চুক্তির আওতায় হরমুজ প্রণালিতে কখনোই টোল দিতে হবে না: ট্রাম্প
ইরানের সঙ্গে চুক্তিতে পৌঁছালে হরমুজ প্রণালিতে 'আর কখনোই কোনো টোল দিতে হবে না' বলে দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। রোববার বিকেলে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন।
ট্রাম্প এ-ও হুঁশিয়ারি দেন, ইরান যদি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চূড়ান্ত পারমাণবিক চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়, তবে তিনি আবার তেহরানে হামলা শুরু করবেন। অথবা এই অঞ্চলের মোট রাজস্বের ২০ শতাংশের বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রকে 'মধ্যপ্রাচ্যের পাহারাদার' বানাবেন।
তার সহকারীদের মতে, শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে এই পারমাণবিক চুক্তির চূড়ান্ত প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে।
এ সময় তিনি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, এই নেতারা চুক্তিতে পৌঁছাতে সাহায্য করেছেন বা অন্তত প্রণালির অবরোধে কোনো বাধা দেননি।
গত মাসে চীন সফরে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দেখা করেছিলেন ট্রাম্প। শি সম্পর্কে তিনি বলেন, 'উনি পুরোপুরি একজন ভদ্রলোক। তিনি অবরোধ ভাঙতে দুই পাশে ২০টি করে ডেস্ট্রয়ারসহ কোনো তেলের ট্যাংকার পাঠাননি।' এমনটা করলে চীন ও আমেরিকার নৌবাহিনীর মধ্যে সংঘাত বেধে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল।
মধ্যপ্রাচ্যের 'ভাড়াটে পুলিশ' হবে যুক্তরাষ্ট্র?
অর্থের বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যের পুলিশ বাহিনী হিসেবে কাজ করবে—ট্রাম্পের এমন দাবি সত্যিই বিস্ময়কর। এর মানে হলো, প্রেসিডেন্ট মূলত এই অঞ্চলে আমেরিকার সুরক্ষাবলয়কে মুনাফার বিনিময়ে একটি 'ভাড়াটে বাহিনীতে' পরিণত করতে চান। এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে চলে আসা মার্কিন প্রথার সম্পূর্ণ পরিপন্থী, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বজুড়ে শান্তি ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে নিজেদের শক্তি ব্যবহার করে।
অবশ্য বিশ্বের বিভিন্ন অংশে এ ধরনের চুক্তির কথা ট্রাম্প আগেও বলেছিলেন। তবে রোববার তাকে যখন প্রশ্ন করা হয় যে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো মার্কিন মিত্র উপসাগরীয় দেশগুলো এই ব্যবস্থায় রাজি হয়েছে কি না, তখন তিনি সরাসরি কোনো উত্তর দেননি।
তিনি শুধু ইঙ্গিত দেন যে বিষয়টি নিয়ে কেবল আলোচনা শুরু হয়েছে এবং ইরান যদি আগ্রাসন চালাতে থাকে, তবেই এটি বাস্তবায়ন হবে।
ইরানি নেতৃত্ব ও চুক্তির বিভিন্ন শর্ত
নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনিসহ ইরানের বর্তমান নেতৃত্বকে 'বাস্তববাদী' বলে উল্লেখ করেন ট্রাম্প।
যুদ্ধ শুরুর সময় তিনি যে সুরে কথা বলেছিলেন, রোববারের সুর ছিল তার সম্পূর্ণ বিপরীত। যুদ্ধ শুরুর সময় তিনি ইরানি জনগণকে মার্কিন ও ইসরায়েলি বোমা হামলা শেষ হওয়ার পর নিজেদের সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে ক্ষমতা দখলের আহ্বান জানিয়েছিলেন।
সেই কথা মনে করিয়ে দিলে ট্রাম্প স্বীকার করেন যে, তিনি তা বলেছিলেন। তবে তিনি এ-ও বলেন, ইরানি জনগণের কাছে অস্ত্র নেই, আর তারা যদি এমন চেষ্টা করে, তবে তাদের নির্বিচারে হত্যা করা হবে।
তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইরানের নেতারা যদি বিক্ষোভকারীদের হত্যা করেন, তবে তাদের ওপর থেকে পুরোপুরি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হবে না এবং আটকে থাকা ২৫ বিলিয়ন ডলারের তহবিলেও তাদের হাত দিতে দেওয়া হবে না।
তবে চুক্তির খসড়ায় এমন কোনো শর্তের কথা উল্লেখ নেই এবং পরবর্তী আলোচনায় এটি কতটা গুরুত্ব পাবে, তা-ও পরিষ্কার নয়।
চুক্তির খসড়া এখনো প্রকাশ করা হয়নি। তবে ট্রাম্প এমন কিছু ছাড়ের কথা বলেছেন, যা ইরান এখনো দেয়নি অথবা পরবর্তী আলোচনার জন্য মুলতুবি রেখেছে।
উদাহরণস্বরূপ, সমঝোতা স্মারকে মাত্র ৬০ দিনের জন্য প্রণালিতে টোল স্থগিত করার কথা বলা হয়েছে এবং ভবিষ্যতের বিষয়ে একটি আঞ্চলিক আলোচনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। অথচ যুদ্ধের আগে ইরান কখনোই টোল আদায় করেনি।
আগের চুক্তির সঙ্গে তুলনা
ট্রাম্প বারবার তার এই নতুন সমঝোতা স্মারকের সঙ্গে ২০১৫ সালে বারাক ওবামার সময়কার চুক্তির তুলনা করেছেন। তিনি দাবি করেন, তার চুক্তি নিশ্চিত করবে যে ইরান 'কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা কিনতে পারবে না।'
উল্লেখ্য, ১৯৭০ সালে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি অনুমোদনের সময়ই ইরান এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল এবং ওবামার আমলের চুক্তির প্রথম পৃষ্ঠায়ও এটি নিশ্চিত করা হয়েছিল।
গত তিন মাস ধরে ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জামাতা জ্যারেড কুশনারের নেতৃত্বে আলোচনা চলছে। ইরানিরা এ সময় জোর দিয়ে বলেছে যে চুক্তির অধীনে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকার তারা কখনোই ছাড়বে না।
ট্রাম্প বলেন, ইরান ২০ বছরের জন্য তাদের সমৃদ্ধকরণ স্থগিত করবে কি না, তা নিয়ে এখনো আলোচনা চলছে। ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন যে, ১৫ বছরের স্থগিতাদেশেও তিনি রাজি হতে পারেন, তবে সংবাদমাধ্যমের সাহায্যে এটি নিয়ে তিনি আলোচনা করতে চান না।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইরান সব সময়ের জন্য শুধু নিম্ন মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে পারবে, যা 'কখনোই সামরিক কাজে ব্যবহার করা যাবে না।'
তবে এই সীমা ওবামা আমলের চুক্তির (৩.৬৭ শতাংশ, যা বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহারযোগ্য কিন্তু পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য নয়) সমান কি না, তা জানতে চাওয়া হলে ট্রাম্প শুধু বলেন, নতুন চুক্তি নিশ্চিত করবে যে 'তারা কেবল বেসামরিক উদ্দেশ্যেই (ইউরেনিয়াম) সমৃদ্ধ করতে পারবে—চিরকালের জন্য।'
ওবামা প্রশাসনের চুক্তির সময় ইরান এই সমৃদ্ধকরণের সীমা মেনে চলেছিল এবং ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের শুরুর দিকেও তা অব্যাহত ছিল। কিন্তু ট্রাম্প ওই চুক্তি বাতিল করার পর, তেহরান উচ্চ মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করা শুরু করে।
