রোনালদোকে ঘিরে পর্তুগাল শিবিরে ‘শুরু হতে পারে গৃহযুদ্ধ’
সামাজিকমাধ্যমে ভুয়া উদ্ধৃতি, ম্যাচ-পরবর্তী সাক্ষাৎকার ঘিরে অতিরঞ্জন আর গুজবের ঝড়- সব মিলিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে পর্তুগাল শিবির।
ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর তার ক্যারিয়ারের ষষ্ঠ ও শেষ বিশ্বকাপ খেলছেন। তাই তিনি যে সংবাদের শিরোনাম হবেন, তা বলা বাহুল্যই। তবে টুর্নামেন্টের শুরুর দিকে এবং এমন কিছু কারণে যে তিনি সংবাদের শিরোনাম হবেন, সেটি আসলে অপ্রত্যাশিতই বলা চলে।
সবকিছুর শুরু বিশ্বকাপে পর্তুগালের উদ্বোধনী ম্যাচে ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে ১-১ গোলে ড্র দিয়ে। জয়ের আশা নিয়ে মাঠে নামলেও এদিন পয়েন্ট হারিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয় পর্তুগাল শিবিরকে। এই ম্যাচে রোনালদো যেন ছিলেন সম্পূর্ণ নতুন কেউ। ৪১ বছর বয়সী এই পর্তুগীজ তারকার পারফরম্যান্স হতাশ করেছে কোটি কোটি ভক্তকে।
এরপর জোয়াও নেভেসের ম্যাচ-পরবর্তী সাক্ষাৎকারকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি অন্যদিকে মোড় নেয়। তার বক্তব্যকে অতিরঞ্জিতভাবে উপস্থাপন করা হলে পর্তুগাল দলের ভেতরে অস্থিরতার এক আবহ তৈরি হয়।
কঠিন পরিস্থিতিতে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হওয়া নেভেসের জন্য নতুন কিছু নয়। ২০২৪ সালের মার্চে বেনফিকা যখন পোর্তোর কাছে ৫-০ গোলে বিধ্বস্ত হয়েছিল, তখন ম্যাচ শেষে ফলাফলের ব্যাখ্যা দিতে হয়েছিল মাত্র ১৯ বছর বয়সী এই নেভেসকেই। এর মাত্র কয়েক দিন আগেই তিনি নিজের মাকে হারিয়েছিলেন।
সেই কঠিন অভিজ্ঞতার তুলনায় বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে ১-১ ড্র অনেক কম গুরুত্বপূর্ণ বলেই মনে হওয়ার কথা। তবুও সেই ম্যাচ-পরবর্তী সাক্ষাৎকারে নেভেসের কয়েকটি মন্তব্য দেশজুড়ে আলোচনার ঝড় তোলে, বিশেষ করে উজবেকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচের আগে।
পিএসজির মিডফিল্ডার নেভেসের কাছে পর্তুগাল দলে রোনালদোর ভূমিকা জানতে চাইলে তিনি বলেছিলেন, "রোনালদো আমাদের জাতীয় দলের জন্য কী করেছেন, তা আমরা সবাই জানি। কিন্তু এই মুহূর্তে তিনি আমাদেরই একজন। তিনি দলের অন্য সবার মতোই একজন খেলোয়াড়, যিনি দলকে সাহায্য করতে চান। তিনি অন্যদের থেকে আলাদা নন।"
তার এই মন্তব্যের পর রোনালদোর সমর্থকেরা নেভেস, ব্রুনো ফার্নান্দেসসহ আরও কয়েকজনের সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টে গিয়ে তাদের বিরুদ্ধে পর্তুগাল অধিনায়কের প্রতি অসম্মান দেখানোর অভিযোগ তোলেন।
বিশ্বজুড়ে সুপারস্টার হিসেবে রোনালদোর জনপ্রিয়তা বিবেচনায় নিলেও এই প্রতিক্রিয়া ছিল নজিরবিহীন। 'রেকর্ড' পত্রিকার সাংবাদিক ভিতর পিন্তো বলেন, "এটি জাতীয় দলের ভেতরে সম্ভাব্য এক ধরনের গৃহযুদ্ধের ঝুঁকির ইঙ্গিত।"
