সুইজারল্যান্ডে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র বৈঠকের মূল ফলাফল: এরপর কী?
সুইজারল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শীর্ষ পর্যায়ের আলোচনার প্রথম দিনে "আশাব্যঞ্জক অগ্রগতির" কথা জানিয়েছে মধ্যস্থতাকারী দেশ কাতার ও পাকিস্তান। তারা জানায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান "৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর রোডম্যাপে" সম্মত হয়েছে।
৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছাতে গত ১৭ জুন একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। ১৪ দফার ওই প্রাথমিক চুক্তির ধারাবাহিকতায় এই আলোচনাটি অনুষ্ঠিত হয়েছে, যা ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে উত্তেজনা হ্রাসের একটি রূপরেখা তৈরির মাধ্যমে পরবর্তী পর্যায়ের আলোচনার পথ সহজ করছে।
গতকাল সুইজারল্যান্ডের বার্গেনস্টক শহরের লেক লুসার্নে দুই দেশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে টানা ১৮ ঘণ্টার এক ম্যারাথন আলোচনার পর এই বড় ধরনের অগ্রগতি আসে।
বৈঠক শেষে দেওয়া যৌথ বিবৃতিতে, লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান বন্ধের লক্ষ্যে একটি "ডি-কনফ্লিকশন সেল" (উত্তেজনা প্রশমন সেল) গঠনের পাশাপাশি—পরবর্তী আলোচনাকে এগিয়ে নিতে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি ও সরাসরি যোগাযোগের চ্যানেল চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়।
আলোচনায় ওয়াশিংটনের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে ছিলেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তাঁর সঙ্গে ছিলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। অন্যদিকে, ইরানের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে ছিলেন দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং প্রতিনিধিদলে ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি।
আজ সোমবার সাংবাদিকদের ভ্যান্স বলেন, "গতকালকের দিনটি ছিল খুবই ভালো। আমরা অনেক ভালো অগ্রগতি করেছি। আমরা ঠিক যা করতে চেয়েছিলাম, তা-ই করেছি।"
তাহলে এই আলোচনার মূল সারসংক্ষেপ বা প্রাপ্তিগুলো কী কী?
উচ্চপর্যায়ের কমিটি ও যোগাযোগের চ্যানেল প্রতিষ্ঠা
মধ্যস্থতাকারী দেশ কাতার ও পাকিস্তানের পক্ষ থেকে জারি করা এক যৌথ বিবৃতি অনুযায়ী, "মধ্যস্থতা প্রক্রিয়ার ওপর রাজনৈতিক নজরদারি রাখতে" একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, কমিটি "৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর রোডম্যাপে সম্মত হয়েছে" এবং আগামী দুই মাস ধরে (চূড়ান্ত চুক্তির জন্য) আরও কারিগরি আলোচনা অব্যাহত থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, "প্রধান আলোচকরা নিয়মিত এই উচ্চপর্যায়ের কমিটির কাছে প্রতিবেদন জমা দেবেন এবং সমঝোতা স্মারকের কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে পরমাণু, নিষেধাজ্ঞা এবং একটি পর্যবেক্ষণ ও বিরোধ নিষ্পত্তি গ্রুপের ওপর মনোনিবেশকারী ওয়ার্কিং গ্রুপগুলোর নেতৃত্ব দেবেন।"
মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক আটলান্টিক কাউন্সিলের নন-রেসিডেন্ট সিনিয়র ফেলো থমাস ওয়ারিক আল জাজিরাকে বলেন, কারিগরি আলোচনার পরবর্তী ধাপটি রাজনৈতিক চুক্তির চেয়ে অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। এই প্রক্রিয়া অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তিতে নির্ধারিত ৬০ দিনের সময়সীমার চেয়েও বেশি সময় নিতে পারে।
