‘আমগাছটি না থাকলে মারাই যেতাম’: নেপালে ভয়াবহ বন্যা থেকে যেভাবে বাঁচলেন এক দিনমজুর
বুধবার একটি নবনির্মিত বাড়ির বাইরে শৌচাগারের জন্য গর্ত খুঁড়ছিলেন নেপালের দিনমজুর বিবেক কুমাল। হঠাৎ পানি, কাদা ও পাথরের প্রবল স্রোত নেমে এসে তাকে এবং আশপাশের সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
২৪ বছর বয়সী কুমাল কাজ করছিলেন বিদুর এলাকায়। এটি আকস্মিক বন্যায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি। বিদুর রাসুওয়া জেলার ভাটিতে, চীনের তিব্বত সীমান্তের কাছে নেপালের হিমালয় অঞ্চলে অবস্থিত।
কাজ করার সময় হঠাৎ শোঁ শোঁ শব্দ শুনতে পান কুমাল। তখন প্রায় পাঁচ ফুট (১.৫ মিটার) গভীর গর্তের ওপরে থাকা তার চার সহকর্মী তাকে দ্রুত উঠে দৌড়ে পালাতে বলেন।
গর্ত থেকে কোনোমতে উঠে আসার আগেই তার সহকর্মীরা নিরাপদ জায়গায় চলে যান।
কাঠমান্ডুর ন্যাশনাল ট্রমা সেন্টারের বিছানায় শুয়ে কুমাল বলেন, "আমি দৌড়াতে শুরু করি। এরপর ভূমিকম্পের মতো প্রচণ্ড শব্দে পানির বিশাল স্রোত নেমে আসে।" এ সময় তার পাশে ছিলেন ভাই দিনেশ।
কাদা ও ধ্বংসাবশেষের সঙ্গে প্রবল স্রোত কুমালকে ভাটির দিকে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে থাকে। তবে একপর্যায়ে তিনি একটি আমগাছে আটকে যান।
কুমাল বলেন, "ভাগ্য ভালো, আমি একটি আমগাছে আটকে গিয়েছিলাম। ওই আমগাছটি না থাকলে স্রোতে ভাসতে ভাসতে আমি মারাই যেতাম।"
আকস্মিক এ বন্যায় এ পর্যন্ত অন্তত ১৬২ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন শত শত মানুষ, যাদের মধ্যে অনেক বিদেশিও রয়েছেন। এটিকে নেপালের অন্যতম ভয়াবহ দুর্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বন্যায় আহত আরও তিনজন কুমালের সঙ্গে একই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। আহত আরও অনেককে রাজধানী কাঠমান্ডুতে নেওয়া হচ্ছে।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত ১১৪ জনের বেশি জীবিত মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের কাঠমান্ডু ও রাসুওয়ার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে হাসপাতালের বাইরে ন্যাশনাল ট্রমা সেন্টারের ছোট প্রাঙ্গণে শুভাকাঙ্ক্ষী, বন্ধু ও উৎসুক মানুষের ভিড় জমেছে।
চোখের সামনে হারিয়ে গেল বাড়ি
নেপাল ও তিব্বত সীমান্তে নদীতে বিপুল পরিমাণ কাদা ও পাথর ধসে পড়ার পর আকস্মিক এ বন্যা সৃষ্টি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রবল স্রোতে ভাটির দিকের জনবসতি ও অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সীমান্তের চীনা অংশের নিরাপত্তা ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, পাথর, কাদা ও পানির বিশাল স্রোত আসার আগে অনেক মানুষ প্রাণ বাঁচাতে দৌড়াচ্ছেন। পরে সেই স্রোত ভবন ও যানবাহন ভাসিয়ে নিয়ে যায় এবং বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটে।
তবে ভূমিধসের সঠিক কারণ এখনো স্পষ্ট নয়। জার্মান রিসার্চ সেন্টার ফর জিওসায়েন্সেস জানিয়েছে, নিরাপত্তা ক্যামেরার ফুটেজে থাকা সময়ের প্রায় সাত মিনিট আগে ওই এলাকায় ৪.৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হয়েছিল।
বেঁচে যাওয়া কুমাল জানান, আমগাছ আঁকড়ে ধরে থাকা অবস্থায় তিনি যে বাড়িতে কাজ করছিলেন, সেটি চোখের সামনে স্রোতে হারিয়ে যেতে দেখেন।
পরে পুলিশ গিয়ে কুমালকে উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যায়। প্রথমে পানির স্রোত এবং পরে একটি বড় পাথরের আঘাতে তার ডান পায়ে চোট লাগে।
তবে অন্য এলাকায় তার নিজের বাড়িটি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি বলে জানান কুমাল।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের দীর্ঘ ইতিহাস নেপালে
পাহাড়ি দেশ নেপালে প্রতি বর্ষা মৌসুমেই প্রাণঘাতী বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনা ঘটে। দেশটি অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগেরও ঝুঁকিতে রয়েছে। কুমাল নিজেও কিশোর বয়সে ২০১৫ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্প থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন। ওই ভূমিকম্পে প্রায় ৯ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।
হাসপাতালে কুমালের বিপরীত পাশের বিছানায় চিকিৎসাধীন ১১ বছর বয়সী রিহানা লামিছানেও অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচেছে।
রিহানা বলে, "আমি স্কুলে ছিলাম। বন্যার কারণে স্কুল বন্ধ করে আমাদের বাড়ি চলে যেতে বলা হয়। নদী পার হওয়ার সময় হঠাৎ প্রবল বেগে বন্যার পানি নেমে আসে।"
তার বুক ও পায়ে আঘাত লেগেছে। তবে রিহানা বলে, "নিরাপদে আছি, এটাই আনন্দের। তবে আমার বন্ধুদের কী হয়েছে, এখনও আমি জানি না।"
রিহানার মা রিতা জানান, এক বন্ধুর কাছ থেকে ফোন পাওয়ার পর তিনি মেয়েকে খুঁজতে ছুটে যান।
তিনি বলেন, "আমার মেয়ের গুরুতর কিছু হয়নি, এতেই আমি খুশি। তাকে নিরাপদে পেয়ে স্বস্তি লাগছে।"
