পরিত্যক্ত হাসপাতালে ফেলে রাখা হয়েছে করোনা রোগী
কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলায় একটি পরিত্যক্ত হাসপাতালে একজন করোনা রোগীকে রাখা হয়েছে। শনিবার রাত সাড়ে ১০টা থেকে ওই রোগীকে উপজেলার গোহারুয়া গ্রামের ২০ শয্যা গোহারুয়া হাসপাতালে রেখে বাইরে থেকে পাহারা দিচ্ছে ৫-৬ জন পুলিশ।
এক যুগ আগে ২০ শয্যার গোহারুয়া হাসপাতালটি নির্মাণ হলেও সেটিতে এখনো সেবা চালু হয়নি। দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত থাকার কারণে হাসপাতালটির অবকাঠামো নষ্ট হয়ে গেছে।
হাসপাতালের ভেতরে ঘাস জন্মেছে। ভবনের চারপাশে এখন বনজঙ্গলে ভরে গেছে। ভয়ে তাই পরিত্যক্ত এই হাসপাতালে মানুষ প্রবেশ না করলেও একজন করোনা রোগীকে রাখা হয়েছে। বিষয়টি জানাজানি হয়ে গেলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেকে।
পরিত্যক্ত হাসপাতালে থাকা রোগী ৩৫ বছর বয়সী লক্ষীপুরের জেলার রামগঞ্জ থানার আঙ্গারপাড়ার দাসবাড়ীর বাসিন্দা। তিনি কক্সবাজার থেকে ফিরে অসুস্থবোধ করলে করোনাভাইরাসের পরীক্ষা করান। ১৬ এপ্রিল তার করোনা শনাক্ত হয়।
একজন করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীকে চিকিৎসা না দিয়ে এমন অমানবিকভাবে রাখায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এলাকার বাসিন্দারা। দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকার সম্পাদক নঈম নিজামের বাড়ি গোহারুয়া এলাকায়। বিষয়টি জেনে তিনি ইতোমধ্যে নিজের ফেসবুকে প্রতিবাদ জানিয়ে পোস্ট করেছেন।
পোস্টে তিনি লিখেছেন, ১২ বছর লেখালেখি, ফোনে অনুরোধ করে হাসপাতালটি চালু করতে পারিনি। নাঙ্গলকোট গোহারুয়া হাসপাতালে ডাক্তার, নার্স কেউ নেই। পরিত্যক্ত ভবনে কোনো সুযোগ-সুবিধা নেই। খাবার দেওয়ার কেউ নেই। সেই হাসপাতালে পাঠানো হলো করোনা রোগী। এখন বলেন, এই রোগীর চিকিৎসা কে করবে? লক্ষীপুর থেকে রোগী পালিয়ে আসে নাঙ্গলকোট। চিকিৎসার ব্যবস্থা না করে পরিত্যক্ত হাসপাতালে পাঠানো হলো। কোথায় মানবিকতা? অবিলম্বে ব্যবস্থা নিন। একজন মানুষকে এইভাবে শেষ করার অধিকার প্রশাসনের নেই। এই রোগীকে ঢাকা বা কুমিল্লা পাঠান।
জোড্ডা ইউনিয়ন (পশ্চিম) আওয়ামী লীগের সভাপতি ও একই গ্রামের বাদিন্দা আবদুল হক ভূঁইয়া বলেন, হাসপাতালটিতে ডাক্তার-নার্স কিছুই নেই। পরিত্যক্ত হাসপাতালটির চারিদিকে বন-জঙ্গল। সেখানে দিনের বেলায় মানুষ যায় না। করোনা আক্রান্ত রোগীকে আইলোসেশনে নেওয়ার প্রয়োজন হলেও এই পরিত্যক্ত হাসপাতালে কিছুই নেই। এ রকম একটা পরিত্যক্ত হাসপাতালে করোনা রোগী রাখা অমানবিক। হাসপাতাল থেকে সরানো না হলে ওই রোগী চিকিৎসার অভাবে মারা যাবেন। তাকে দ্রুত এখান থেকে নিয়ে যাওয়া উচিত। এইভাবে একটা রোগীকে রাখায় এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করছে।
মানবাধিকারকর্মীরা বিষয়টি জেনে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, যেখানে সরকার করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা নিশ্চিতে এতকিছু করছেন, সেখানে একজন রোগীকে পরিত্যক্ত হাসপাতালে বন্দি রাখা সম্পূর্ণ অমানবিক।
বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস কমিশনের ডেপুটি গভর্নর আমিনুল হক বলেন, এই মহামারিতে করোনা রোগীরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। এটা প্রাকৃতিক দুর্যোগ। কেউ ইচ্ছে করে করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন না। এই সময় তাদের পাশে থেকে সাহস জোগানো পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা দরকার আমাদের। সেখানে একজন রোগীকে পরিত্যক্ত হাসপাতালে রাখা অমানবিক। প্রশাসনের উচিত দ্রুত ওই রোগীকে করোনার চিকিৎসা হচ্ছে এমন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া।
রোববার বিকেল সাড়ে চারটার দিকেও ওই রোগী পরিত্যক্ত হাসপাতালটিতে রয়েছেন বলে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে নিশ্চিত করেছেন নাঙ্গলকোট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বখতেয়ার উদ্দিন চৌধুরী।
তিনি বলেন, শনিবার রাতে পুলিশ খবর পায় লক্ষীপুর থেকে এক করোনা আক্রান্ত রোগী পালিয়ে এসে নাঙ্গলকোটে প্রবেশ করেছেন। এরপর তাকে নাঙ্গলকোট রেলওয়ে স্টেশন থেকে উদ্ধার করা হয়। পরবর্তীকালে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. দেবদাস দেবকে বিষয়টি ফোনে জানালে তিনি অ্যাম্বুলেন্সসহ স্বাস্থ্যকর্মী পাঠান। এরপর ওই করোনা রোগীকে গোহারুয়া হাসপাতালে নেওয়া হয়।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে কুমিল্লা জেলা সিভিল সার্জন ডা. নিয়াতুল জামান বলেন, এই রোগী লক্ষীপুরের। তিনি পালিয়ে নাঙ্গলকোটে চলে এসেছেন। পুলিশ তাকে উদ্ধার করে। যেহেতু গোহারুয়া হাসপাতালটি বন্ধ। তাই ওই রোগীকে হাসপাতালটিতে রাখা হয়েছে।
সর্বশেষ রোববার রাতে জানা গেছে, রোগীকে লক্ষীপুরের রামগঞ্জে অ্যাম্বুলেন্সে করে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা পাঠানো হবে বলে জানান নাঙ্গলকোটের ইউএনও লামইয়া সাইফুল।
