পুতিন-ঘনিষ্ঠ রুশ ধনকুবেরের খরচে ট্রাম্প জুনিয়রের বিয়ের উৎসব; ট্রাম্প বললেন, ‘বড় কোনো বিষয় নয়’
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ছেলে ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র এবং তার স্ত্রী বেটিনা ট্রাম্প সোমবার স্বীকার করেছেন যে, গত মে মাসে বিয়ের পর ক্যারিবীয় অঞ্চলের একটি দ্বীপে তাদের আয়োজিত বিলাসবহুল উদ্যাপনের খরচ বহন করেছিলেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা এক রুশ ধনকুবের।
অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম প্রোপাবলিকা জানিয়েছে, উমর ক্রেমলেভ নবদম্পতি ও তাদের কয়েক ডজন অতিথির জন্য বাহামাসের একটি ব্যক্তিমালিকানাধীন দ্বীপে আয়োজিত বিভিন্ন অনুষ্ঠানের পেছনে কয়েক লাখ ডলার খরচ করেছেন।
ওই আয়োজন শুরু হয়েছিল বিয়ের পরের দিন থেকে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই আয়োজনের মধ্যে আতশবাজির প্রদর্শনীও ছিল এবং এর খরচও ক্রেমলেভ বহন করেছিলেন।
বেটিনা ট্রাম্পের ইনস্টাগ্রাম পাতায় দেওয়া এক পোস্টে বলা হয়েছে, 'আমাদের প্রিয় বন্ধু উমর আমাদের বিয়ের পর অত্যন্ত উদারভাবে দুই রাতের দুটি অসাধারণ উদ্যাপনের আয়োজন করেছিলেন।'
পোস্টে আরও বলা হয়, 'এটি ছিল একজন বন্ধুর কাছ থেকে পাওয়া অত্যন্ত উদার বিয়ের উপহার, যার জন্য আমরা তখনও এবং এখনো অত্যন্ত কৃতজ্ঞ।'
পোস্টটির শেষে 'ডন ও বেটিনা' নামে স্বাক্ষর করা হয়।
তবে প্রশ্ন উঠেছে, ট্রাম্প পরিবারের একজন সদস্য—যিনি তার বাবার দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম বছরে ইতোমধ্যে কয়েকশ কোটি ডলার আয় করেছেন এবং যার আয়ের একটি অংশ বিদেশি বিনিয়োগ-সংশ্লিষ্ট ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবসা থেকে এসেছে—তিনি কেন পুতিনের সঙ্গে এত ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত একজন ব্যক্তির কাছ থেকে এমন উপহার গ্রহণ করবেন।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিয়েতে বা পরবর্তী উদ্যাপনে উপস্থিত ছিলেন না।
তিনি এনবিসি নিউজকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বিষয়টিকে 'বড় কোনো ব্যাপার নয়' বলে উল্লেখ করেছেন।
বিবৃতিতে বলা হয়, 'উমর কে, সে সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা নেই, আমি তার নামও আগে শুনিনি এবং সে ডন ও বেটিনার বিয়ের খরচ দেয়নি।'
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, 'তাদের বিয়ে হয়েছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি স্থানে এবং ভিন্ন দিনে; এটি ছিল তাদের সম্মানে আয়োজিত বিয়ের পরবর্তী একটি অনুষ্ঠান।'
ট্রাম্প বলেন, 'এটি বড় কোনো ব্যাপার নয়! আমি ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলাম না।'
ক্যালিফোর্নিয়ার প্রতিনিধি রবার্ট গার্সিয়া, যিনি মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের তদারকি কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট সদস্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ইউক্রেন সরকার যে ক্রেমলেভের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, সেই ক্রেমলেভ 'প্রেসিডেন্টের ছেলের পেছনে কয়েক লাখ ডলার খরচ করেছেন'।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, 'এর বিনিময়ে তিনি কী পেয়েছেন? আমাদের উত্তর দরকার।'
বেটিনা ট্রাম্প তার ইনস্টাগ্রাম পাতায় লিখেছেন, দ্বীপে কাটানো ওই ছুটির আয়োজন—যেখানে ট্রাম্প পরিবারের অন্য সদস্যরাও ছিলেন—'বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দ করার জন্য অনেক আগেই পরিকল্পনা করা হয়েছিল'।
তিনি বলেন, 'এটি কখনোই আমাদের বিয়ের সপ্তাহান্ত হিসেবে পরিকল্পনা করা হয়নি।'
তিনি আরও বলেন, 'আমাদের বিয়ের মূল পরিকল্পনায় পরিবর্তন আসার পর আমরা শুধু ওই আগে থেকে পরিকল্পিত সপ্তাহান্তের অনুষ্ঠানের আগে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিই এবং নবদম্পতি হিসেবে সেখানে যাই।'