পরিস্থিতি হয়তো এতটা বড় হতো না, যদি রোনালদোর ঘনিষ্ঠজনেরাও বিতর্কে জড়িয়ে না পড়তেন। রোনালদোর সঙ্গী জর্জিনা রদ্রিগেজ নেভেসের বান্ধবী মাদালেনা আরাগাওয়ের নামে ছড়ানো একটি ভুয়া উদ্ধৃতির প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন। যদিও পরে তিনি সেটি মুছে ফেলেন।
অন্যদিকে রোনালদোর দুই বোন কাতিয়া ও এলমা আভেইরো এমন পোস্ট শেয়ার করেন, যাতে ইঙ্গিত দেওয়া হয় যে রোনালদোকে দল থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
পর্তুগালের সবচেয়ে বেশি দর্শকপ্রিয় টেলিভিশন চ্যানেল সিএমটিভিতেও বিষয়টি আলোচনায় আসে। সেখানে বিশ্লেষক ও আইনজীবী লুইস মিগেল এনরিকে জিনেদিন জিদানের নামে ছড়ানো একটি ভুয়া উদ্ধৃতি ব্যবহার করে রোনালদোর পক্ষে যুক্তি দেন।
বিতর্ক এতটাই তীব্র হয়ে ওঠে যে তা জাতীয় দলের পাম বিচ ক্যাম্পেও পৌঁছে যায়। সংবাদ সম্মেলনে বারবার প্রশ্ন ওঠে—"পর্তুগাল কি এখন দুই ভাগে বিভক্ত, একদল রোনালদোর পক্ষে আর অন্যদল বিপক্ষে?"
এ ধরনের প্রশ্নে বিরক্তি প্রকাশ করেন ডিফেন্ডার রুবেন দিয়াস। তিনি বলেন, "এটি আলোচনার বিষয়ই হওয়া উচিত নয়।"
পরদিন দিয়োগো দালোত বলেন, "আমরা জানি, অনেক মানুষ আছে যারা চায় না পর্তুগাল জিতুক।"
কারা তারা, তা বলতে অস্বীকৃতি জানিয়ে তিনি যোগ করেন, "সবার নাম বলতে গেলে আমরা আর এখান থেকে বেরোতেই পারব না। সেটা আমার কাজ নয়।"
দলের ভেতরের এই চাপ থেকে মুক্তি পেতে উজবেকিস্তানের বিপক্ষে বড় জয়ই এখন পর্তুগালের প্রধান লক্ষ্য। আর সেই জয়ে রোনালদোর গোল থাকলে পরিস্থিতি আরও সহজ হতে পারে।
'মনে হয় একজন মানুষ দলের সামষ্টিক স্বার্থের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছেন'
২০২২ বিশ্বকাপে ঘানার বিপক্ষে পেনাল্টি থেকে গোল করার পর বড় কোনো আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে টানা ১০ ম্যাচ ধরে গোলবিহীন রয়েছেন রোনালদো।
ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে ম্যাচে তিনি তিনটি শট নিয়েছিলেন, যা ম্যাচে সর্বোচ্চ। কিন্তু একটিও লক্ষ্য ভেদ করতে পারেনি।
এসআইসি নোটিসিয়াসের বিশ্লেষক লুইস আগুইলার বলেন, "রোনালদোকে ঘিরে আলোচনায় অনেক সময় মনে হয় যেন পর্তুগাল নয়, রোনালদোর দেশ খেলছে।"
তিনি আরও বলেন, "মনে হয় একজন মানুষ দলের সামষ্টিক স্বার্থের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছেন। যেন রোনালদোর জন্য সবকিছু ঠিকঠাক হওয়াই দলের সাফল্যের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অথচ এমন হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।"
আগুইলারের মতে, "আজকের বাস্তবতা হলো, লিওনেল মেসির সঙ্গে যতই তুলনা করা হোক না কেন, রোনালদো আর পর্তুগালের সেরা খেলোয়াড় নন। কিন্তু মেসি এখনো আর্জেন্টিনার সেরা খেলোয়াড়।"
