‘ইহুদিরা তোমার ওপর বিরক্ত, বিবি’: গাজা শান্তি চুক্তির আগে নেতানিয়াহুকে ধমক দেন ট্রাম্প
গত বছর গাজা যুদ্ধ অবসানের চুক্তির আনুষ্ঠানিক ঘোষণার মাত্র কয়েক দিন আগে এক ফোনালাপে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ওপর চরম ক্ষোভ ঝেড়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
জ্যারেড কুশনার এবং হোয়াইট হাউসের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের উপস্থিতিতে হওয়া ওই ফোনালাপে ট্রাম্প তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে নেতানিয়াহুকে লক্ষ্য করে বলেন, 'সবাই তোমার ওপর বিরক্ত, বিবি।' তিনি আরও যোগ করেন, 'সব ইহুদি তোমার ওপর বিরক্ত, এমনকি এই ফোনালাপে যুক্ত থাকা দুই ইহুদিও তোমার ওপর বিরক্ত।' এখানে ট্রাম্প মূলত কলে যুক্ত থাকা কুশনার এবং উইটকফকে ইঙ্গিত করেছিলেন, যারা দুজনেই ইহুদি।
জিম্মি মুক্তি চুক্তির ঘোষণার কয়েক সপ্তাহ আগে মূলত এই ফোনালাপটি হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রে সদ্য প্রকাশিত 'রেজিম চেঞ্জ' নামক একটি নতুন বইয়ে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। বইটি যৌথভাবে লিখেছেন নিউইয়র্ক টাইমসের সাংবাদিক ম্যাগি হ্যাবারম্যান এবং জোনাথন সোয়ান, যেখানে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম বছরের রাজনৈতিক ও নীতিনির্ধারণী নানা বিষয় তুলে ধরা হয়েছে।
বইটিতে বলা হয়েছে, ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে প্রায় দুই বছরের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ট্রাম্প ২০ দফার একটি গাজা শান্তি পরিকল্পনা ঘোষণা করেছিলেন। ফোনালাপে মূলত এই পরিকল্পনা নিয়েই আলোচনা হচ্ছিল।
তবে এর আগে কাতারের রাজধানী দোহায় হামাসের লক্ষ্যবস্তুতে ইসরায়েলি বিমান হামলার পর জ্যারেড কুশনার ইসরায়েলের ওপর মারাত্মক ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিলেন। ওই হামলায় কাতারের নিরাপত্তা বাহিনীর একজন সদস্যও নিহত হন, যা আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপকভাবে নিন্দিত হয়েছিল।
সে সময় কুশনার তার এক সহযোগীকে বলেছিলেন, 'আমি এর মধ্যে আর নেই। ইসরায়েলিরা পাগল হয়ে গেছে।' তবে পরবর্তীতে তিনি বুঝতে পারেন যে এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে ইসরায়েলকে লাইনে আনা সম্ভব এবং গাজায় যুদ্ধ বন্ধ করতে তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা যেতে পারে।
কুশনার নিজেই এই গাজা শান্তি পরিকল্পনার খসড়া তৈরি করেছিলেন। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুলরহমান আল থানির সঙ্গে এটি নিয়ে আলোচনা করেন তিনি। পরে ট্রাম্প এই প্রস্তাবটি নেতানিয়াহুর কাছে তুলে ধরেন।
উত্তপ্ত ফোনালাপের সময় ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে উদ্দেশ্য করে আরও বলেছিলেন, 'তুমি এটা থেকে পিছিয়ে যেতে পারো না। আমি ইসরায়েলের পাওয়া এযাবতকালের সবচেয়ে সেরা বন্ধু। সবাই তোমাকে ঘৃণা করে, আর আমি তোমার পাশে দাঁড়িয়েছি। এই চুক্তিটি ইসরায়েলের জন্য অত্যন্ত দুর্দান্ত একটি চুক্তি।'
এই ফোনালাপের ঠিক দুই দিন পর, ২০২৫ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহু হোয়াইট হাউসে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এই শান্তি পরিকল্পনার ঘোষণা দেন। পরবর্তীতে নভেম্বর মাসে এটি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ কর্তৃক অনুমোদিত হয়।
রেজিম চেঞ্জ' বইটি ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের অভ্যন্তরীণ ও সংবেদনশীল নানা বিষয় নিয়ে রচিত হওয়ায় মার্কিন রাজনীতিতে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। এতে এপস্টিন ফাইল এবং ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের মতো বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যকার অত্যন্ত সংবেদনশীল আলোচনার বিবরণ রয়েছে। অতি সম্প্রতি সংবাদপত্রে বইটির কিছু অংশ প্রকাশিত হওয়ার পর হোয়াইট হাউসের 'সিচুয়েশন রুম'-এর গোপন কথোপকথনের রেকর্ডিং ফাঁসের বিষয়ে কর্মকর্তারা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
বইটিতে উল্লেখ করা হয়েছে, গত ফেব্রুয়ারি মাসে ইরানের ওপর মার্কিন বিমান হামলার কয়েক দিন আগে ট্রাম্প সিচুয়েশন রুমে বসে আবারও নেতানিয়াহুর সঙ্গে কথা বলেন। সে সময় নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে বলেছিলেন যে, ইরান এখন 'রেজিম চেঞ্জ' বা ক্ষমতা পরিবর্তনের জন্য উপযুক্ত অবস্থায় রয়েছে।
তবে পরবর্তীতে সিচুয়েশন রুমের আরেকটি বৈঠকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও নেতানিয়াহুর এই মূল্যায়নকে সরাসরি 'বাজে কথা' বলে উড়িয়ে দেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম এক্সিওস সম্প্রতি জানিয়েছে, হোয়াইট হাউসের অন্দরের এই পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য ফাঁস হয়ে যাওয়ায় ডোনাল্ড ট্রাম্প 'অত্যন্ত ক্ষুব্ধ' হয়েছেন।
