বিমানবন্দরে হামলার আগে নীরব ছিল সৌদি আরবের সতর্কতা ব্যবস্থা; কারণ জানায়নি সৌদি সরকার
সৌদি আরবে রিয়াদ বিমানবন্দরে ধারাবাহিক ও প্রাণঘাতী কয়েকটি হামলার কিছুদিন আগেই সামরিক হামলার আগাম জনসতর্কবার্তা জারি করা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। এসব হামলায় অন্তত ১৮ জন নিহত এবং ৩০০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন।
গত এক সপ্তাহে রিয়াদ বিমানবন্দরে হওয়া চারটি হামলার আগে কেন জনসাধারণকে কোনো ধরনের সতর্কবার্তা দেওয়া হয়নি, সে বিষয়ে দেশটির সরকার এখন পর্যন্ত কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি।
ইয়েমেনের ইরান সমর্থিত হুথিদের সাথে যুদ্ধের সময় দেশের জনগণ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে একটি শান্ত পরিবেশের ভাবমূর্তি তুলে ধরার প্রচেষ্টা যে সহিংসতার কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল, এসব সতর্কবার্তাই মূলত সেটিকে স্পষ্ট করে তুলছিল।
রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলার ঘটনায় সতর্কবার্তা না থাকাটা সৌদি আরবের নিরাপত্তা সংক্রান্ত দুর্বলতা এবং তাদের নাগরিক ও দর্শনার্থীদের সুরক্ষার সক্ষমতা নিয়ে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে বলে জানিয়েছেন মধ্যপ্রাচ্যের চারজন পশ্চিমা ও আরব কর্মকর্তা এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
তাদের মতে, সতর্কবার্তা না দেওয়া বা নীরব ভূমিকা পালনের বিষয়টি স্বাভাবিক পরিস্থিতি বজায় রাখার একটি চেষ্টার প্রতিফলনও বটে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সৌদি শিক্ষাবিদ ও মিডল ইস্ট পলিসি কাউন্সিল থিঙ্ক ট্যাংকের সিনিয়র রেসিডেন্ট ফেলো সুলতান আল-আমের বলেন, 'তারা (সৌদি সরকার) দুটি বিষয়ই একসাথে অর্জন করতে চায়: একদিকে সামরিক অভিযান চালানো, আবার অন্যদিকে দেশের জনগণ এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আস্থা বজায় রাখার চেষ্টা করা।'
সৌদি সিভিল ডিফেন্স—যা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত জাতীয় জরুরি ব্যবস্থাপনা, উদ্ধার ও অগ্নিনির্বাপণ সংস্থা এবং যা আগাম সতর্কবার্তা জারি করে থাকে—এবং সৌদি সরকারের সংবাদ মাধ্যম কার্যালয়, কোনো সতর্কবার্তা কেন জারি করা হয়নি সে বিষয়ে ইমেইলের মাধ্যমে পাঠানো প্রশ্নের কোনো উত্তর দেয়নি।
কিছু আঞ্চলিক বিশ্লেষক সতর্ক করেছেন সৌদি আরবের এই পদক্ষেপটি উল্টো ফল দিতে পারে কারণ সতর্কবার্তাই না থাকায় পুরো রাজ্যে অনিশ্চয়তা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
গত সোমবার, সৌদি আরবের সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষ ২৯ সেপ্টেম্বরের পর প্রথমবারের মতো আবার সতর্কবার্তা জারি করে রিয়াদ ও দক্ষিণাঞ্চলীয় শহরগুলোতে সম্ভাব্য হুমকির বিষয়ে সতর্ক করে দেয়।
সতর্কবার্তা দেওয়ার সিদ্ধান্তটি বিমানবন্দরে হামলার প্রতিক্রিয়ায় নেওয়া হয়েছিল কি না, তা রয়টার্স নিশ্চিত করতে পারেনি। এই বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধের জবাবেও সৌদি সরকার তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
ব্যবস্থা যখন নীরব
গত ফেব্রুয়ারি মাসে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হয়েছে সমস্ত উপসাগরীয় দেশগুলোই। তবে তাদের সরকারগুলো জনসতর্কবার্তা দেওয়ার বিষয়টি ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে পরিচালনা করেছে।
কাতারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রায় প্রতিটি হামলার পূর্বেই মোবাইল ফোনে সতর্কবার্তা পাঠিয়েছে, যার মধ্যে জুলাই মাসের সাম্প্রতিক হামলাগুলোও অন্তর্ভুক্ত ছিল—যখন বাসিন্দাদের ঘরের ভেতরে এবং জানালা থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
বাহরাইন ও কুয়েত বারবার সাইরেন বাজিয়ে জনগণকে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
সৌদি আরব গত মে মাসে একটি জাতীয় আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থার মাধ্যমে মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একাউন্টে হুমকির সতর্কবার্তা দেওয়া শুরু করে। কিন্তু গত সপ্তাহের আগপর্যন্ত হুথিদের হামলা বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও এই ব্যবস্থাটি নীরব হয়ে যায়।
সিভিল ডিফেন্সের 'এক্স' (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্টের পোস্ট অনুযায়ী, গত সপ্তাহের হামলার আগে সর্বশেষ সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছিল ২৯ সেপ্টেম্বর, দক্ষিণাঞ্চলীয় নাজরান প্রদেশের জন্য।
তবে সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষ বৃষ্টি ও বন্যাসহ প্রতিকূল আবহাওয়ার সময়ে অনিষ্ট থেকে দূরে থাকার বিষয়ে সতর্কতা জারি রাখা অব্যাহত রেখেছে, যা তারা এমনকি গত সোমবারেও করেছে।
