বিনিয়োগে স্থবিরতা, আস্থা ফেরানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ
বিনিয়োগে স্থবিরতা দেশের অর্থনীতিতে এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ। নতুন শিল্প স্থাপন, ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণ কিংবা বড় প্রকল্পে বিনিয়োগ—কোনো ক্ষেত্রেই উদ্যোক্তারা এখনো আগ্রহী হচ্ছেন না। বরং অধিকাংশ ব্যবসায়ী নতুন বিনিয়োগের পরিবর্তে বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলো সচল রাখাকেই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ মনে করছেন।
ইতোমধ্যে দেশের অর্থনীতির হৃদ্পিণ্ড হিসেবে খ্যাত পোশাকশিল্পের অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এভাবে চলতে থাকলে দ্রুতই গভীর সংকটে পড়বে দেশের অর্থনীতি।
বাংলাদেশের অর্থনীতির বেশির ভাগ সূচকই এখন নেতিবাচক। দিন দিন পরিস্থিতি শুধু খারাপের দিকেই যাচ্ছে। অভ্যন্তরীণ ও বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা বিরাজ করছে। বেসরকারি বিনিয়োগ হলো অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি। নতুন নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, উৎপাদন বৃদ্ধি, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থান—সবকিছুর কেন্দ্রেই রয়েছে বিনিয়োগ।
ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলো ধারাবাহিকভাবে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি করে শিল্পায়নের ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত তৈরি করেছে। এর ফলে দেশগুলোর শুধু রপ্তানিই বাড়েনি, বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে বেকারত্বও দূর হয়েছে।
বাংলাদেশও দীর্ঘদিন ধরে একই পথে অগ্রসর হচ্ছিল। বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে তৈরি পোশাক, ওষুধশিল্প, কৃষি, প্রক্রিয়াজাত শিল্প, চামড়া এবং হালকা প্রকৌশল খাতের বিকাশ অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু বিগত দুই বছর ধরে নানা সংকটে এই অগ্রগতির গতি অনেকটাই শ্লথ হয়ে গেছে।
ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তাদের মতে, ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদ, গ্যাস-বিদ্যুতের সরবরাহের অনিশ্চয়তা, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, ডলার বাজারের চাপ, নীতিগত অস্থিরতা, উচ্চ উৎপাদন ব্যয় এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো একাধিক কারণে নতুন বিনিয়োগের গতি থমকে গেছে।
অন্যদিকে, দেশে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, ঘন ঘন সরকারের নীতি পরিবর্তন এবং সুশাসনের অভাবের কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করতে ভয় পাচ্ছেন।
শিল্পের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ জ্বালানি। কিন্তু বর্তমানে জ্বালানি সংকট ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। নতুন শিল্পে গ্যাস সংযোগ পাওয়া তো দূরের কথা, পুরোনো কারখানাগুলোও দিনের অনেকটা সময় গ্যাস ও বিদ্যুতের অভাবে বন্ধ রাখতে হচ্ছে। ইতোমধ্যে ছোট-বড় কয়েকশ শিল্পকারখানা জ্বালানি সংকটের কারণে কার্যক্রম বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। আর জ্বালানি সংকটের কারণে নতুন করে কেউ বিনিয়োগের সাহস পাচ্ছেন না।
ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদের হার বিনিয়োগের আরেকটি বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিল্পঋণের সুদ ১৪ থেকে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে। সুদের এই উচ্চ হার দীর্ঘমেয়াদি শিল্প বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করছে। ফলে উদ্যোক্তারা নতুন প্রকল্পে উৎসাহী হচ্ছেন না।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য সুদের হার বাড়িয়ে দিলে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার খরচ অনেক বেড়ে যায়। ফলে ব্যবসায়ীরা নতুন প্রকল্প হাতে নিতে পারছেন না।
