১০০ কোটি ব্যারেলের বেশি তেলের সরবরাহ থেকে বঞ্চিত হয়েছে বিশ্ববাজার; ঘাটতি পূরণে ১ বছরও লেগে যেতে পারে
সুখবর: চলতি সপ্তাহে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর অবশেষে খুলেছে হরমুজ প্রণালি।
দুঃসংবাদ: খুব সম্ভব বড্ড দেরি হয়ে গেছে।
প্রায় চার মাস ধরে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেলও বেরোয়নি। বিশ্লেষক সংস্থা কেপলার-এর তথ্যমতে, যুদ্ধের সময় বিশ্বজুড়ে সব মিলিয়ে ১১৫ কোটি ব্যারেল তেল সরবরাহ হয়নি।
ফলে খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে থাকা তেলের বাজার এখন দ্রুতগতিতে চূড়ান্ত বিপর্যয়ের দিকে এগোচ্ছে। ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের কৌশলগত তেলের মজুদ ১৯৯০ সালের পর এখন সর্বনিম্ন পর্যায়ে। যুক্তরাষ্ট্রের জরুরি মজুত গত ৪৩ বছরের সর্বনিম্নে পর্যায়ে নেমে গেছে। আর বাণিজ্যিক ইনভেন্টরিগুলোও চাপে আছে।
বুধবার ভার্সাইয়ে জি-৭ সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, 'আপনারা কি হাহাকার দেখতে চান? আর মাত্র চার সপ্তাহের মধ্যেই আমাদের মজুত ফুরিয়ে যাবে।'
ট্রাম্পের কথা সত্যি। এ সপ্তাহে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হলেও পারস্য উপসাগর থেকে খুব দ্রুত তেল বের করা সম্ভব না-ও হতে পারে। ফলে অপরিশোধিত তেলের মজুত কার্যত শূন্য হয়ে যাওয়া আটকানো কঠিন।
তেলের দাম তাই আবারও বাড়তে পারে।
খাদের কিনারে
তেলের বাজার নিশ্চিতভাবেই মনে করে, ট্রাম্পের টাইমিং নিখুঁত। ইরানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক চূড়ান্ত হয়ে কার্যকর হওয়ার সাথে সাথেই, ট্রাম্পের ভবিষ্যদ্বাণী ফলিয়ে দিয়ে গত কদিন ধরে তেলের দাম হুড়মুড় করে পড়েছে।
এপ্রিলের মাঝামাঝি যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকেই ব্রেন্ট ক্রুডের দাম কমতে শুরু করে। যুদ্ধের সময় এ তেলের দাম যেখানে ব্যারেলপ্রতি ১২৬.৪১ ডলারে পৌঁছেছিল, এখন তা ৮০ ডলারের নিচে নেমে এসেছে।
তেলের এই দাম কমার নেপথ্যে ছিল যুদ্ধের আগে অপরিশোধিত তেলের ঐতিহাসিক অতি-সরবরাহ। ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সরবরাহ বিপর্যয়ের ধাক্কা সামলাতে এটাই গোটা বিশ্বকে সুরক্ষা দিয়েছিল। কিন্তু সেই বাড়তি মজুত ফুরিয়ে গেছে, দেখা দিয়েছে উদ্বেগজনক ঘাটতি।
গত কয়েক মাসে বিশ্বজুড়ে তেলের মজুত আশঙ্কাজনক হারে কমেছে—প্রায় ১৯ কোটি ব্যারেল। গোটা যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি সরবরাহকারী ওকলাহোমার কাশিংয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ তেল হাব সবে তার কার্যক্ষমতার শেষ সীমায় এসে ঠেকেছে। তেলের ট্যাংকের একেবারে নিচে যা জমে থাকে, তার বেশিরভাগই অব্যবহারযোগ্য গাদ বা তলানি। এর ফলে পাইপের ভেতর প্রয়োজনীয় চাপ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে এবং গ্রাহকের কাছে তেল পৌঁছানো কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
কাশিংয়েই শুধু এই দশা নয়, সারা বিশ্বের তেল মজুতাগারগুলোই এখন বিপজ্জনক খাদের কিনারে এসে দাঁড়িয়েছে।
'এমন একটা সময় আসত যখন তেল পাওয়াই অসম্ভব হয়ে যেত,' বুধবার এই সতর্কবাণী শোনান ট্রাম্প। হরমুজ না খুললে বিশ্ব 'অর্থনৈতিক মহাবিপর্যয়ের' মুখে পড়ত বলে হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
