মাস্ক-আম্বানি দ্বন্দ্ব: এবার ভারতে মাস্কের স্টারলিংককে লাইসেন্স না দিতে সরকারকে আহ্বান জানাল আরএসএস-সংশ্লিষ্ট সংগঠন
ভারতে বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট ব্রডব্যান্ড সেবা চালুর জন্য মার্কিন ধনকুবের ইলন মাস্কের প্রতিষ্ঠান স্টারলিংককে অনুমতি না দিতে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে স্বদেশি জাগরণ মঞ্চ (এসজেএম)।
আজ মঙ্গলবার সংগঠনটি বলেছে, জাতীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত উদ্বেগের সমাধান না হলে স্টারলিংককে অনুমতি দেওয়া উচিত হবে না। একই সঙ্গে ভারত সরকার ও শিল্পপতি মুকেশ আম্বানিকে নিয়ে মাস্কের করা মন্তব্যকে 'দায়িত্বজ্ঞানহীন' উল্লেখ করে এর নিন্দাও জানিয়েছে সংগঠনটি।
স্বদেশি জাগরণ মঞ্চ বা এসজেএম ভারতের হিন্দুত্ববাদী সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের সঙ্গে (আরএসএস) আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত একটি সংগঠন।
গত শনিবার আম্বানিকে নিয়ে আরও কড়া সমালোচনা করেন মাস্ক। এদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের স্ক্রিনশট শেয়ার করেন। ওই প্রতিবেদনগুলোতে অভিযোগ করা হয়, রিলায়েন্সের অর্থায়নে পরিচালিত একটি প্রতিষ্ঠান ভারতের ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার-প্রচারণা জোরদার করতে সহায়তা করেছে। এছাড়া রিলায়েন্স-সংশ্লিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠান ক্ষমতাসীন দলকে বিপুল পরিমাণ রাজনৈতিক অনুদান দিয়েছে।
এর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে আম্বানিকে 'প্রাইম মিনিস্টার আম্বানি' বলে সম্বোধন করেন মাস্ক। তার বিরুদ্ধে একচেটিয়া ব্যবসা সুরক্ষার অভিযোগও তোলেন তিনি। ভারতে স্টারলিংকের স্যাটেলাইট ব্রডব্যান্ড সেবা চালুর ক্ষেত্রে বিলম্বের জন্যও আম্বানির সমালোচনা করেন মাস্ক।
মাস্কের অভিযোগের বিষয়ে রিলায়েন্স কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। অন্যদিকে ভারত সরকার বলেছে, দেশটিতে টেলিযোগাযোগ ও স্যাটেলাইট সেবার অনুমোদন দেওয়ার ব্যবস্থা 'ন্যায্য ও বৈষম্যহীন'। এক্ষেত্রে বাছাই করে নিয়ম প্রয়োগের অভিযোগ 'ভিত্তিহীন ও ভুল ধারণাপ্রসূত'।
এসজেএমের জাতীয় যুগ্ম আহ্বায়ক অশ্বিনী মহাজন বলেন, জাতীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত উদ্বেগের সমাধান করতে ব্যর্থ হলে স্টারলিংককে অনুমতি না দেওয়ার অধিকার ভারতের রয়েছে বলে মনে করে তার সংগঠন।
তিনি বলেন, "স্টারলিংকের কার্যক্রম আটকে দেওয়ার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের মতো বাণিজ্যিক অংশীদারদের কাছে এই বার্তা দেওয়া সম্ভব যে, প্রকৃত জাতীয় নিরাপত্তার উদ্বেগের ভিত্তিতে স্টারলিংকের কার্যক্রম বন্ধ করার অধিকার ভারতের অবশ্যই রয়েছে।"
মাস্কের মন্তব্যের নিন্দা জানিয়ে মহাজন বলেন, ভারতে বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট ব্রডব্যান্ড সেবা চালু ও পরিচালনার জন্য স্টারলিংক লাইসেন্সের আবেদন করেছে। তবে এখনো অনুমোদন পায়নি প্রতিষ্ঠানটি। তাদের আবেদন প্রত্যাখ্যানও করা হয়নি।
মহাজন বলেন, "জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে তার প্রতিষ্ঠানের কাছে যেসব বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে, সেগুলোর জবাব দেওয়ার পরিবর্তে ইলন মাস্ক ভারতীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারকে পরোক্ষভাবে অভিযুক্ত করছেন—এটি দুর্ভাগ্যজনক।"
