বিরল খনিজের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় ব্রাজিলকে কৌশলগত অংশীদার করছে ইইউ
শিল্পোৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ বিরল খনিজ সম্পদের বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় বৈচিত্র্য আনার অংশ হিসেবে এবার ব্রাজিলের দিকে ঝুঁকছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। এই লক্ষ্যে তারা ব্রাজিলকে এমন একটি অংশীদারিত্বের প্রস্তাব দিচ্ছে, যা দেশটির নিজস্ব উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে অত্যন্ত লাভজনক ভূমিকা রাখবে। গত শনিবার রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইইউ-এর আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব বিষয়ক কমিশনার জোজেফ সিকেলা এ তথ্য জানান।
ব্রাজিলের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় মিনাস জেরাইস রাজ্যের পকোস ডি কালডাসে অস্ট্রেলীয় খনি কোম্পানি ভিরিডিস মাইনিং অ্যান্ড মিনারেলসের বিরল খনিজ (রেয়ার আর্থ) গবেষণা ও প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র পরিদর্শন করেন এই ইইউ কমিশনার। ইইউ ও ব্রাজিলের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা আরও গতিশীল করার জন্য যে চারটি অগ্রাধিকারমূলক প্রকল্প নির্বাচন করা হয়েছে, এটি তার মধ্যে অন্যতম।
জোজেফ সিকেলা বলেন, ইউরোপের এই নতুন পদক্ষেপটি মূলত টেকসই ব্যবসা এবং স্থানীয় পর্যায়েই বিরল খনিজ প্রক্রিয়াকরণের ওপর বিশেষভাবে জোর দিচ্ছে। ব্রাজিলের বর্তমান নীতির সঙ্গেও বিষয়টি পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ। কারণ, খনিজ খাতের কাঁচামাল সরাসরি রপ্তানি না করে, নিজেদের দেশেই প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে উচ্চ-মূল্যের খনিজ পণ্য রপ্তানি করতে চায় ব্রাজিল।
উল্লেখ্য, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের অনাবিষ্কৃত মজুদ রয়েছে ব্রাজিলে।
ভিরিডিসের খনিজ কেন্দ্র পরিদর্শনের সময় দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কমিশনার সিকেলা বলেন, "সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ব্রাজিল যেন কম মুনাফার এই কাঁচামাল বিক্রির ব্যবসা থেকে বেরিয়ে আসতে পারে; অর্থাৎ খনিজের আসল মূল্য বা রূপান্তর যেন এই দেশের মাটিতেই তৈরি হয়।" একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমানে লাতিন আমেরিকার মধ্যে ব্রাজিলই ইউরোপীয় ইউনিয়নের সর্বাধিক কৌশলগত অংশীদার এবং একটি ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক শক্তি।
সিকেলা আরও জানান, এই অংশীদারিত্বের ফলে ইইউ সরাসরি ক্রয় চুক্তির মাধ্যমে খনিজের সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারবে। অন্যদিকে, এটি ব্রাজিলকে তাদের খনিজ পরিশোধন সক্ষমতা বাড়াতে, নতুন প্রযুক্তির নাগাল পেতে এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে আরও উচ্চ-মুনাফা অর্জনের স্তরে পৌঁছাতে সাহায্য করবে।
মিনাস জেরাইস রাজ্যে গত মে মাসে চালু হওয়া ভিরিডিসের পাইলট খনি প্রকল্পটি প্রতি ঘণ্টায় ১০০ কেজি আকরিক প্রক্রিয়াকরণ করতে পারে এবং বছরে ২.৯২ কেজি পর্যন্ত মিশ্র বিরল খনিজ কার্বনেট (এমআরইসি) উৎপাদনে সক্ষম।
এই রাজ্যে ২২৮.৬২ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে লাইসেন্সপ্রাপ্ত এই খনি অঞ্চলে একটি বাণিজ্যিক প্ল্যান্ট স্থাপনের জন্য ৩৬০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছে ভিরিডিস। ২০২৮ সাল থেকে ঐ কারখানায় বার্ষিক ১৫ হাজার টন এমআরইসি উৎপাদন করা যাবে।
