‘যারা সাংবিধানিক সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছিলেন তাদের সংবিধান সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা নেই'
টিবিএস-এর নির্বাহী সম্পাদক সাখাওয়াত লিটন সঞ্চালিত রাজনৈতিক টক শো 'নতুন সংসদ, নতুন সরকার'-এর একটি পর্ব থেকে এই অংশটি নেওয়া হয়েছে। এই পর্বের অতিথি ছিলেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিক। বিশিষ্ট এই আইন বিশেষজ্ঞ উল্লেখ করেছেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে সৃষ্ট বিতর্ক একটি আইনিভাবে ত্রুটিপূর্ণ রাষ্ট্রপতির আদেশের কারণে হয়েছে, যা সংবিধানের প্রাধান্যকে ক্ষুণ্ণ করতে পারে এবং আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি আরও বলেন, দলগুলোর মধ্যকার রাজনৈতিক মতপার্থক্য আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা যেত। তিনি উল্লেখ করেন, জুলাই অভ্যুত্থানের পর জনগণের প্রত্যাশা এখন ব্যাপক সংবিধান সংস্কারের চেয়ে বরং স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক স্বস্তি এবং গণতান্ত্রিক চর্চার ওপরই বেশি কেন্দ্রীভূত।
জামায়াতে ইসলামী এবং এনসিপি দাবি করছে যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বিএনপি জুলাই অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে অবজ্ঞা করেছে। এ বিষয়ে আমি আপনার পর্যবেক্ষণ জানতে চাই। নতুন সংসদ ও সরকার তাদের যাত্রা কীভাবে শুরু করেছে?
যাত্রাটি গত কয়েক দিনে বেশ মসৃণভাবেই শুরু হয়েছে বলেই মনে হচ্ছিল। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জামায়াতে ইসলামীর আমিরের বাসায় গেছেন, এনসিপি নেতাদের বাসায় গেছেন, খেলাফত মজলিসের নেতাদের বাসায়ও গেছেন। চারদিকে ছিল সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ। বিজয়ের পর বিএনপি কোনো উৎসব করেনি। শুক্রবারে তারা মিলাদ ও দোয়া করেছে। সব মিলিয়ে শুরুটা ছিল শান্ত ও স্বাভাবিক।
কিন্তু আজকের ঘটনাপ্রবাহের পর মনে হচ্ছে, যাত্রাটি একেবারে শুরুতেই হোঁচট খেল। দ্বিমত রাজনীতিতে স্বাভাবিক বিষয়। সব রাজনৈতিক দল সব বিষয়ে একমত হবে না। মতপার্থক্য থাকতেই পারে। তবে বিষয়টি আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা যেত।
মনে হচ্ছে, জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি হঠাৎ করেই কঠোর অবস্থান নিয়েছে—যদি 'হার্ডলাইন' শব্দটি ব্যবহার করা যায়। গত কয়েক মাস আমরা নানা শঙ্কা ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে গেছি। নির্বাচন হবে কি না, তা নিয়েও ছিল সংশয়। শেষ পর্যন্ত নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবেই হয়েছে। উল্লেখযোগ্য সহিংসতার ঘটনাও ঘটেনি। গত কয়েক সপ্তাহে পরিস্থিতি স্থিতিশীলই মনে হচ্ছিল। হঠাৎ আজ মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) সেখানে অপ্রত্যাশিত এক হোঁচট দেখা গেল।
সাংবিধানিক রাজনীতির সূচনা করার পরিবর্তে, আমরা কি সংবিধানকেই ঘিরে রাজনৈতিক বিরোধ শুরু করে ফেলেছি?
আপনি ঠিকই বলেছেন। তবে এটি প্রয়োজনীয় ছিল না। বিশেষ করে বিএনপির অবস্থান—যেটি সালাহউদ্দিন তুলে ধরেছেন—সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে আগে সংস্কার পরিষদকে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এরপরই সংসদ সদস্যরা সেই শপথ নিতে পারবেন। এটিই তাদের যুক্তি।
অন্যদিকে বলা হচ্ছে, রাষ্ট্রপতির জারি করা একটি 'সাংবিধানিক আদেশ'-এর অধীনে শপথ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু আমার উদ্বেগ হলো, আমাদের আইনে রাষ্ট্রপতির 'সাংবিধানিক আদেশ' নামে কোনো বিধান নেই। সংসদ অধিবেশনে না থাকলে বিশেষ পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন।
তবে অধ্যাদেশ জারির ক্ষমতা পরম নয়; সংবিধান এ ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছে। মূল বিষয়টি হলো: অধ্যাদেশ জারি করা যেতে পারে, কিন্তু তা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে না। সংবিধানকে অতিক্রম করে কোনো 'রাষ্ট্রপতির আদেশ'-এর আলাদা আইনগত ভিত্তি নেই। আইনগত ও ভাষাগত দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি অত্যন্ত সমস্যাজনক হয়ে উঠেছে।
আমাদের সংবিধানের অন্যতম মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো সংবিধানের 'সুপ্রিমেসি' (প্রাধান্য)। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ কি সেই 'সুপ্রিমেসি' ক্ষুণ্ণ করেছে?
