ইউক্রেন কেন রুশ সেনা বহরের ওপর হামলা করছে না? ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে আরও যত প্রশ্ন
রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা চালিয়েছে এক সপ্তাহের বেশি সময় হয়ে গেছে।
রাজধানী কিয়েভসহ বেশ কয়েকটি শহরে চলছে রাশিয়ান বাহিনীর গোলাবর্ষণ। একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রও হামলার শিকার হয়েছে।
সংবাদমাধ্যম বিবিসির কাছে অনেক পাঠকই ইউক্রেন পরিস্থিতি নিয়ে অসংখ্য প্রশ্ন পাঠাচ্ছেন। সেখান থেকে বেশ কিছু বাছাই করা প্রশ্নের জবাব দিয়েছে বিবিসি। সেসব প্রশ্নোত্তর তুলে ধরা হলো টিবিএসের পাঠকদের জন্যও।
প্রশ্ন: ইউক্রেনে সামরিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে কীভাবে? ইউক্রেনিয়ান বিমানবাহিনী রুশ বহরের ওপর হামলা চালাচ্ছে না কেন?
উত্তর: ইউক্রেনের পশ্চিম সীমান্তের পোল্যান্ড ও অন্যান্য ন্যাটো রাষ্ট্রে রাশিয়া হামলা করেনি (হামলা এসেছে অন্য তিন দিক—উত্তর, দক্ষিণ ও পূর্ব থেকে)। এ কারণে এখনও সাপ্লাই আসার একটি করিডোর রয়ে গেছে।
তবে কৃষ্ণসাগরের বড় একটি অংশ এখনও রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে। এ কারণে বিরোধীপক্ষের জাহাজের জন্য এই অঞ্চল নিরাপদ নয়।
ইউক্রেন কেন রুশ বহরের ওপর আক্রমণের উদ্যোগ না নিয়ে অরক্ষিতের মতো বিমান হামলা হজম করছে, তা নিয়ে সবাই-ই বিভ্রান্তিতে আছে।
এই নিষ্ক্রিয়তার কয়েকটি ব্যাখ্যা থাকতে পারে। ইউক্রেনের সশস্ত্র ড্রোন হয়তো ফুরিয়ে গেছে। অথবা দেশটির অপেক্ষাকৃত ছোট বিমানবাহিনী রাশিয়ান সেনাদের গোলার লক্ষ্যবস্তু হতে চাইছে না।
ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ-এর বেন বেরি ধারণা করছেন, হাতে যতটা অস্ত্রশস্ত্র আছে, ইউক্রেন সম্ভবত তা বাঁচিয়ে রাখছে, যাতে রুশ বাহিনী কিয়েভের আরও কাছে এগিয়ে এলে পাল্টা আক্রমণ করা যায়।
প্রশ্ন: ইউক্রেন যুদ্ধে জড়ানোর জন্য পশ্চিমা শক্তিগুলোকে ঠিক কী করতে হবে?
উত্তর: পশ্চিম স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, রাশিয়া যদি কোনো ন্যাটোভুক্ত দেশকে আক্রমণ করে, তাহলেই কেবল তারা সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করবে। ইউক্রেন ন্যাটোর সদস্য নয়, তবে ন্যাটোভুক্ত পোল্যান্ড ও বাল্টিক রাষ্ট্রগুলোর প্রতিবেশী। এ কারণে ন্যাটো এসব দেশের সীমান্ত সুরক্ষিত করতে বাড়তি সেনা পাঠাচ্ছে।
ন্যাটো বলছে, রুশ হামলা ঠেকাতে পশ্চিমা দেশগুলো ইউক্রেনকে 'প্রতিরক্ষামূলক' অস্ত্রশস্ত্র সরবরাহ করছে। এসব অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে অ্যান্টি-এয়ারক্রাফট ও অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক মিসাইল।
অনেকেই ইউক্রেনিয়ান শহরগুলোতে রুশ বিমান হামলা ঠেকানোর জন্য 'নো-ফ্লাই জোন' ঘোষণার আহ্বান জানিয়েছে। কিন্তু ন্যাটো তাতে রাজি হয়নি। কারণ হিসেবে বলছে, নো-ফ্লাই জোন ঘোষণা করলে ইউক্রেনের আকাশে প্রবেশ ঠেকানোর জন্য রাশিয়ান বিমানের ওপর ন্যাটোকে গুলি চালাতে হবে। তার ফলে রাশিয়ার সঙ্গে ন্যাটোর যুদ্ধ বেধে যেতে পারে।
প্রশ্ন: এখন পর্যন্ত যুদ্ধবন্দিদের ব্যাপারে কিছু শোনা যায়নি। কোনো পক্ষই কি কাউকে বন্দি করছে না?
