যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি হলেও তেল-গ্যাস সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক হবে না
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আগামী শুক্রবার একটি চুক্তি সই, এবং এর ফলে অবরুদ্ধ হরমুজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত হওয়ার আশু সম্ভাবনা দেখা দিলেও—এর অর্থ এই নয় যে, তেল ও গ্যাস বাণিজ্য দ্রুতই আগের মাত্রায় ফিরে যাবে। এই চুক্তির ঘোষণা কেবল প্রথম পদক্ষেপ মাত্র এবং এই অঞ্চল থেকে বিশ্ববাজারগামী তেল ও গ্যাসের চালান যুদ্ধ-পূর্ববর্তী স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে কয়েক মাস সময় লেগে যেতে পারে।
সাড়ে তিন মাস আগে হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ার পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো দৈনিক ১ কোটি (১০ মিলিয়ন) ব্যারেলেরও বেশি খনিজ তেল উত্তোলন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। উৎপাদকদের জন্য তেলকূপগুলো থেকে আগের মতো পূর্ণ মাত্রায় উত্তোলন শুরু করতেও কয়েক মাস সময় লাগবে। অন্যদিকে, আগামী শুক্রবার প্রত্যাশা অনুযায়ী হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়া হলেও এর বর্তমান পরিস্থিতি ঠিক কেমন, তা এখনও অস্পষ্ট।
যুক্তরাষ্ট্রের কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির 'সেন্টার অন গ্লোবাল এনার্জি পলিসি'-র সিনিয়র ফেলো ড্যানিয়েল স্টার্নফ গত রোববার বার্তাসংস্থা এপি-কে বলেন, "আমরা ঠিক জানি না (হরমুজ) 'উন্মুক্ত' বলতে আসলে কী বোঝানো হচ্ছে বা সেখানে আটকে থাকা জ্বালানি কত দ্রুত খালাস বা সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।"
সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) মতো কিছু উৎপাদক দেশ ইরাকের মতো দেশের তুলনায় দ্রুত উৎপাদন স্বাভাবিক করতে পারবে। যুদ্ধ চলাকালে ইরাককে তাদের উৎপাদনের একটি বিশাল অংশ হ্রাস করতে হয়েছিল, কারণ দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় তেলক্ষেত্রগুলো থেকে বসরা হয়ে অপরিশোধিত তেল বাইরে পাঠানো বা রপ্তানির কোনো বিকল্প পথ ছিল না।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি গবেষণা ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান উড ম্যাকেঞ্জি-র রিফাইনিং, কেমিক্যালস এবং অয়েল মার্কেটস বিষয়ের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যালান গেল্ডার বলেন, "ইরাকের মতো দেশগুলো অনেক বেশি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। কারণ তাদের দীর্ঘ সময় ধরে অনেক বড় আকারের উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছে এবং তাদের তেলক্ষেত্রগুলোর বৈশিষ্ট্যও বেশ জটিল।"
এই বিশেষজ্ঞ এপি-কে আরও বলেন, "তাদের আগের অবস্থায় ফিরে যেতে পুরো এক বছর সময় লেগে যেতে পারে।"
গত মে মাসের শেষে উড ম্যাকেঞ্জির বিশ্লেষকরা বলেছিলেন, তেলক্ষেত্র পরিচালনাকারীরা (অপারেটর) যদি একটি পরিমাপিত ও নিয়ন্ত্রিত উপায়ে উৎপাদন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত তেলক্ষেত্রগুলো তিন মাসের মধ্যে আগের উৎপাদনের ৭০ শতাংশ এবং ছয় মাসের মধ্যে ৯০ শতাংশে ফিরে যেতে পারে। তবে জ্বালানি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানটির মতে, অবশিষ্ট প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন পূর্বাবস্থায় ফেরাতে উল্লেখযোগ্যভাবে দীর্ঘ সময় লাগবে।
স্যাক্সো ব্যাংকের কমোডিটি স্ট্র্যাটেজির প্রধান ওলে হ্যানসেনের মতে, "সরবরাহ শৃঙ্খল কত দ্রুত স্বাভাবিক হচ্ছে এবং রপ্তানি প্রবাহ কতটা পুনরুদ্ধার হচ্ছে, তা বাজারে ভূরাজনৈতিক ঝুঁকির কারণে তৈরি হওয়া বাড়তি দামের (রিস্ক প্রিমিয়াম) স্থায়িত্ব নির্ধারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।"
ইতোমধ্যে বেশ কিছু শিপিং বা নৌ-পরিবহন কোম্পানি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, আগামী শুক্রবার চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত হওয়ার আগে তারা হরমুজ প্রণালী পার হওয়ার কোনো চেষ্টা করবে না। এমনকি যেসব জাহাজের মালিকরা এই প্রণালী পার হতে ইচ্ছুক, তাদের জন্যও বিমা (ইন্সুরেন্স) নিশ্চিত করা এবং অন্যান্য ব্যবহারিক জটিলতা দূর করতে গিয়ে পুনরুদ্ধারের এই প্রক্রিয়া আরও বিলম্বিত হতে পারে।
এক কথায়, বাস্তবতা হচ্ছে— হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়ার এই সমঝোতা ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার যুদ্ধের অবসান যদি ঘটাতেও পারে, তবু তেল ও গ্যাস শিল্পের জন্য এটি হবে মূলত এক দীর্ঘ ও জটিল পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ার শুরু মাত্র।