হ্যাঁ, নিঃসন্দেহে করেছে। যদি সত্যিই একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের প্রয়োজন থাকত, তবে সংসদের প্রথম অধিবেশনেই সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে তা প্রতিষ্ঠা করা যেত। সেটিই হতো প্রক্রিয়াগতভাবে সঠিক পথ।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বহু প্রশ্ন উঠবে। আমি নিশ্চিত, বিষয়টি আদালতে চ্যালেঞ্জ হবে। রাষ্ট্রপতির এমন আদেশ জারির ক্ষমতা আছে কি না এবং থাকলে তার ভিত্তি কী—এসবই বিচারাধীন হবে। এই আদেশের পক্ষে অবস্থান রক্ষা করা অত্যন্ত কঠিন হবে।
আদেশে আরও বলা হয়েছে, সংস্কার পরিষদের প্রস্তাবিত সংবিধান সংশোধন সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পাস হবে। অথচ সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এতে কি আদেশটি সংবিধানের ঊর্ধ্বে চলে যাচ্ছে না?
হ্যাঁ, তাই-ই হচ্ছে। সংবিধানে সংশোধনের একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতি রয়েছে, আর এই আদেশে প্রস্তাব করা হয়েছে ভিন্ন পদ্ধতি। এটি সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। ৫ আগস্টের পর যদি সংবিধান বিলুপ্ত করা হতো—যেমন পাকিস্তানে ১৯৫৮ সালে হয়েছিল—তবে নতুন কাঠামো আনা যেত। কিন্তু আমাদের সংবিধান বিলুপ্ত হয়নি।
৫ আগস্ট শেখ হাসিনার বিদায়ের পর নেওয়া পদক্ষেপগুলো, অধ্যাদেশসহ, সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যেই ছিল। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও সংবিধানের অধীনেই শপথ নিয়েছে, বলা হয় সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শক্রমে। কিছু ক্ষুদ্র বিচ্যুতি থাকলেও বড় কোনো সাংবিধানিক বিচ্যুতি ঘটেনি। কিন্তু এই রাষ্ট্রপতির আদেশ পুরো পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।
আদেশটিই যদি ত্রুটিপূর্ণ হয়, তবে এর অধীনে অনুষ্ঠিত গণভোটের বৈধতাও কি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে না?
হ্যাঁ, সেটিও চ্যালেঞ্জ হতে পারে। বিএনপির সংসদ সদস্যরা কেবল সংসদের শপথ নিয়েছেন। জামায়াত ও এনসিপি উভয় শপথ নিয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো: সংখ্যাগরিষ্ঠ দল শপথ না নিলে সংস্কার পরিষদের সভা কে আহ্বান করবে?
সংসদ সদস্যরা জাতীয় সংসদের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন। সেই নির্বাচনের ভিত্তিতে তারা কি পৃথক সংবিধান সংস্কার পরিষদে ভূমিকা নিতে পারেন?
এসব বিষয় সম্পূর্ণ গোলমেলে হয়ে গেছে। এমন বিভ্রান্তির কোনো প্রয়োজন ছিল না। এতে মনে হয়, যারা এ উদ্যোগ নিয়েছেন তাদের সাংবিধানিক নীতিমালা সম্পর্কে ধারণা স্পষ্ট নয়।
সংসদের সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা আগেই রয়েছে। এ পর্যন্ত ১৮ বার সংশোধন হয়েছে। জুলাই সনদের বহু প্রস্তাব—সংযোজন, বিয়োজন, সংস্কার—বিদ্যমান কাঠামোর মধ্যেই সমাধানযোগ্য, মৌলিক কাঠামোর পরিপন্থী অংশ ছাড়া।
তাহলে কি রাজনীতি আবার সংঘাতের দিকে যাবে?
না, আমার মনে হয় না রাজনীতি আবার সংঘাতের দিকে যাবে। মানুষ রাস্তায় নেমেছিল কারণ তারা পরিবর্তন চেয়েছিল—নিঃসন্দেহেই তারা পরিবর্তন চেয়েছিল। আর সে কারণেই তারা ত্যাগ স্বীকার করেছে, প্রাণ দিয়েছে, রক্ত ঝরিয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত একটি স্বৈরাচারী সরকারকে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করেছে।
এখন আমরা ধীরে ধীরে একটি শান্ত ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ফিরে যেতে উন্মুখ হয়ে আছি। আমরা সবাই জানতাম যে, একটি ভালো নির্বাচন হলে আমরা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসব। বর্তমানে মানুষ যা চায় তা হলো একটি স্থিতিশীল ও সুশৃঙ্খল পরিস্থিতি। তারা চায় জিনিসপত্রের দাম যেন আর না বাড়ে, বরং তা কমানোর ব্যবস্থা নেওয়া হোক। তারা চায় যথাযথ কর্মসংস্থান এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের উন্নতি—যেসব ক্ষেত্রে আমাদের এখনো ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে।
বিএনপি যদি এই কাউন্সিলে শপথ নিতও, তবুও কি জুলাই সনদের প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের প্রকৃত এখতিয়ার এই সংসদের থাকত?
