প্রস্তাবিত শুল্ক মূল্যায়নে লুব্রিকেন্টের বাজারে ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা স্টেকহোল্ডারদের
সিন্থেটিক ও সেমি-সিন্থেটিক লুব্রিকেন্টের নির্দিষ্ট শুল্ক মূল্যের পরিবর্তে ফ্লোটিং (পরিবর্তনশীল) ফর্মুলা চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বাজেটে। ইন্ডিপেন্ডেন্ট কমোডিটি ইন্টেলিজেন্স সার্ভিসেসের (আইসিআইএস) দরের মূল্যায়নের ভিত্তিতে তৈরি এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করছেন দেশের লুব্রিক্যান্ট খাত-সংশ্লিষ্টরা।
এ শিল্পের স্টেকহোল্ডাররা বলছেন, ফিনিশড লুব্রিকেন্টের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কোনো আইসিআইএস বেঞ্চমার্ক না থাকায় এই প্রস্তাবটি কর পরিপালন জোরদার করার বদলে উল্টো শুল্ক মূল্যায়ন নিয়ে বিরোধ, রাজস্ব ফাঁকি ও বাজারে ভারসাম্যহীনতার ঝুঁকি তৈরি করছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) আমদানিকৃত সিন্থেটিক ও সেমি-সিন্থেটিক লুব্রিকেন্টের বিদ্যমান ফিক্সড ন্যূনতম শুল্ক মূল্যের পরিবর্তে আইসিআইএস প্রকাশিত আন্তর্জাতিক দর মূল্যায়নের সঙ্গে ন্যূনতম ৩০ শতাংশ মার্কআপ যুক্ত করে একটি ফ্লোটিং মূল্যায়ন ফর্মুলা ব্যবহারের প্রস্তাব দিয়েছে।
বর্তমানে বাংলাদেশে সেমি-সিন্থেটিক লুব্রিকেটিং তেলের ন্যূনতম শুল্ক মূল্য প্রতি টনে ৩ হাজার ২০০ ডলার। আর সিন্থেটিক লুব্রিকেটিং তেলের ক্ষেত্রে তা টনপ্রতি ৫ হাজার ডলার। বাজেট প্রস্তাবে এই পৃথক মানদণ্ডগুলো বাতিল করে আইসিআইএস-ভিত্তিক একটি সাধারণ মূল্যায়ন পদ্ধতি চালুর কথা বলা হয়েছে।
কিন্তু শিল্প-সংশ্লিষ্টরা যুক্তি দিচ্ছেন, প্রস্তাবিত এই ব্যবস্থা রাজস্ব সুরক্ষার মূল লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হতে পারে। কারণ ফিনিশড সিন্থেটিক বা সেমি-সিন্থেটিক লুব্রিকেন্টকে স্বতন্ত্র পণ্য হিসেবে ধরে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কোনো বেঞ্চমার্ক মূল্য প্রকাশ করে না আইসিআইএস।
তারা আশঙ্কা করছেন, নতুন এই পদ্ধতি শুল্ক মূল্যায়ন ব্যবস্থা শক্তিশালী করার বদলে মূল্যায়ন নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি করতে পারে। রচারা এ ব্যবস্থা মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আমদানিকে উৎসাহিত করার পাশাপাশি বাজারে নিম্নমানের পণ্যের প্রবেশ সহজ করে তুলবে।
বাংলাদেশ লুব ব্লেন্ডার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, বর্তমানে দেশের লুব্রিকেন্ট বাজারের আকার প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা। বছরে চাহিদা প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার থেকে ১ লাখ ৭০ হাজার টন। দেশীয় চাহিদার অর্ধেকেরও বেশি এখন স্থানীয় ব্লেন্ডিং কোম্পানিগুলো পূরণ করছে।
পরিবহন, শিল্পোৎপাদন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, কৃষি ও নির্মাণ খাতে চাহিদা বৃদ্ধির কারণে এই বাজার দ্রুত বড় হয়েছে।
বাংলাদেশে মবিল, বিপি, টোটালএনার্জিস, ক্যাস্ট্রল ও পেট্রোনাসের মতো শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো কার্যক্রম পরিচালনা করছে। অন্যদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান যমুনা অয়েল, পদ্মা অয়েল ও মেঘনা পেট্রোলিয়াম ব্লেন্ডিং ও বিপণনের সঙ্গে যুক্ত। এছাড়া লুব-রেফ বাংলাদেশ-এর মতো স্থানীয় কোম্পানিগুলোও বাজারে উল্লেখযোগ্য অবস্থান তৈরি করেছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের আপত্তির কারণ
এনবিআরে জমা দেওয়া এক সুপারিশপত্রে খাতসংশ্লিষ্টরা বলেছেন, আইসিআইএস বিভিন্ন শ্রেণির বেজ অয়েলের মূল্য প্রকাশ করলেও ফিনিশড সিন্থেটিক কিংবা সেমি-সিন্থেটিক লুব্রিকেন্টের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কোনো রেফারেন্স মূল্য প্রকাশ করে না।
তারা বলেন, ফিনিশড লুব্রিকেন্ট কেবল সাধারণ বেজ অয়েল নয়; এটি বিভিন্ন বেজ অয়েল, অ্যাডিটিভ প্রযুক্তি ও স্বত্বাধিকারী ফর্মুলার সমন্বয়ে উৎপাদিত উচ্চ প্রকৌশলসমৃদ্ধ পণ্য।
তাই এ শিল্পের উদ্যোক্তারা প্রশ্ন তুলেছেন, আইসিআইএসের কোন মূল্যটিকে মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করা হবে এবং এটি কোনো নির্দিষ্ট গ্রেড, ভিসকোসিটি লেভেল, বাজার নাকি নির্দিষ্ট সময়ের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারণ করা হবে?