উত্তর: করছে। খবরে এসেছে, কিছু রাশিয়ান সৈন্য আটক হয়েছেন। তাদের একজনকে বাড়িতে ফোন কল করতে দেওয়া হয়েছে।
প্রশ্ন: ইউক্রেনের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে রাশিয়ার আক্রমণের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ন্যাটোর কোনো কৌশল আছে?
উত্তর: এই হামলা সম্ভবত কেউ ভাবতেও পারেনি। তবে নিন্দা জানানো ছাড়াও পশ্চিম আরও অনেক কিছুই করতে পারে।
অন্যদিকে রাশিয়ারও সীমান্তের এত কাছে পারমাণবিক বিপর্যয় সৃষ্টির কোনো ইচ্ছা নেই। কাজেই পুনরায় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র আক্রমণের সম্ভাবনা খুবই কম।
প্রশ্ন: জাপোরিঝঝিয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে আক্রমণ কতটা উদ্বেগের বিষয়?
উত্তর: জাপোরিঝঝিয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এখান থেকে কোনো তেজস্ক্রিয় পদার্থ বিকিরণের ঘটনাও ঘটেনি। বিদ্যুৎকেন্দ্রে পারমাণবিক চুল্লি বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে, ফলে কেন্দ্রটির পরিস্থিতি নিরাপদই থাকবে।
চুল্লিগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভালো। এগুলো অগ্নি-নিরোধক। তবে পারমাণবিক স্থাপনাগুলো সামরিক লক্ষ্যবস্তু হলে তা নিয়ে উদ্বেগের কারণ আছে, কেননা সেক্ষেত্রে পারমাণবিক দুর্ঘটনা ঘটার প্রবল ঝুঁকি থেকে যায়।
প্রশ্ন: পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে দূরের দেশগুলোতে—যেমন যুক্তরাজ্যে—তার কেমন প্রভাব পড়তে পারে?
উত্তর: যুক্তরাজ্য ইউক্রেন থেকে অনেক দূরে। যুক্তরাজ্যে তেজস্ক্রিয় বিকিরণের কোনো প্রভাব পড়বে।
কোনো দুর্ঘটনা ঘটলেও তার তীব্রতা ১৯৮৬ সালের চেরনোবিলের দুর্ঘটনার মতো হবে না। চেরনোবিলের চুল্লিতে গ্রাফাইট ছিল। এ কারণে ওই চুল্লি ১০ দিন ধরে জ্বলেছিল। তার ধোঁয়াও অনেক উপরে ওঠে এবং ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।
ইউক্রেনের চুল্লিগুলোতে গ্রাফাইট নেই। কাজেই ব্যাপক পরিসরে আগুন লাগার বা ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
প্রশ্ন: সত্যি সত্যিই যদি পারমাণবিক স্থাপনায় বা কুলিং ইউনিটে আগুন লাগে বা সরাসরি বোমা পড়ে, তাহলে কী হবে?