এদিকে এমন এক সময়ে প্রাথমিক চুক্তিটি হয়েছে যখন ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে বেশকিছু বড় প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে। এর মধ্যে রয়েছে—ইরানকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে কিনা, তাদের উচ্চমাত্রায়-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদের ভবিষ্যৎ কী হবে, আন্তর্জাতিক পরিদর্শনের পরিধি কতটা হবে এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সময়সীমা কেমন হবে—এমন সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে।
পরমাণু ইস্যুতে ওয়ারিক বলেন, "সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম অপসারণ বা এর মাত্রা কমিয়ে আনার জন্য কয়েক হাজার মানুষের প্রয়োজন হবে, যার মধ্যে সম্ভবত ১,০০০ জন মার্কিন নাগরিক থাকবেন—যারা ইরানের অত্যন্ত সংবেদনশীল পরমাণু সাইটগুলোতে প্রবেশ করবেন।" ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের ভূমিকা রাখার দাবির কথা উল্লেখ করে তিনি এই মন্তব্য করেন।
তিনি আরও যোগ করেন, "আমি ভাবতেও পারি না যে ইরান এই প্রস্তাবে খুব একটা খুশি হবে।"
হরমুজ প্রণালীতে যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ও ভুল বোঝাবুঝি এড়াতে এবং বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি নির্দিষ্ট "যোগাযোগ লাইন" স্থাপন করেছে।
কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ দিয়ে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস পরিবাহিত হয়। এই জলপথে নৌযান চলাচলে সাম্প্রতিক বিঘ্ন ঘটার মধ্যেই এই ঘোষণা এলো। মেরিটাইম ইন্টেলিজেন্স কোম্পানি 'উইন্ডওয়ার্ড'-এর একটি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত রোববার মাত্র ১২টি জাহাজ এই প্রণালী পার হয়েছে, যেখানে এর আগের দিন পার হয়েছিল ৩৫টি জাহাজ।
হরমুজ প্রণালীতে ইরানের অবরোধের ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট দেখা দেয়, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
সোমবার ভ্যান্স বলেন, উভয় পক্ষ দুটি "সমন্বয় ব্যবস্থা" গড়ে তুলবে—একটি লেবাননে যুদ্ধবিরতি তদারকি করার জন্য এবং অন্যটি হরমুজ প্রণালীকে মাইনমুক্ত করার জন্য।
তিনি জানান, এরপর চূড়ান্ত চুক্তির খুঁটিনাটি ঠিক করতে কারিগরি আলোচনা শুরু হবে এবং তা আগামী দিনগুলোতে চলমান থাকবে। মার্কিন ও ইরানের টেকনিক্যাল টিম "যথাযথ নজরদারির" মাধ্যমে শান্তির শর্তাবলী নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাবে বলে তিনি জানান।
চূড়ান্ত চুক্তিকে একটি বাড়ির সাথে তুলনা করে ভ্যান্স বলেন, "চূড়ান্ত চুক্তিটি হলো একটি আস্ত বাড়ি। আমরা কেবল এর ভিত্তি স্থাপন করেছি। আমরা এখনো বাড়িটি তৈরি করিনি, তবে আমেরিকান জনগণের জন্য একটি ভালো অবস্থানে পৌঁছাতে আমরা সফলভাবে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করতে পেরেছি।" তবে এখনও অনেক কাজ করা বাকি আছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
লেবাননের জন্য 'ডি-কনফ্লিকশন সেল'
এই চুক্তির আওতায় একটি "ডি-কনফ্লিকশন সেল" তৈরির বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যার উদ্দেশ্য হলো "লেবাননে সামরিক অভিযান বন্ধের সিদ্ধান্ত মেনে চলা নিশ্চিত করার" প্রচেষ্টায় সহায়তা করা।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি-ও লেবানন যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে "বড় অগ্রগতির" কথা ঘোষণা করেছেন। তবে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, এই চুক্তির প্রথম আসল পরীক্ষা হবে "এই সেল"-এর কার্যকারিতা।