এমজেএল বাংলাদেশ পিএলসি-র ব্যবস্থাপনা পরিচালক আজম জে চৌধুরী বলেন, সিন্থেটিক বা সেমি-সিন্থেটিক লুব্রিকেন্ট যেহেতু ব্লেন্ডেডপণ্য, তাই এগুলোর জন্য কোনো বৈশ্বিক আইসিআইএস মানদণ্ড নেই।
তিনি বলেন, 'এই তেলগুলো গ্রুপ-১, গ্রুপ-২, গ্রুপ-৩, গ্রুপ-৪ ও গ্রুপ-৫ বেজ অয়েলের বিভিন্ন সংমিশ্রণে তৈরি করা হয়। এর সুনির্দিষ্ট ফর্মুলাটি উৎপাদনকারীদের পেটেন্ট ও বাণিজ্যিক গোপনীয়তার অংশ। শুল্ক কর্তৃপক্ষের পক্ষে এই উপাদানগুলোর সংমিশ্রণ নির্ধারণ করে অভিন্ন মূল্য হিসাব করা সম্ভব নয়।'
তিনি আরও বলেন, উৎপাদনকারীদের ব্যবহৃত প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে সিন্থেটিক লুব্রিকেন্ট হিসেবে লেবেল করা দুটি পণ্যের ফর্মুলা এবং উৎপাদন খরচ সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে।
রাজস্ব ক্ষতি ও বাজারের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি
স্টেকহোল্ডারদের আশঙ্কা, প্রস্তাবিত এই মূল্যায়ন পদ্ধতি আমদানির প্রকৃত মূল্য ও শুল্ক কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত মূল্যের মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি করবে, যা অজান্তেই সরকারের রাজস্ব কমিয়ে দিতে পারে। তারা বলেন, উচ্চমানের সিন্থেটিক লুব্রিকেন্ট বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি মেট্রিক টন প্রায় ৬ হাজার ডলার বা তার বেশি মূল্যে লেনদেন হচ্ছে। অথচ প্রস্তাবিত আইসিআইএস-ভিত্তিক ফর্মুলার কারণে কিছু ক্ষেত্রে এই মূল্যায়নের পরিমাণ অনেক কম হতে পারে।
তারা সতর্ক করে দিয়ে বলেন, এ ধরনের ব্যবধানের ফলে আন্ডার-ইনভয়েসিং বা কম মূল্য দেখানোর প্রবণতা উৎসাহিত হতে পারে। এতে কাস্টমস শুল্ক, ভ্যাট, আগাম কর (এটি) ও অগ্রিম আয়কর (এআইটি) আদায় কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এছাড়া আমদানিমূল্য কারসাজির মাধ্যমে বাণিজ্যভিত্তিক অর্থ পাচারের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে বলে তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
খাত-সংশ্লিষ্টরা আরও বলেন, ফিনিশড লুব্রিকেন্টের মূল্য কেবল বেজ অয়েলের দামের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারণ করা যায় না। এর চূড়ান্ত মূল্য উন্নত অ্যাডিটিভ প্যাকেজ, গবেষণা ও উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক উৎপাদনকারীদের অনুমোদন, প্যাকেজিং ও সরবরাহ চেইনের খরচের মতো বেশ কিছু বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। অনেক প্রিমিয়াম লুব্রিকেন্টের ক্ষেত্রে, উৎপাদন খরচের একটি বড় অংশজুড়েই থাকে এই অ্যাডিটিভ, যা অনেক সময় বেজ অয়েলের মূল্যকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