উত্তর: চুল্লি ভবনের ভেতরে আগুন লাগলে তা তৎক্ষণাৎ স্বয়ংক্রিয় সেফটি সিস্টেমের সাহায্যে নির্বাপণ করা হবে। চুল্লি ভবনগুলো যথেষ্ট মজবুত, তাই সেখানে পারমাণবিক জ্বালানি বেশ নিরাপদেই থাকবে।
পরমাণবিক বিকিরণ ছড়িয়ে পড়লেই কেবল বিস্ফোরণ হবে। আর তা ঘটতে পারে সাইটে সরবরাহ করা বিদ্যুৎ ও ব্যাক-আপ জেনারেটর ক্ষতিগ্রস্ত হলে। তা যদি কোনো কার্যক্রম চালু থাকা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ঘটে, তাহলে ফুকুশিমার মতো বিস্ফোরণ হতে পারে।
জাপোরিঝঝিয়ায় চুল্লিগুলো 'শাটডাউন' করে দেওয়া হচ্ছে। এর অর্থ, পরমাণবিক বিকিরণ ছড়িয়ে পড়তে পারবে না।
প্রশ্ন: কিয়েভে সাংবাদিকদের জীবন এখন কেমন? স্বাভাবিক জীবনযাপনের কোনো চিহ্ন কি আছে?
উত্তর: সপ্তাহখানেক আগেও কিয়েভের জীবন ছিল একেবারেই স্বাভাবিক।
কিন্তু এখন সর্বত্র যুদ্ধের আবহ। ঘটনাপ্রবাহ অত্যন্ত দ্রুত এগোচ্ছে। বোমা পড়ছে নিয়মিত বিরতিতে।
এখনও পর্যন্ত তাজা খাবার পাওয়া যাচ্ছে। তবে মেট্রো স্টেশনগুলোতে যারা আশ্রয় নিয়েছেন, তাদের খাবার ও পানীয় ফুরিয়ে আসছে।
কিয়েভের ব্যস্ত, স্বাভাবিক জীবন এখন থমকে গেছে। সর্বত্র ব্লকেড আর সামরিক চেকপয়েন্ট।
মাঝে মাঝে কিয়েভের বাসিন্দাদের মুখে নার্ভাস হাসি দেখা যায়। তবে সবার চেহারাতেই উদ্বেগের ছায়া স্পষ্ট।
প্রশ্ন: শেষ পর্যন্ত রাশিয়ান বাহিনী যদি কিয়েভ ঘিরে ফেলে, তাহলে কি বিমান থেকে সাপ্লাই (খাবার, অস্ত্রশস্ত্র) ফেলা যাবে শহরটিতে?
উত্তর: কিয়ভেকে ঘিরে ফেলা হলে কী ঘটবে, তা স্পষ্ট নয়।
ইউক্রেন ও রাশিয়া উভয়পক্ষই নাগরিকদের যুদ্ধ থেকে পালানোর সুযোগ করে দিতে 'মানবিক করিডোর' বানাতে সম্মত হয়েছে।
এমনও হতে পারে, ইউক্রেনিয়ান বাহিনী এই সাময়িক যুদ্ধবিরতির সুযোগ নিয়ে নতুন সাপ্লাই আনবে। প্রচণ্ড লড়াই চলছে যেসব শহরে, সেসব জায়গায় খাবার ও পানি সরবরাহ করার সুযোগ দিতে রাজি হয়েছে রাশিয়া।
এখন শহরগুলোর সুপারমার্কেট ও ফার্মেসিগুলো খোলা রাখা যায়। তবে জিনিসপত্রের মজুদ আরও কমে এসেছে এবং জিনিস কেনার জন্য লম্বা লাইন তৈরি হচ্ছে।
রাশিয়ান বাহিনী উত্তর ও পশ্চিম থেকে আরও এগিয়ে আসছে। কিয়েভও সম্ভবত সামরিকভাবে ঘেরাও হয়ে যাবে।
- সূত্র: বিবিসি থেকে অনূদিত
