্তিবিদ ও টেকনিক্যাল ম্যানেজার তৈরি করতে হবে। উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বা টেকনিক্যাল ম্যানেজারের ক্ষেত্রে বিদেশি নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় গ্র্যাজুয়েটদের তৈরি করতে হবে। এর ফলে দেশের অভ্যন্তরেই বিশাল অঙ্কের রেমিট্যান্স ধরে রাখা সম্ভব হবে। প্রযুক্তির কারণে কিছু প্রথাগত চাকরি হারালেও দক্ষ টেকনিশিয়ান ও মেশিন অপারেটরদের মতো নতুন উচ্চ আয়ের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ পণ্যের গুণগত মান বাড়ায় এবং অপচয় কমায়। অটোমেশন ও টেকসই রূপান্তর কোনো বিলাসিতা নয়। এটি বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের টিকে থাকার লড়াই। সস্তা শ্রমের একক সুবিধা থেকে বেরিয়ে প্রযুক্তি ও পরিবেশবান্ধব সক্ষমতার মেলবন্ধন ঘটাতে পারলে বাংলাদেশ আগামী দশকের বৈশ্বিক ফ্যাশন শিল্পে শীর্ষস্থানীয় অবস্থান আরও সুসংহত করতে পারবে।
'মেইড ইন বাংলাদেশ'-কে নতুন রূপে বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরতে হবে। বাংলাদেশ কেবল 'সস্তা উৎপাদনকারী' দেশ নয়, 'নিরাপদ, টেকসই ও উন্নত মানের' পোশাক উৎপাদনকারী দেশ—এই পরিচয় বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
বিশ্ববাজারে টিকে থাকতে হলে বাংলাদেশকে কম মূল্যের পোশাক উৎপাদনকারী দেশ থেকে একটি প্রযুক্তিনির্ভর, পরিবেশবান্ধব এবং উচ্চমানের পোশাক উৎপাদনকারী হাবে রূপান্তরিত হওয়া এখন সময়ের দাবি।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: নিবন্ধের বিশ্লেষণটি লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও পর্যবেক্ষণের প্রতিফলন। অবধারিতভাবে তা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর অবস্থান বা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়।