স্টেকহোল্ডাররা বলছেন, বেজ অয়েল-সংশ্লিষ্ট মানদণ্ডের ওপর অভিন্ন ৩০ শতাংশ মার্কআপ প্রয়োগ করা হলে ফিনিশড লুব্রিকেন্ট পণ্যের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করা সম্ভব হবে না।
তারা আশঙ্কা করছেন, অস্পষ্ট মূল্যায়ন প্রক্রিয়া অসম প্রতিযোগিতার সৃষ্টি করতে পারে। এর ফলে যেসব ব্যবসায়ী আমদানিমূল্য কম দেখাবেন, তারা নিয়ম মেনে আসল ব্র্যান্ডের পণ্য আমদানি করা কোম্পানিগুলোর তুলনায় অন্যায্য সুবিধা পাবেন।
শিল্পের প্রতিনিধিদের মতে, এটি বাজারে নিম্নমানের লুব্রিকেন্টের প্রবেশকে উৎসাহিত করতে পারে। এতে যানবাহন, শিল্প যন্ত্রপাতি, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও কৃষি সরঞ্জামের জন্য ঝুঁকি তৈরি হবে। তারা আরও বলেন, আধুনিক ইঞ্জিন, বিশেষত হাইব্রিড ও উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন যানবাহনের জন্য এমন লুব্রিকেন্ট প্রয়োজন যা কঠোর প্রযুক্তিগত মান পূরণ করে। এসব ক্ষেত্রে অনুপযোগী পণ্য ব্যবহার করা হলে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি যন্ত্রপাতির কার্যক্ষমতা কমে যেতে পারে।
এনবিআরের একজন কর্মকর্তা টিবিএসকে বলেন, রাজস্ব কর্তৃপক্ষ বিষয়টি নিয়ে লুব্রিকেন্ট আমদানিকারক ও স্থানীয় ব্লেন্ডিং কোম্পানি, উভয় পক্ষের সঙ্গেই আলোচনা করছে।
ওই কর্মকর্তা বলেন, 'শিল্পসংশ্লিষ্টদের থেকে আবেদন পাওয়ার পর আমরা উভয় পক্ষের সঙ্গেই কথা বলছি। আমরা এমন একটি নীতিমালা প্রণয়ন করতে চাই যা যথাযথ রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করার পাশাপাশি কোনো শিল্পেরই ক্ষতি করবে না।'
তিনি আরও বলেন, চূড়ান্ত বাজেটে এসব পরিবর্তনের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে।
বাংলাদেশে পেট্রোনাস লুব্রিকেন্টসের পরিবেশক ইউনাইটেড লুব অয়েল লিমিটেডের পরিচালক (সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং) ওয়ায়েজ মাহমুদ বলেন, লুব্রিকেন্ট আমদানিতে আইসিআইএস-ভিত্তিক শুল্ক মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালুর জন্য এটি উপযুক্ত সময় নয়।
তিনি বলেন, ফিনিশড লুব্রিকেন্ট পণ্যের জন্য বাস্তবে অস্তিত্বহীন মূল্যের মানদণ্ডের ওপর নির্ভর না করে এনবিআরের উচিত প্রকৃত আমদানি তথ্য ও ঘোষিত লেনদেন মূল্যের ওপর নির্ভর করা।
ওয়ায়েজ টিবিএসকে বলেন, 'লুব্রিকেন্ট বাজারের প্রায় ৮০ শতাংশই মিনারেল অয়েল, যেখানে সিন্থেটিক ও সেমি-সিন্থেটিক তেলের অংশ তুলনামূলকভাবে কম। বিভিন্ন গ্রুপের বেজ অয়েলের নানা সংমিশ্রণ ব্যবহার করে সিন্থেটিক লুব্রিকেন্ট তৈরি করা হয়। তাই আইসিআইএস রেফারেন্সের ওপর ভিত্তি করে এর অভিন্ন মূল্য নির্ধারণ করা অসম্ভব।'
তিনি আরও বলেন, এনবিআরের উচিত রপ্তানিকারকদের ঘোষিত মূল্য ও সাম্প্রতিক আমদানি পরিসংখ্যানের সহায়তা নিয়ে বিভিন্ন আমদানিকারকের গড় আমদানি মূল্যের ওপর ভিত্তি করে তথ্যনির্ভর পদ্ধতি গ্রহণ করা।