এমন এক সময়ে এই সেল গঠনের ঘোষণা এলো যখন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, ইসরায়েল যতদিন প্রয়োজন মনে করবে ততদিন তার সেনারা দক্ষিণ লেবাননে তাদের তৈরি নিরাপত্তা অঞ্চলে অবস্থান করবে। ইসরায়েলের তৈরি এই বাফার জোনটি প্রায় ৬০২ বর্গকিলোমিটার (২৩০ বর্গমাইল) এলাকা জুড়ে বিস্তৃত, যা লেবাননের মোট ভূখণ্ডের প্রায় ৬ শতাংশ।
এরই মধ্যে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর কুদস ফোর্সের প্রধান ইসমাইল কানি ইসরায়েলকে দক্ষিণ লেবানন ছাড়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। নাহলে ২০০০ সালে লেবানন থেকে যেভাবে তারা পরাজয় নিয়ে পিছু হটেছিল, তার পুনরাবৃত্তি ঘটবে বলে সতর্ক করেছেন।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম প্রেস টিভির বরাতে জানা যায়, ইসমাইল কানি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন, ইসরায়েল যদি তাদের "আগ্রাসন ও দখলদারিত্ব" অব্যাহত রাখে, তাহলে তারা "অপমান ও পরাজয়ের" মধ্য দিয়ে বিতাড়িত হতে বাধ্য হবে।
এদিকে, হিজবুল্লাহ এখনও যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের প্রাথমিক চুক্তির বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেনি। তবে ইসরায়েলে বিরাজ করছে তীব্র অসন্তোষ ও উদ্বেগ।
ইসরায়েল অধিকৃত পশ্চিম তীরের রামাল্লাহ থেকে আল জাজিরার নূর ওদেহ জানান, ইসরায়েলি বিশ্লেষকরা সুইজারল্যান্ডের এই আলোচনার ফলাফলকে ইসরায়েলের জন্য একটি কৌশলগত উভয়সংকট হিসেবে বর্ণনা করছেন।
তিনি বলেন, "হিজবুল্লাহর সাথে এর আগের যুদ্ধবিরতিটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সিদ্ধান্তে পরিচালিত হয়, যা ইসরায়েলকে স্বাধীনভাবে পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ দিয়েছিল।"
"কিন্তু এবার সমীকরণটি ভিন্ন... এবং ইসরায়েল মনে করছে যে তারা এই প্রক্রিয়ার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে বাধ্য হবে। ইসরায়েলি জনগণের আস্থা পুরোপুরি না হারিয়ে তারা কতটা আপস করতে পারে—এই নিয়েই বর্তমানে ইসরায়েলি নীতিনির্ধারকদের সমস্ত চিন্তাভাবনা, পরিকল্পনা ও কৌশল আবর্তিত হচ্ছে।"
তবে যুদ্ধের মাঠপর্যায়ে এই বন্দোবস্তের আদৌ কোনো প্রভাব পড়বে কিনা তা নিয়ে কিছু বিশ্লেষক প্রশ্ন তুলেছেন। সাবেক মার্কিন সিনিয়র কূটনীতিক জোই হুড উল্লেখ করেছেন যে, লেবানন বা ইসরায়েল—কোনো দেশের সরকারই এই আলোচনার সাথে সরাসরি জড়িত ছিল না, অথচ এখন তাদের কাছ থেকেই যুদ্ধবিরতির শর্তাবলী বাস্তবায়নের প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, "এর মাধ্যমে লেবাননের ওপর ইরানকে এক প্রকার ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে... সুতরাং এই সমঝোতা স্মারক যেন এটিই বলছে যে, আমরা প্রক্সি বা ছায়াবাহিনীসহ এই অঞ্চলে ইরানের নেতৃত্বদানকারী ভূমিকাকে মেনে নিচ্ছি।"
মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক কর্মকর্তা ও অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল মার্ক কিমিট যোগ করেন যে, বৃহত্তর আলোচনার মধ্যে লেবাননকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি এটিকে "প্রচণ্ড জটিল" করে তুলেছে।
তবে এই চুক্তির কিছুটা প্রভাব পড়ছে এমন কিছু লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। আল জাজিরার সাংবাদিক হেইডি পেট দক্ষিণ লেবাননের নাবাতিয়াহ থেকে জানিয়েছেন, সেখানে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে এবং "এখানে একটি সতর্ক শান্ত পরিস্থিতি বিরাজ করছে।"
তিনি আরও বলেন, "গত কয়েকদিন ধরে এই শহর এবং এর আশেপাশের শহর ও গ্রামগুলোতে অত্যন্ত নির্মম ও রক্তক্ষয়ী সহিংসতার পর এই শান্ত পরিবেশ এলো।"
