ইরান চুক্তির পরও তেল ও গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক হতে কয়েক মাস লাগতে পারে
রোববার ইরান যুদ্ধ অবসান এবং হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করার বিষয়ে চুক্তির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। তবে এর ফলে উচ্চ তেল ও পেট্রোলের দাম এবং জ্বালানি সরবরাহ সমস্যাগুলো রাতারাতি সমাধান হচ্ছে না।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বের চাহিদা পূরণ করার মতো পর্যায়ে কার্যক্রম পুনরায় শুরু করতে জ্বালানি কোম্পানিগুলোর সম্ভবত কয়েক মাস সময় লাগবে। অপরিশোধিত তেল পরিবহন ও পরিশোধনের ধীরগতির প্রক্রিয়া এবং প্রণালিটি দিয়ে চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে সংশয়ের কারণে এর প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে দেখা যাবে না বলে তারা জানান।
যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল ও পেট্রল সরবরাহের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ যে জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হতো, সেই পথ দিয়ে নিরাপদে চলাচল করতে না পেরে অপরিশোধিত তেলবোঝাই জাহাজগুলো তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে পারস্য উপসাগরে আটকে রয়েছে।
'মানুষের মধ্যে আস্থা ফিরে আসতে, বীমা সুবিধা কার্যকর হতে এবং বিশেষ করে স্থলভাগে কর্মীদের পাঠিয়ে এসব সম্পদ ও স্থাপনা পুনরায় চালু করতে সময় লাগবে,' বলেন এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল এনার্জির জ্বালানি ও পরিশোধন গবেষণা বিভাগের বৈশ্বিক প্রধান ড্যানিয়েল ইভান্স।
তবুও, চুক্তি ঘোষণার পর সোমবারের শুরুতে তেলের দাম কিছুটা কমে আসে।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৩ দশমিক ৪৫ ডলার কমে ৮৩ দশমিক ৮৯ ডলারে নেমে আসে। যুক্তরাষ্ট্রের মানদণ্ড অপরিশোধিত তেলের দাম ৪ দশমিক ০৩ ডলার কমে ব্যারেলপ্রতি ৮০ দশমিক ৮৫ ডলারে দাঁড়ায়।
তবে এসব দাম এখনও যুদ্ধ শুরুর আগে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৭০ ডলারের যে পর্যায়ে তেল লেনদেন হচ্ছিল, তার তুলনায় অনেক বেশি।
ইভান্স বলেন, উচ্চমূল্যের চাপ কমতে শুরু করলে দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা জাহাজগুলোকে প্রথমে প্রণালি অতিক্রম করে বের হতে হবে, এরপর নতুন তেলবাহী জাহাজগুলোকে সেখানে প্রবেশ করে তেল বোঝাই করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, 'একটি জাহাজকে ভেতরে আনতে হলে আপনাকে নিশ্চিত হতে হবে যে সেটিকে প্রবেশ করানো, তেল বোঝাই করা এবং নিরাপদে বের করে আনার জন্য যথেষ্ট দীর্ঘ নিরাপদ সময়সীমা রয়েছে।'
তিনি ব্যাখ্যা করেন, তেলবাহী জাহাজগুলোও ধীরগতিতে চলাচল করে। হরমুজ প্রণালি থেকে দূরবর্তী দেশগুলোতে পৌঁছাতে, সেখানে অপরিশোধিত তেল শোধনাগারে সরবরাহ করতে, তা প্রক্রিয়াজাত করতে এবং পরে চূড়ান্ত গন্তব্যে পৌঁছাতে কয়েক মাস সময় লাগে।
এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের কিছু উৎপাদক সংরক্ষণাগারের জায়গা ফুরিয়ে যাওয়ায় ভূগর্ভ থেকে তেল উত্তোলন সাময়িকভাবে বন্ধ করেছিল, যাকে 'উৎপাদন স্থগিতকরণ' বলা হয়। এসব কার্যক্রম পুনরায় চালু করাও ধীরগতির একটি প্রক্রিয়া হতে পারে।
বিশ্লেষণধর্মী প্রতিষ্ঠান উড ম্যাকেঞ্জির পরিশোধন, রাসায়নিক ও তেলবাজারবিষয়ক জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি অ্যালান গেল্ডার বলেন, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলো, যাদের কাছে হরমুজ প্রণালি ছাড়াও তেল পরিবহনের বিকল্প পাইপলাইন বা পথ রয়েছে, তারা সম্ভবত সবচেয়ে দ্রুত উৎপাদন পুনরায় শুরু করতে পারবে।
তিনি বলেন, 'কিন্তু ইরাকের মতো দেশগুলো অনেক বেশি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে, কারণ তাদের উৎপাদন স্থগিতের পরিমাণ অনেক বেশি ছিল এবং তাদের তেলক্ষেত্রগুলোও তুলনামূলকভাবে জটিল। ফলে আগের অবস্থায় ফিরতে তাদের প্রায় এক বছর সময় লাগতে পারে।'
গেল্ডার বলেন, জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ, যার ফল পেতে সাধারণত কয়েক বছর সময় লাগে, প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর কার্যত থেমে গিয়েছিল। ফলে এই মূলধন বিনিয়োগ আবার সচল হতেও সময় লাগবে।
কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্লোবাল এনার্জি পলিসি কেন্দ্রের জ্যেষ্ঠ ফেলো ড্যানিয়েল স্টার্নঅফ বলেন, তেল উৎপাদন বন্ধ রাখা দেশগুলো নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত উৎপাদন পুনরায় শুরু করতে চাইবে না যে প্রণালিটি দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল ও নিরাপদ থাকবে এবং যুদ্ধবিরতি ৩০ বা ৬০ দিনের বেশি সময় ধরে কার্যকর থাকবে।
তিনি বলেন, 'প্রণালি খোলা থাকার অর্থ বাস্তবে কী, অথবা সেখানে আটকে থাকা পণ্য ও সরঞ্জাম কত দ্রুত সরিয়ে নেওয়া যাবে, সে বিষয়ে আমরা এখনও নিশ্চিত নই।'