উদ্বোধনী ম্যাচে হতাশাজনক পারফরম্যান্সের পরও রোনালদো পুরো ৯০ মিনিট মাঠে ছিলেন। কোচ রবার্তো মার্তিনেজের অধীনে তিনি ৩০টি ম্যাচে শুরুর একাদশে ছিলেন এবং এর মধ্যে মাত্র ১৩ বার বদলি হয়েছেন। ৬০ মিনিটের আগে তাকে মাঠ ছাড়তে হয়েছে মাত্র একবার, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে আর্মেনিয়ার বিপক্ষে ৫-০ গোলের জয়ের ম্যাচে।
রোনালদোকে নিয়ে'আ বোলা'র নির্বাহী পরিচালক লুইস মাতেউস বলেন, "তিনি (রোনালদো) সমাধান নন, আর সেটাই তাকে সমস্যার অংশ করে তুলেছে।"
তার ভাষায়, "একসময় তার (রোনালদো) গোল করার ক্ষমতা রক্ষণে সীমিত অবদানের ঘাটতি পূরণ করে দিত। এখন তিনি গোলও পাচ্ছেন না। ফলে পুরো আক্রমণভাগে প্রভাব পড়ছে। সতীর্থরা এখনও তাকে বল দেওয়ার চেষ্টা করে, এমনকি আরও ভালো বিকল্প থাকলেও। ফলে তিনি আক্রমণাত্মক ছন্দের সঙ্গে পুরোপুরি খাপ খাওয়াতে পারছেন না।"
মাতেউস আরও বলেন, "তিনি মাঠে আছেন কৃতজ্ঞতার কারণে, বর্তমান পারফরম্যান্সের কারণে নয়।"
সম্প্রতি জিরোজিরো ওয়েবসাইটের এক জরিপে দেখা গেছে, ভোট দেওয়া পর্তুগাল সমর্থকদের ৬৩ শতাংশই উজবেকিস্তানের বিপক্ষে রোনালদোকে শুরুর একাদশে দেখতে চান না।
২০১০ সালের পুনরাবৃত্তি এড়াতে চায় পর্তুগাল
বিশ্বকাপে জাতীয় দলের হয়ে গোল না পাওয়ায় সমালোচনার মুখে পড়া রোনালদোর জন্য এটি প্রথম ঘটনা নয়।
২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে যাওয়ার সময় পরিস্থিতি আরও কঠিন ছিল। তখন তিনি টানা দুই বছর পর্তুগালের হয়ে কোনো প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে গোল করতে পারেননি।
তবে সে সময় বিষয়টি তিনি হালকাভাবেই নিয়েছিলেন। রোনালদো বলেছিলেন, "গোল অনেকটা কেচাপের মতো। যখন আসে, তখন একসঙ্গেই আসে।"
অবশেষে তিনি সেই গোলখরা কাটান উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে পর্তুগালের ৭-০ গোলের জয়ে। তবে সেটিই ছিল ওই বিশ্বকাপে তার একমাত্র গোল। পরে শেষ ষোলোতে স্পেনের কাছে হেরে বিদায় নেয় কার্লোস কুইরোজের দল।
বর্তমানে পোর্তোর সভাপতি এবং সাবেক টটেনহ্যাম ও চেলসি কোচ আন্দ্রে ভিলাস-বোয়াস বলেন, "এখন কিছু বিষয় নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। সমুদ্রসৈকতে কম সময় কাটিয়ে মিটিং রুমে বেশি সময় দেওয়া প্রয়োজন।"
তিনি আরও বলেন, "আমাদের লক্ষ্য এখনও বিশাল। এটি একটি সোনালি প্রজন্ম, আর আমরা চাই যে মানুষটি দেশের জন্য এত কিছু করেছেন, তিনি যেন মেসির মতোই বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে নিয়ে বিদায় নিতে পারেন।"
তবে ভিলাস-বোয়াস মনে করেন, খেলানোর সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত কোচেরই। তার ভাষায়, "মার্তিনেজ পরিস্থিতি অনুযায়ী রোনালদোর খেলার সময় নির্ধারণ করবেন। তবুও আমি বিশ্বাস করি, এই দলের প্রতিভা অনেক বেশি এবং তারা আরও ভালো ছাপ রেখে যেতে সক্ষম।"
পর্তুগাল শিবিরে চলমান বিভক্তির বিতর্ক থামাতে হলে মাঠের পারফরম্যান্সই এখন সবচেয়ে সেরা উত্তর হতে পারে।