"আর ঠিক এই কারণেই ভিরিডিসের এই বিশেষ প্রকল্পটি আমার এত পছন্দ হয়েছে। কারণ এটি মূলত আমাদের মূল লক্ষ্যগুলোই পূরণ করছে: এটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে, নতুন অংশীদারিত্ব তৈরি করছে, নতুন প্রযুক্তি নিয়ে আসছে এবং শিক্ষা ও জ্ঞান স্থানান্তরে ভূমিকা রাখছে—যার সবকিছুই সবচেয়ে উন্নত পরিবেশগত, সামাজিক ও প্রযুক্তিগত মানদণ্ড মেনে করা হচ্ছে," বলেন সিকেলা।
চুক্তির হাতছানি
সিকেলা আরও উল্লেখ করেন, এমআরইসি সরবরাহের জন্য চলতি মাসেই ভিরিডিস এবং বেলজিয়ামের রাসায়নিক কোম্পানি সলভয়–এর মধ্যে একটি নন-বাইন্ডিং সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে, যা পরবর্তীতে প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়াকরণ সহায়তাসহ একটি বৃহত্তর অংশীদারিত্বে রূপ নিতে পারে।
ভিরিডিসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) রাফায়েল মোরেনো রয়টার্সকে জানিয়েছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে তাদের আলোচনা এখন বেশ অগ্রসর পর্যায়ে রয়েছে। সলভয়ের সঙ্গে চুক্তিটি আগামী জুলাইয়ের শেষের মধ্যেই চূড়ান্ত হতে পারে।
ব্রাজিলে ভিরিডিসের এই অগ্রগতি এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন বিশ্বজুড়ে বিরল খনিজ এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ নিয়ে এক তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে। বিশেষ করে বৈদ্যুতিক গাড়ি এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এই উপাদানগুলোর ক্ষেত্রে শীর্ষ উৎপাদক দেশ চীনের ওপর থেকে নিজেদের নির্ভরতা কমাতে চাইছে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র।
এই বৈশ্বিক পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাওয়া হলে সিকেলা বলেন, করোনা মহামারী এবং ইউক্রেন যুদ্ধের মতো বড় বড় ধাক্কার পর বিশ্বজুড়ে সরবরাহ শৃঙ্খলের "নির্ভরতা" কমিয়ে আনাই ইউরোপীয় কৌশলের মূল লক্ষ্য। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই সমস্যাটি কেবল এককভাবে চীনকে কেন্দ্র করেই নয়।
তিনি আরও বলেন, ইইউ ব্রাজিলে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খনিজ যেমন নিকেল এবং লিথিয়াম সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোকেও অগ্রাধিকার দিচ্ছে। ব্রাজিল সরকারের সঙ্গে একটি আনুষ্ঠানিক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে, যদিও এর খুঁটিনাটি বিষয়গুলো নিয়ে এখনও আলোচনা চলছে।
ব্রাজিলের এই খনিজ সম্পদের প্রতিযোগিতায় ইইউ কিছুটা দেরিতে মাঠে নেমেছে কিনা—এমন প্রশ্নের জবাবে সিকেলা যুক্তি দেন যে, "অন্যদের চেয়ে আমাদের দেওয়া প্রস্তাব বা মূল্য অনেক বেশি লাভজনক ও কল্যাণকর।" এই পার্থক্যের পেছনে তিনি টেকসই উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শিক্ষাক্ষেত্রে সহায়তার মতো মূল বিষয়গুলোকে প্রধান নিয়ামক হিসেবে উল্লেখ করেন।
ভিরিডিস সিইও মোরেনো বলেন, বিরল খনিজের সরবরাহ শৃঙ্খলে বৈচিত্র্য আনার ক্ষেত্রে তাদের কোম্পানি ইউরোপীয় নীতিমালার সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখছে, যা মূলত একাধিক অঞ্চলের অংশীদারদের জন্য উন্মুক্ত একটি দৃষ্টিভঙ্গিকে সমর্থন করে।
গত মাসের শেষের দিকেও তিনি রয়টার্সকে জানিয়েছিলেন, ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য ক্রেতাদের সঙ্গে ভিরিডিস বর্তমানে বেশ অগ্রসর পর্যায়ের আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