ক্রেমলেভের সম্পৃক্ততার মধ্যেও কোনো অস্বাভাবিকতা নেই বলেও জোর দিয়ে বলেন বেটিনা।
তিনি লেখেন, 'এটি দুঃখজনক যে এত ব্যক্তিগত ও আনন্দের একটি বিষয়কে শুধু কোনো ব্যক্তি কে বা তিনি কোথা থেকে এসেছেন, সেই কারণে রাজনৈতিক বা অশুভ কোনো বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।'
তিনি আরও লেখেন, 'বন্ধুত্বের পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকা আবশ্যক নয়। উদারতার অর্থ এই নয় যে এর পেছনে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে। আর কখনো কখনো বিয়ের উপহার শুধুই বিয়ের উপহার।'
ক্রেমলেভ ও ট্রাম্প জুনিয়র কতদিন ধরে একে অপরকে চেনেন, তা স্পষ্ট নয়।
তবে গত বছরের সেপ্টেম্বরে তুরস্কে আন্তর্জাতিক বক্সিং সংস্থার একটি অনুষ্ঠানে দুজনকেই একসঙ্গে দেখা গিয়েছিল।
সেই সময় ট্রাম্প জুনিয়র বলেছিলেন, 'উমরকে শুধু একজন নেতা নয়, একজন বন্ধু হিসেবেও পরিচয় দিতে পেরে আমি গর্বিত।'
ক্রেমলেভ বলেছিলেন, তারা 'একসঙ্গে কাজ করছেন' এবং 'একসঙ্গে আমরা বক্সিংয়ের স্বচ্ছতা রক্ষা করব এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য দরজা খুলে দেব।'
তবে কীভাবে তারা একসঙ্গে কাজ করছেন, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু বলেননি।
এই প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত ক্রেমলেভ এবং ট্রাম্প জুনিয়রের প্রতিনিধিরা মন্তব্যের অনুরোধের জবাব দেননি।
২০২০ সালে ক্রেমলেভ আন্তর্জাতিক বক্সিং সংস্থার প্রধান হন।
সংস্থাটির ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, গত এপ্রিলের শেষ দিকে রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন ক্রেমলেভকে 'আন্তর্জাতিক ক্রীড়ায় অবদান এবং বৈশ্বিক বক্সিং পরিবারের প্রতি তার অঙ্গীকারের' জন্য 'অর্ডার অব ফ্রেন্ডশিপ' পদক দেন।
ট্রাম্প জুনিয়রের বিয়ের কিছুদিন আগে ক্রেমলেভ পুতিনের সঙ্গে বক্সিংয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনার জন্য বেইজিং সফর করা রুশ প্রতিনিধিদলের অংশ ছিলেন বলে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
ট্রাম্প জুনিয়র পুতিনের সঙ্গে সম্পর্ক থাকা ব্যক্তিদের সঙ্গে আগে বৈঠক করেছেন।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে তৎকালীন বিশেষ কৌঁসুলি রবার্ট মুলার ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী প্রচারের সময় ট্রাম্প জুনিয়রের এমন একটি বৈঠকেরও তদন্ত করেছিলেন, যেখানে তাকে বলা হয়েছিল, বৈঠকে অংশ নেওয়া এক ব্যক্তি রাশিয়ার 'প্রধান কৌঁসুলি' এবং তার কাছে ডেমোক্র্যাটিক দলের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিলারি ক্লিনটনের বিরুদ্ধে ক্ষতিকর তথ্য রয়েছে।
ওই প্রস্তাবের জবাবে ট্রাম্প জুনিয়র একটি ই-মেইলে লিখেছিলেন, 'আপনি যা বলছেন তা যদি সত্যি হয়, তাহলে আমি এটি পছন্দ করছি—বিশেষ করে গ্রীষ্মের শেষের দিকে।'
২০১৬ সালের জুনে ট্রাম্প টাওয়ারে ক্রেমলিনের সঙ্গে সম্পর্ক থাকা এক আইনজীবী এবং পুতিনের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত আরও কয়েকজন রুশ নাগরিকের সঙ্গে ওই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
তবে মুলারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই বৈঠক থেকে নির্বাচনী প্রচারের জন্য কোনো সহায়ক তথ্য পাওয়া যায়নি।
প্রচারাভিযানের পক্ষ থেকে বিদেশি সরকার বা বিদেশি নাগরিকদের কাছ থেকে সহায়তা গ্রহণ করা বেআইনি।
তবে মুলার ওই তদন্তের ওই অংশে কোনো অভিযোগ আনেননি।
এর কারণ, তার তদন্তকারীরা মনে করেছিলেন, ট্রাম্প জুনিয়র প্রচারাভিযানের অর্থসংক্রান্ত আইন সম্ভাব্যভাবে লঙ্ঘন করলেও তিনি তা 'ইচ্ছাকৃতভাবে' করেছিলেন—এটি প্রমাণ করা সম্ভব হবে না।
২০১৯ সালে মুলারের প্রতিবেদন প্রকাশের পর ট্রাম্প জুনিয়রের আইনজীবী অ্যালান ফিউটারফাস বলেছিলেন, প্রতিবেদনটি নিশ্চিত করেছে যে ওই বৈঠকটি 'ডন যা বলেছিলেন, ঠিক সেটিই ছিল এবং এর বেশি কিছু নয়'।
তিনি আরও বলেন, 'সম্ভাব্য কোনো তথ্য শোনার মধ্যে কোনো অনিয়ম ছিল না।'