তার অভিযোগ, সরকারের ওপর জনমত তৈরির মাধ্যমে লাইসেন্স আদায়ের চেষ্টা করতে পারে স্টারলিংক। অথবা নিয়ন্ত্রক সংস্থার শর্ত পূরণ করতে না পারার হতাশা থেকেই এমন বক্তব্য দিচ্ছেন মাস্ক।
এসজেএমের এক বিবৃতিতে মহাজনকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, "আপাত দৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, স্টারলিংক হয়তো নির্দিষ্ট শর্তগুলো পূরণ করতে প্রস্তুত নয়। ফলে ইলন মাস্ক হয় সরকারের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করে লাইসেন্স আদায়ের চেষ্টা করছেন, নয়তো এসব শর্ত নিয়ে হতাশা থেকে এমন বক্তব্য দিচ্ছেন।"
বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা, সন্ত্রাসী হামলা, দাঙ্গা ও বিক্ষোভসহ বিভিন্ন পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রায়ই ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করার প্রয়োজন হয় উল্লেখ করে মহাজন বলেন, "বর্তমানে ভারতে আইনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে ইন্টারনেটভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই গুজব ও দেশবিরোধী প্রচারণা ছড়িয়ে পড়ে। বিচ্ছিন্নতাবাদ, সন্ত্রাসবাদ, দাঙ্গা, বিক্ষোভসহ এ ধরনের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে অনেক সময় ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করা অপরিহার্য হয়ে পড়ে।"
তিনি আরও বলেন, স্যাটেলাইটের মধ্যে লেজার সংযোগের মাধ্যমে তথ্য আদান-প্রদানের সুযোগ থাকায় স্টারলিংক ঘিরে উদ্বেগ রয়েছে। এ ব্যবস্থায় ভারতের ইন্টারনেট ট্রাফিক দেশীয় গেটওয়ে এড়িয়ে বিদেশি অবকাঠামোর মধ্য দিয়ে চলাচল করতে পারে। এতে আইনসম্মত নজরদারি ও আইন প্রয়োগের কাজ কঠিন হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি বলেন, "সরকার চায়, ভারতের ইন্টারনেট ট্রাফিক দেশের ভেতরে অবস্থিত গেটওয়ের মাধ্যমেই পরিচালিত হোক।"
স্যাটেলাইট ইন্টারনেট ব্যবহার করে শত্রুভাবাপন্ন পক্ষ, চোরাকারবারি ও বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর প্রচলিত টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্কের বাইরে যোগাযোগ চালানোর সম্ভাবনা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন মহাজন।
তিনি বলেন, ইউক্রেন, ইরান, রাশিয়া, চীন, তাইওয়ান, দক্ষিণ আফ্রিকা, ব্রাজিল, ভেনেজুয়েলা ও সুদানের মতো কয়েকটি দেশের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে স্টারলিংকের নিরাপত্তাঝুঁকি নিয়ে এসজেএমের এই আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ভারতে ফাইভজি প্রযুক্তি চালুর প্রসঙ্গ টেনে মহাজন বলেন, নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে চীনা প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ে ও জেডটিইকে ফাইভ জি প্রযুক্তির পরীক্ষামূলক কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার অনুমতি দেওয়ার বিরোধিতা করেছিল এসজেএম।
মহাজনের মতে, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে স্টারলিংকের কার্যক্রমে বাধা দেওয়া হলে তা ভারতের নিজস্ব স্যাটেলাইটভিত্তিক ইন্টারনেট সেবা বিকাশে গতি আনতে পারে। পাশাপাশি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সাশ্রয়ী ইন্টারনেট সংযোগ পৌঁছে দেওয়ার পথও সুগম হবে।
