কলেজে ছেলেদের থেকে এগিয়ে মেয়েরা, কিন্তু পিছিয়ে পড়ছে বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে
বাংলাদেশে কলেজশিক্ষার কয়েকটি পর্যায়ে ছাত্রদের তুলনায় ছাত্রীদের সংখ্যা বেশি। তবে উচ্চশিক্ষার দিকে এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মেয়েদের অংশগ্রহণ কমতে থাকে। সরকারি শিক্ষা পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট শিক্ষার্থীর ৪০ শতাংশেরও কম নারী। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে নারীদের সংখ্যা ৩০ শতাংশের সামান্য বেশি।
২০২৬ সালের জুন মাসে বাংলাদেশ ব্যুরো অব এডুকেশনাল ইনফরমেশন অ্যান্ড স্ট্যাটিস্টিকস (ব্যানবেইস) প্রকাশিত 'বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান ২০২৫' শীর্ষক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি কলেজের মোট শিক্ষার্থীর ৫৩ শতাংশ মেয়ে। তবে মাস্টার্স পর্যায়ে এসে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নারীদের অংশগ্রহণ ৪৮ শতাংশের নিচে নেমে যায়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট শিক্ষার্থীর মাত্র ৩৯ শতাংশ নারী। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ হার আরও কম, ৩৫ শতাংশ।
পরিসংখ্যানগুলোতে শিক্ষার স্তর যত বাড়ছে, নারী-পুরুষের অংশগ্রহণের ব্যবধান তত বাড়ার চিত্র উঠে এসেছে। এ পরিস্থিতি সামাজিক প্রত্যাশা, শিক্ষার পেছনে পরিবারের ব্যয়ের অগ্রাধিকার, আর্থিক সীমাবদ্ধতা এবং উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনে নারীদের প্রতিবন্ধকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
বার্ষিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জরিপ ২০২৫-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট বিশ্ববিদ্যালয় ছিল ১৭৪টি। এর মধ্যে ৫৬টি সরকারি এবং ১১৮টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থী ছিলেন ১১ লাখ ১৪ হাজার।
সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে নারীর সংখ্যা ৪১.৭ শতাংশ। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ হার ৩৫ শতাংশ। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে গড়ে ১২ হাজার ৭৯৩ জন শিক্ষার্থী থাকলেও, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে গড় শিক্ষার্থীসংখ্যা ৩ হাজার ৩৬৯।
বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার ক্ষেত্রেও নারীদের অংশগ্রহণ সীমিত। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মোট ৩৪ হাজার ৮৩১ জন শিক্ষকের মধ্যে নারীর সংখ্যা ৩০ শতাংশ। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে নারীদের অংশগ্রহণ প্রায় ২৮ শতাংশ, আর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ হার ৩৩ শতাংশ।
শিক্ষাবিদ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমেদ দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে জানান, এই ব্যবধান নারীদের প্রতি সমাজে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা বৈষম্যের প্রতিফলন।
তিনি বলেন, 'জেন্ডার সমতা প্রতিষ্ঠায় আমরা বারবার ব্যর্থ হয়েছি। মেয়েদের ওপর বিশেষ ধরনের সামাজিক চাপ থাকে। সামাজিকীকরণের সমস্যা ও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা বৈষম্যকে আরও প্রকট করে তোলে। শিক্ষা গ্রহণ থেকে শুরু করে শিক্ষকতা পর্যন্ত সব ক্ষেত্রেই নারীদের ভূমিকা ক্রমেই সীমিত হয়ে পড়ে।'
শিক্ষার পেছনে কতটা ব্যয় করা হবে, সে বিষয়ে পরিবারের সিদ্ধান্তও মেয়েদের উচ্চশিক্ষার সুযোগকে প্রভাবিত করতে পারে।
ঢাকার ভাটারা এলাকার তিন সন্তানের বাবা শরীফ আহমেদ বলেন, তিনি তার ছেলেকে এমবিএ পড়তে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়েছিলেন। অন্যদিকে, তার দুই মেয়ে সরকারি কলেজে পড়াশোনা করে স্নাতক (সম্মান) ডিগ্রি সম্পন্ন করেছেন।
