হাম-পরবর্তী নিউমোনিয়া ও অপুষ্টিতে শিশু মৃত্যু বাড়ছে, পরিস্থিতির উন্নতি নেই
দেশে হামের প্রাদুর্ভাবে উন্নতির কোনো লক্ষণ নেই। হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, আক্রান্তের প্রায় ৯০ শতাংশ শিশুর মৃত্যু হাম-পরবর্তী নিউমোনিয়ায় ও অপুষ্টিতে হয়েছে। এর পাশাপাশি মেনিনজোএনসেফালাইটিস (৩৩%) ও সেপটিসেমিয়া (২২%)সহ বিভিন্ন জটিলতাও দেখা যাচ্ছে। আক্রান্ত শিশুদের অধিকাংশই টিকাবঞ্চিত।
রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড হাসপাতালে মারা যাওয়া ৬৬ শিশুর তথ্য বিশ্লেষণ করে এ চিত্র পাওয়া গেছে। তবে হামে মৃত্যুর আনুষ্ঠানিক ডেথ রিভিউ এখনো শুরু করেনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রতি তিনজনের একজন শিশুর মৃত্যু হয়েছে হাসপাতালে ভর্তির ২৪ ঘণ্টার মধ্যে। ৭২ ঘণ্টার মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ৪০ শতাংশের।
বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৮ শতাংশ শিশুর বয়স ছয় মাসের কম, ৫০ শতাংশের বয়স ৭-১০ মাস এবং এক বছরের বেশি বয়সী শিশুদের মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ৩২ শতাংশ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে ১৫ হাজার ৬৪৩ শিশু চিকিৎসা নিয়েছে, যার মধ্যে ১৩৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড হাসপাতালে ৬ হাজার ৪০০ রোগী চিকিৎসা নিয়েছে, যার মধ্যে মারা গেছে ৬৬ জন। এদের মধ্যে ৫৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে নিউমোনিয়া ও অপুষ্টিতে।
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. এফ এ আসমা খান বলেন, "হাম হওয়ার পর শিশুদের নিউমোনিয়া দেখা দিচ্ছে, এরপর শ্বাসকষ্ট বাড়ছে। এ অবস্থায় জেলা-উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। রোগীদের ঢাকায় পাঠানো হচ্ছে। অনেক শিশু বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরে গুরুতর অবস্থায় এখানে ভর্তি হচ্ছে। প্রায় প্রতিটি শিশুই মারাত্মক নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে হাসপাতালে আসছে।"
তিনি আরও বলেন, গবেষণা অনুযায়ী প্রতি ২০ জন হাম আক্রান্ত শিশুর একজন নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়, যা মৃত্যুর প্রধান কারণ।
সোমবার (২৭ এপ্রিল) সকাল ৮টা থেকে মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে ১ হাজার ২৭৬ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে, যার মধ্যে ১৬৩টি নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে। এ সময়ে ৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
চলতি বছরে এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়ে ৪৭ শিশুর মৃত্যু এবং ২৬৬টি সন্দেহভাজন মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। মোট শনাক্ত হয়েছে ৪ হাজার ৮৫৬টি নিশ্চিত ও ৩৪ হাজার ৬৬২টি সন্দেহভাজন সংক্রমণ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুদের মধ্যে অপুষ্টি বড় ঝুঁকি হিসেবে কাজ করছে। অপুষ্ট শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় তারা সহজেই গুরুতর সংক্রমণে আক্রান্ত হচ্ছে। পাশাপাশি অনেক শিশু টিকা না নেওয়ায় সংক্রমণের ঝুঁকি আরও বেড়েছে।
জটিলতা ও দেরিতে চিকিৎসা
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ডা. কামরুজ্জামান বলেন, "হামের পর জটিল নিউমোনিয়া ও এনসেফালাইটিসে শিশুদের মৃত্যু হচ্ছে। বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি অনেক শিশুই জটিল নিউমোনিয়ায় ভুগছে। কিছু ক্ষেত্রে অ্যাডেনোভাইরাসজনিত নিউমোনিয়াও দেখা যাচ্ছে। পাশাপাশি এনসেফালাইটিস বা মস্তিষ্কে সংক্রমণ শনাক্ত হচ্ছে, যা মৃত্যুঝুঁকি বাড়াচ্ছে।"
তিনি বলেন, গত এক বছরের বেশি সময় নিয়মিত ভিটামিন এ ক্যাম্পেইন না হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। "নিয়ম অনুযায়ী শিশুদের ছয় মাস পরপর ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়াতে হয়। এর ঘাটতি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং হাম-পরবর্তী জটিলতা বাড়ায়।"
তিনি আরও জানান, "হাসপাতালে বাবল সিপ্যাপ দিয়ে শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তবে অনেক রোগী দেরিতে হাসপাতালে আসায় জটিলতা বাড়ছে এবং মৃত্যুঝুঁকি কমানো কঠিন হয়ে পড়ছে। আক্রান্ত শিশুদের একটি বড় অংশ ঢাকার বাইরে থেকে গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে আসছে।"
অভিভাবকদের প্রতি পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, "কোনো শিশুর শ্বাসকষ্ট বা নিউমোনিয়ার লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে নিতে হবে। ফার্মেসি বা কবিরাজি চিকিৎসার ওপর নির্ভর না করে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।"
"আক্রান্ত শিশুকে অন্যদের থেকে আলাদা রাখতে হবে, জ্বর হলে প্রয়োজনীয় ওষুধ দিতে হবে এবং নিয়মিত বুকের দুধ ও পুষ্টিকর খাবার খাওয়াতে হবে। এছাড়া সুস্থ হওয়ার পর বয়স অনুযায়ী টানা দুই দিন ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়াতে হবে," যোগ করেন তিনি।