বাংলাদেশের অধিকাংশ উৎপাদন-শিল্প আমদানি-নির্ভর কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীল। সে কারণে ডলারের অস্থিরতার কারণে এলসি খোলা কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ উৎপাদন ব্যয় আগে থেকে নির্ধারণ করা যাচ্ছে না। ডলার রিজার্ভ কমে গেলেও কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য এলসি বা ঋণপত্র খুলতে দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হয়, যা শিল্প উৎপাদন ও বিনিয়োগকে সরাসরি বাধাগ্রস্ত করে।
আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের তুলনায় টাকার মান ক্রমাগত কমে যাচ্ছে। এর কারণে টাকা থেকে ডলারে রূপান্তরের সময় বেশি টাকা দিয়ে কম বৈদেশিক মুদ্রা পাওয়া যায়। ফলে বিনিয়োগের শুরুতেই বড় অঙ্কের পুঁজি হারাতে হয়। এ কারণে ছোট ছোট বিনিয়োগকারীরা পুঁজি হারানোর ভয়ে বিনিয়োগে আগ্রহী হন না।
বাংলাদেশে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দীর্ঘদিনের প্রথা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর কারণে অনেক বিনিয়োগকারী নিরুৎসাহিত হন। ব্যবসার লাইসেন্স, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র, আয়ের উৎস প্রদর্শন এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ছাড়পত্র পাওয়ার প্রক্রিয়াসহ যাবতীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ। এর জন্য একজন বিনিয়োগকারীকে প্রতি পদে পদে হয়রানির শিকার হতে হয়। ঘুষ লেনদেন ছাড়া ফাইল নড়ে না। তারপরও দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়।
এক্ষেত্রে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে অনেক দেশেই ওয়ানস্টপ সার্ভিস চালু হয়েছে। অর্থাৎ ব্যবসায়ীদের দ্রুত বিনিয়োগের সুবিধা দিতে সব ধরনের সেবাকে একই ছাদের নিচে নিয়ে আসা হয়েছে।
বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং আইনের শাসন বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। ব্যবসায়ীরা আশা করেছিলেন, নির্বাচনের পর গণতান্ত্রিক সরকার এলে রাজনৈতিক অস্থিরতা কমবে এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি হবে। কিন্তু এখনো কোনো এক অজানা আতঙ্কে ব্যবসায়ীদের মধ্যে ভীতি কাটেনি। তারা মনে করেন, দ্রুতই বাংলাদেশের পরিস্থিতি আবারও অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে উদ্যোক্তাদের মধ্যে অর্থের চেয়ে বড় সংকট হলো আস্থার। তারা বিনিয়োগ করতে চান, কিন্তু ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চিত হতে পারছেন না। এ জন্য তারা 'ধীরে চলো নীতি' গ্রহণ করেছেন।
এক্ষেত্রে দেশি বিনিয়োগকারীদের চেয়েও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আরও বেশি সতর্ক। কারণ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘ সময়ের জন্য বিনিয়োগ করতে হয়। তারা অনুকূল পরিবেশ মনে না করলে এই ঝুঁকি নেবেন না। তারা সাধারণত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তা, সহজ ব্যবসা পরিবেশ এবং বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের স্থিতিশীলতাকে গুরুত্ব দেন। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত উন্নতি না হওয়ায় বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করা যাচ্ছে না।
আস্থার সংকট কাটানোই এখন দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা, সুদের হার সহনীয় পর্যায়ে নামানো, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে 'ওয়ানস্টপ সার্ভিস' চালু করা, ডলার বাজার স্থিতিশীল রাখা, ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ করে প্রকৃত ব্যবসায়ীদের জন্য ঋণপ্রাপ্তি সহজ করা, বন্দরব্যবস্থা আধুনিকায়ন করে পণ্য খালাস ও পরিবহন সহজ করা, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মুনাফা ফিরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করা এবং সর্বোপরি বিনিয়োগকারীদের রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা—এসব পদক্ষেপ নিশ্চিত করা গেলে বিনিয়োগে স্থবিরতা কাটবে এবং অর্থনীতিতে আবারও গতি ফিরে আসবে।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: নিবন্ধের বিশ্লেষণটি লেখকের একান্ত নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও পর্যবেক্ষণের প্রতিফলন। অবধারিতভাবে তা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর অবস্থান বা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়।