এমন কিছু লক্ষণ দেখা যাচ্ছে যে, সনদের কিছু প্রস্তাব সংবিধানের 'মৌলিক কাঠামো' বা 'বেসিক স্ট্রাকচার'-এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এমনকি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পাস হলেও, আদালত এই ধরনের সংশোধনী বাতিল করে দিতে পারেন। সংবিধান সংশোধনে সংসদের ক্ষমতা অসীম নয়। সংসদ সংবিধানের মৌলিক কাঠামো লঙ্ঘন করতে পারে না।
উদাহরণস্বরূপ, সংসদ যদি সংবিধান সংশোধন করে তার মেয়াদ পাঁচ বছর থেকে বাড়িয়ে ১৫ বছর করে—এবং তাতে যদি সবার সমর্থনও থাকে—তবুও আদালত সম্ভবত একে মৌলিক কাঠামোর পরিপন্থী হিসেবে অবৈধ ঘোষণা করবেন।
আমাদের সংসদ যুক্তরাজ্যের হাউস অফ কমন্সের মতো নয়, যা 'পার্লামেন্টারি সভারেনটি'-এর (সংসদীয় সার্বভৌমত্ব) ভিত্তিতে চলে। বাংলাদেশে সংবিধানই হলো সর্বোচ্চ বা সুপ্রিম।
আরেকটি মৌলিক ভুল ধারণা হলো, সংবিধানে 'ভালো ভালো কথা' লিখে দিলেই গণতন্ত্র নিশ্চিত হয়ে যাবে। নাইজেরিয়া ও রাশিয়ার সংবিধান বেশ ভালোভাবেই লেখা, তবুও সেখানে গণতন্ত্রের চর্চা কঠিন হয়ে পড়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর ১৯৯৩ সালে রাশিয়া একটি অত্যন্ত প্রশংসিত সংবিধান গ্রহণ করেছিল, কিন্তু তার ফলাফল আমরা সবাই জানি।
গণতন্ত্র নির্ভর করে রাজনৈতিক সংস্কৃতি, জবাবদিহিতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক চর্চার ওপর—শুধুমাত্র সংবিধানের বইয়ে কী লেখা আছে তার ওপর নয়।
গত এক বছরে সংবিধান সংস্কার নিয়ে অতিরিক্ত মাতামাতি বা আচ্ছন্নতা লক্ষ্য করা গেছে, যা আসলে আমাদের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির ভঙ্গুরতাকেই প্রকাশ করে। অনেক রাজনৈতিক নেতা এবং সংবিধান সংস্কার কমিশনের সদস্যদের আইনি দক্ষতার অভাব ছিল। অথচ পর্যাপ্ত আইনি ভিত্তি ছাড়াই তারা জবাবদিহিতা এবং আইনের শাসনের মতো গভীর আইনি বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করছিলেন।
তাহলে রাজনৈতিক দলগুলো জুলাই সনদে সই করল কেন?
রাজনৈতিক দলগুলো সম্ভবত নির্বাচন দ্রুত করার লক্ষ্যে এবং ক্ষমতার দ্রুত হস্তান্তরকে অগ্রাধিকার দিতেই ওই সনদে সই করেছিল। আর 'জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা'-র কথা যদি বলি—সেটি আসলে কী ছিল? ২০২৪ সালের জুন-জুলাই-আগস্ট মাসের আন্দোলনের সময় মূল দাবিই ছিল শেখ হাসিনার অপসারণ। সেখানে সংবিধানের কোনো বিস্তারিত রূপরেখা বা ব্লুপ্রিন্ট ছিল না। মানুষ তখন সহিংসতা, জখম এবং দমনপীড়নের শিকার হচ্ছিল। আন্দোলনটি মূলত এক দফা দাবিতেই ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল।
আকাঙ্ক্ষাটি ছিল একটি ন্যায়ভিত্তিক, জবাবদিহিমূলক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের—সংবিধানের খুঁটিনাটি সংস্কারের কোনো পরিকল্পনা নয়।
বর্তমান সংবিধানে ইতোমধ্যেই অনেক মহৎ নীতি রয়েছে—যেমন আইনের দৃষ্টিতে সমতা, বৈষম্য বিলোপ এবং আইনের শাসন। সমস্যাটা আসলে চর্চার, সংবিধানের লেখার নয়।
বর্তমানে জনমত স্থিতিশীলতার ওপরই নিবদ্ধ—যেমন কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি এবং জরুরি সেবা। মানুষ এখন সংবিধানের কারিগরি বা জটিল বিতর্ক নিয়ে ভাবছে না।