এ ছাড়া মার্চ মাসে জারি করা সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী, হামলা ঠেকানোর ঘটনা কিংবা হামলার আঘাতপ্রাপ্ত স্থানের ছবি, গুজব বা তথ্য শেয়ার না করতেও বাসিন্দাদের সতর্ক করেছে সংস্থাটি—যা গত সোমবারের একটি পোস্টে পুনরায় উল্লেখ করা হয়।
এ ধরনের তথ্য শেয়ার করার জন্য কেউ কোনো আইনি মামলা বা বিচারের মুখোমুখি হয়েছেন কি না, তা রয়টার্স নির্ধারণ করতে পারেনি এবং এ বিষয়ে সৌদি সরকারের বার্তা সংস্থা কোনো মন্তব্যের উত্তর দেয়নি।
দুইজন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বরাতে জানা গেছে, গত সপ্তাহে বিমানবন্দরে হামলার আগে একটি মিত্র পশ্চিমা সরকারের কর্মকর্তারা সৌদি কর্তৃপক্ষকে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে কেন এই সতর্কবার্তাগুলো দেওয়া বন্ধ করা হয়েছিল।
কর্মকর্তারা জানান, এর জবাবে সৌদি সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়—সতর্কবার্তাগুলো দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় অত্যাধিক বিঘ্ন ঘটাচ্ছিল এবং অনেক নাগরিক অভিযোগ করেছিলেন, রাতে সতর্কবার্তার শব্দে তাদের ঘুম ভেঙে যাচ্ছিল। এই দাবির বিষয়ে মন্তব্য চেয়ে যোগাযোগ করা হলে সৌদি সরকারের বার্তা সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কোনো সাড়া দেননি।
সৌদি আরবে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত মাইকেল র্যাটনি বলেন, রিয়াদ একদিকে হামলার বিষয়ে জনগণকে অবগত রাখা এবং অন্যদিকে দেশে জনজীবনের স্বাভাবিকতা বজায় রাখার মধ্যে একটি ভারসাম্য রক্ষা করতে চেয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা হামলার বিষয়ে মানুষের মধ্যকার অস্বস্তি বা আতঙ্ক আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
তিনি বলেন, 'জনসাধারণকে বার্তা দেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের এই মনোভাবটি আসলে তাদের বর্তমান উভসংকটেরই প্রতিফলন: হুথিদের বিরুদ্ধে তাদের পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন, আবার তারা এটাও চায় না যে এর ফলে সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হোক।
তাদের দেওয়া সতর্কবার্তায় সেটিরই ছাপ স্পষ্ট। তবে আসন্ন হুথি হামলার সতর্কবার্তা না দেওয়াটা ঠিক সেই উৎকণ্ঠাই বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা তারা এড়াতে চেয়েছিল।'
নতুন হুমকির সতর্কতা
সৌদি বিশ্লেষক আলী শিহাবি বলেন, আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা থাকুক বা না থাকুক, বিশাল ভৌগোলিক আয়তনের কারণে সৌদি আরবের পক্ষে তার সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষা করা বেশ কঠিন।
তিনি বলেন, 'সৌদি আরবে রক্ষা করার মতো স্থাপনার সংখ্যা অনেক বেশি। এটি বিমানবন্দর, পাইপলাইন এবং তেল ক্ষেত্রসমৃদ্ধ একটি বিশাল দেশ। সব কিছু একসাথে সুরক্ষিত রাখার মতো পর্যাপ্ত বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নেই—সবটা সামাল দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত পেট্রিয়ট (ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা), ইন্টারসেপ্টর বা মিসাইল ব্যাটারি নেই।'
তিনি আরও বলেন, 'সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা সীমাহীন।' এসব হামলা সত্ত্বেও সোমবার সৌদি আরব একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করে, যদিও বেশ কয়েকজন শীর্ষ তেল আমদানিকারক ও পেট্রোলিয়াম প্রতিষ্ঠানের প্রধান এতে অংশ নেওয়া থেকে বিরত থাকেন।
রিয়াদে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড পেট্রোলিয়াম কাউন্সিল এনার্জি কংগ্রেসে সৌদি ক্রাউন প্রিন্সের ভাই ও দেশটির জ্বালানি মন্ত্রী রাজপুত্র আবদুলআজিজ বিন সালমান ঝুঁকির কথা স্বীকার করার পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নে অনড় থাকার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
তিনি রিয়াদে আসা অতিথিদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, 'আপনারা জানেন এই দেশটি নিরাপদ বলেই এখানে এসেছেন। আমরা এখানে সমবেত হয়েছি মানেই কিন্তু ঝুঁকি শেষ হয়ে যায়নি। আমাদের অঙ্গীকার ও রূপকল্প ধরে রাখার কোনো সুযোগই আমরা হাতছাড়া করব না।'
দূতাবাসগুলোর নিজস্ব অভ্যন্তরীণ সতর্কতা জারি
গত সোমবারের আগে চলতি মাসে কোনো জনসতর্কবার্তা জারি না করা হলেও, এই সময়ে রিয়াদে প্রায় ডজনখানেক হামলা চালানো হয়েছে বলে দুজন পশ্চিমা কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
বিষয়টির সাথে সংশ্লিষ্ট তিনজন ব্যক্তি এবং রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, এই সময়টিতে সৌদি আরবে থাকা পশ্চিমা দূতাবাসগুলো তাদের নিজস্ব কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার অভ্যন্তরীণ সতর্কতা জারি করছিল।
