জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে নেপালের প্রধানমন্ত্রী কেন সানগ্লাস পরলেন?
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বৃহস্পতিবার যখন নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ বক্তব্য রাখছিলেন, তখন তার চোখে ছিল কালো সানগ্লাস। তবে এটি নেপালিদের কাছে মোটেও অপরিচিত নয়।
৩৬ বছর বয়সী বালেন্দ্র শাহ—যিনি নেপালে কেবল 'বালেন' নামেই পরিচিত। তিনি জনসম্মুখে আসতে হয় এমন অনুষ্ঠানগুলোতে প্রায় কখনোই সানগ্লাস ছাড়া উপস্থিত হন না।
জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগে আনুপাতিক হারের চেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া স্বল্পোন্নত দেশগুলোর পুনর্বাসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের তহবিল সহায়তার আহ্বান জানাতে তিনি নিউ ইয়র্কে গিয়েছিলেন। বৃহস্পতিবার সাধারণ পরিষদে গত মাসে নেপালে ঘটে যাওয়া প্রাণঘাতী বন্যার বিষয়ে তিনি বলেন, 'জলবায়ু পরিবর্তন কোনো সীমানা চেনে না... এটি সমগ্র বিশ্বের জন্য এক সতর্কবার্তা।'
বক্তব্যের সময় তিনি তার নিয়মিত পোশাকের অংশ হিসেবে স্যুট এবং নেপালের ঐতিহ্যবাহী টুপি (দুটোই কালো রঙের) এর সাথে মানানসই কালো সানগ্লাস পরেছিলেন।
দ্য কাঠমান্ডু পোস্টের জুলাই মাসের এক প্রতিবেদনে একজন রাজনীতিবিদের কথা তুলে ধরা হয়, যিনি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তার জনসম্পৃক্ত ভাবমূর্তি নিয়ন্ত্রণ করেন। সংবাদপত্রটি জানায়, ক্যামেরা এবং বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের সাথে বৈঠকের সময় বালেন শাহ সানগ্লাস পরেই থাকেন, তবে মন্ত্রিসভার বৈঠক ও ব্যক্তিগত আলোচনার সময় তিনি তা খুলে ফেলেন। এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য তার কার্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা কোনো সাড়া দেয়নি।
চশমা পরিধানের এই ধারাটি তার প্রতি মানুষের আগ্রহ ও রহস্য আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তিনি খুব কমই সংবাদ সম্মেলন বা সাক্ষাৎকার দেন, বরং সামাজিকযোগাযোগ মাধ্যমে যোগাযোগ রক্ষা করতেই তিনি বেশি পছন্দ করেন।
তার এই উপস্থিতি এখন এতটাই পরিচিত যে এটি ব্যবসায়িক আকর্ষণে পরিণত হয়েছে। নেপালের অন্যতম বৃহত্তম অনলাইন মার্কেটপ্লেস 'দারাজ'-এ "বালেন শাহ গ্লাস" লিখে অনুসন্ধান করলে তার ব্যবহৃত চশমার আদলে তৈরি বেশ কয়েকটি স্টাইলের চশমা দেখতে পাওয়া যায়।
নেপালের আন্ডারগ্রাউন্ড হিপ-হপ অঙ্গনে দ্বিমুখী প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সময়, সেই র্যাপার জীবন থেকেই তিনি এই সানগ্লাস পরা শুরু করেন। সেসময় "নেপাল স্মাইলিং"-এর মতো গানগুলো তাকে তরুণ নেপালিদের কাছে বেশ জনপ্রিয় করে তোলে।
২০২২ সালে একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে কাঠমান্ডুর মেয়র নির্বাচনে জয়লাভ করে তিনি দেশের রাজনৈতিক ঐতিহ্য বা অচলায়তনকে চমকে দেন। ততদিনে তার পরা কালো স্যুট এবং সানগ্লাস মূলধারার দলীয় রাজনীতির প্রভাবমুক্ত একজন ব্যতিক্রমী 'আউটসাইডার' হিসেবে তার ভাবমূর্তিকে আরও সুদৃঢ় করে।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে তরুণদের নেতৃত্বাধীন এক গণঅভ্যুত্থানে কে. পি. শর্মা অলির সরকারের পতন ঘটে। এরপর চলতি বছরের শুরুতে নির্বাচনী প্রচারণায়ও তিনি তার সেই পরিচিত উপস্থিতি বজায় রাখেন। মার্চ মাসের সংসদীয় নির্বাচনে বালেন শাহের নবগৃহীত দল 'রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি' এক ঐতিহাসিক নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে এবং প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথে তিনি দেশের একটি পূর্বাঞ্চলীয় আসনে স্বয়ং কে. পি. অলিকে পরাজিত করেন।
দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে বালেন শাহ সংসদে, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে, কুচকাওয়াজে এবং এমনকি নিজের অফিসিয়াল প্রতিকৃতিতেও (অফিসিয়াল পোট্রেট) এই গাঢ় সানগ্লাস পরিহিত অবস্থায় থেকেছেন।
তবে নিজের এই পরিচিত চশমা ছাড়াও মাঝে মাঝে জনসমক্ষে দেখা গেছে তাকে। দক্ষিণ নেপালে এক প্রাণঘাতী হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার পর গত জুলাইয়ে শান্তি বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে দেওয়া ভাষণে তিনি চশমা খুলেছিলেন। 'দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট' সেসময় তুলে ধরে যে, পরিদর্শনের সেই গুরুগম্ভীর মুহূর্তের সাথে মানানসই করতেই তিনি চশমা ছাড়া সরাসরি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে কথা বলেছিলেন।
গত মাসে হিমালয়ে বিধ্বংসী বন্যায় ব্রিজ ও আস্ত শহর ভেসে যাওয়া দুর্ঘটনাস্থলগুলো পরিদর্শনের সময়ও তিনি সানগ্লাস খুলে রেখেছিলেন। এর কয়েক মাস আগে, উচ্ছ্বসিত জনসভার সামনে সানগ্লাস খুলে সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি বলেছিলেন, 'আমি আপনাদের ভালোবাসি।'
তবে অগাস্ট মাসে নিজের এই চশমা পরিধান নিয়ে কিছুটা বাধার মুখে পড়েন প্রধানমন্ত্রী। সংসদীয় স্পিকার জানান যে, প্রতিনিধি পরিষদের অধিবেশন চলাকালীন গাঢ় রঙের সানগ্লাস পরা আর সহ্য করা হবে না। দ্য কাঠমান্ডু পোস্টের তথ্যমতে, স্পিকার দোল প্রসাদ আরিয়াল মন্তব্য করেন যে, সানগ্লাস পরিহিত আইনপ্রণেতাদের কারণে বারবার প্রশ্ন ও সমালোচনার সৃষ্টি হচ্ছিল।
তবে এর কয়েক সপ্তাহ পরেই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে জানানো হয়, উজ্জ্বল আলো থেকে চোখ রক্ষা করতে চিকিৎসকরাই প্রধানমন্ত্রীকে সানগ্লাস ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন।