তিনি বলেন, 'মেয়েদের পড়ালেখা শেখানো দায়িত্ব। আমার দুই মেয়েই অনার্স শেষ করেছে। এখন তারা স্বামী-সন্তান নিয়ে ভালো আছে। মেয়েদের দেখাশোনার জন্য স্বামী ও বাবা থাকেন। কিন্তু ছেলেদের সংসারের দায়িত্ব নিতে হয়। এ কারণেই ছেলেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়েছি। এখন সে একটি ভালো বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করছে এবং ভালো আয় করছে।'
তবে কিছু পরিবার মেয়েদের শিক্ষাকেই অগ্রাধিকার দেয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে অন্য একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের এক ছাত্রী জানিয়েছেন, তার বাবা তাকে সফল ক্যারিয়ার গড়ে তুলতে সহায়তা করার জন্য নিজের সঞ্চয়ের বেশির ভাগই তার পড়াশোনার পেছনে ব্যয় করেছেন।
তিনি বলেন, তার বাবা-মা তাকে ও তার ভাইকে সমানভাবে দেখেছেন। এ কারণে তার শিক্ষাজীবনের পথচলা সহজ হয়েছে।
তবে ভিন্ন অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী মিথিলা। তিনি ব্যবসায় শিক্ষা নিয়ে পড়তে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার বাবা তাকে জানিয়েছিলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর সামর্থ্য তার নেই। অথচ মিথিলার বড় ভাই একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ সম্পন্ন করেছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক তানিয়া হক টিবিএসকে বলেন, নারী ও পুরুষের ভূমিকা নিয়ে সমাজের প্রচলিত ধারণার কারণে অনেক পরিবার ছেলেদের পেছনে বেশি অর্থ ব্যয় করে।
তিনি বলেন, 'মেয়েদের এখনো অনেক ক্ষেত্রে প্রোডাক্টিভ ওয়ার্কার হিসেবে না দেখে রিপ্রোডাক্টিভ ওয়ার্কার হিসেবে দেখা হয়। সমাজ ছেলেদের উপার্জন করতে এবং বাবা-মায়ের দায়িত্ব নিতে প্রত্যাশা করে বলে পরিবারগুলো তাদের পেছনে বেশি বিনিয়োগ করতে পারে।'
তিনি আরও জানান, বিয়ের পর মেয়ের দায়িত্ব তার স্বামী নেবেন—এমন ধারণাও পরিবারের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে।
অধ্যাপক তানিয়া হক বলেন, এসব দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন জরুরি। ছেলে ও মেয়ে উভয়েই বাবা-মায়ের দায়িত্ব নিতে পারে এবং তাদের সমান সুযোগ পাওয়া উচিত বলে তিনি জোর দেন।
নারীদের উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে আবাসন, নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাকেও গুরুত্বপূর্ণ বাধা হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। বিশেষ করে রাজধানীর বাইরে থেকে ঢাকায় পড়তে আসা শিক্ষার্থীদের জন্য এসব সমস্যা বড় হয়ে দেখা দেয়। উচ্চশিক্ষাকে কর্মবাজারের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করা গেলে নারীদের কাছে এর গুরুত্ব বাড়বে বলে তিনি মনে করেন।
গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, এই ব্যবধানের জন্য শুধু পরিবারের সিদ্ধান্তকে দায়ী করা যায় না।
ওই শিক্ষাবিদের মতে, পরিবহন, আবাসন ও নিরাপত্তার ঘাটতির কারণে অনেক মেয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এগিয়ে যেতে পারে না। এ কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সহায়তা এবং আর্থিকভাবে অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহযোগিতা জরুরি।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, শুধু শিক্ষার্থীসংখ্যার পরিসংখ্যান দিয়ে পরিবারগুলো মেয়েদের উচ্চশিক্ষার পেছনে কম অর্থ ব্যয় করে কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
তাদের মতে, পরিবারের আর্থিক সক্ষমতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাছাই, বিয়ে, পারিবারিক দায়িত্ব, আবাসন, নিরাপত্তা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ—সবকিছুই উচ্চশিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ কমে যাওয়ার পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।