চড়া দাম
হরমুজ খুলে দিলেই যে বিশ্বের এই তেলের সংকট রাতারাতি মিটে যাবে, তা নয়। প্রণালি খুললে তেল সরবরাহ আবার স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়াটুকু শুরু হবে মাত্র।
প্রথমে হরমুজ থেকে সামুদ্রিক মাইন সরাতে হবে। তারপর খালি তেলের ট্যাংকারগুলোকে আবার এই এলাকায় ফিরিয়ে আনা, তেল উৎপাদন নতুন করে চালু করা এবং গন্তব্যের উদ্দেশ্যে তেলের ধীরগতির যাত্রা শুরু করা—সবকিছুর জন্যই অপেক্ষা করতে হবে। এর কোনোটিই চটজলদি হওয়ার নয়।
তেল শিল্প-সংশ্লিষ্টদের ধারণা, পরিস্থিতিকে 'স্বাভাবিকের' কাছাকাছি জায়গায় ফিরিয়ে আনতেই কয়েক মাস লেগে যেতে পারে।
আর তেলের বাজার যতদিন না পুরোপুরি স্বাভাবিক হচ্ছে, ততদিন গোটা বিশ্বকে ওই তেলের মজুদের ওপরই ভরসা করে চলতে হবে।
এ কারণেই বাজার বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, তেলের দাম প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি কমে গেছে। তেলের ট্যাংকগুলো নতুন করে ভর্তি করার আগেই যে বিশ্বজুড়ে তেল পুরোপুরি ফুরিয়ে যেতে পারে, বাজার সেই ঝুঁকিটাকে এখনো পাত্তাই দিচ্ছে না।
আরবিসি ক্যাপিটাল মার্কেটস-এর গ্লোবাল কমোডিটি স্ট্র্যাটেজি প্রধান হেলিমা ক্রফট বলেন, 'বাজার বর্তমান পরিস্থিতির চেয়ে এক লাফে সাত কদম এগিয়ে গেছে। সবাই ভাবছে, "ঝামেলা তো মিটেই গেল!" কিন্তু আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়ার পেছনে যে কত বড় লজিস্টিক্যাল চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তা কেউ দেখছে না।'
হরমুজ খোলার প্রাথমিক উচ্ছ্বাস থিতিয়ে এলেই বাজারের মৌলিক নিয়মগুলো আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে। আর তখনই আবারও লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে শুরু করবে তেলের দাম।
হিসাব কষলে দেখা যাবে: আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা—আইইএ-র পূর্বাভাস অনুযায়ী, বিশ্ববাজারে যদি গ্রাহকদের চাহিদার চেয়ে দৈনিক প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল বাড়তি তেলও উৎপাদিত হয়, তারপরও হারিয়ে যাওয়া ওই ১১৫ কোটি ব্যারেল তেলের ঘাটতি মেটাতে প্রায় পুরো এক বছর সময় লেগে যাবে ।
দরপতন
কিন্তু বাজার সবসময় যুক্তি মেনে চলে না।
ব্যবসায়ীরা দেখছেন, বাজারে খুব জলদি তেলের বন্যা বয়ে যেতে চলেছে। বিশেষ করে অর্থকষ্টে ভোগা ওপেকের সদস্য দেশগুলো উৎপাদন বাড়াতে ছটফট করছে। এই নতুন বাস্তবতার কারণে তেলের বাজারের বর্তমান গতিপথ বদলে দেওয়া বেশ কঠিন হবে বলে মনে করেন সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ক্যাপিটাল অ্যাডভাইজার্সএর সিইও জে হ্যাটফিল্ড।
তবে পরিপ্রেক্ষিতটাও মাথায় রাখা দরকার। যুদ্ধের আগে বিশ্বজুড়ে তেলের এত বড় উদ্বৃত্ত ছিল যে মজুতের এই নজিরবিহীন ধস এখনো আমাদের পুরোপুরি কুপোকাত করতে পারেনি।
ম্যাককোয়ারি গ্রুপের গ্লোবাল অয়েল অ্যান্ড গ্যাস স্ট্র্যাটেজিস্ট বিকাশ দ্বিবেদী বলেন, 'আমাদের একটা বড় রক্ষাকবচ ছিল, যা আমরা ইতিমধ্যে শেষ করে ফেলেছি। গত বছরের আগের তুলনায় আমাদের মজুত এখন কম ঠিকই, তবে তা আশঙ্কাজনক কিছু নয়।'
উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্রের ডিজেল মজুত ২০০৩ সালের পর এখন সর্বনিম্ন স্তরে থাকলেও, তা গত ৫ বছরের গড়ের চেয়ে মাত্র ১২.৪ শতাংশ কম। মার্কিন গ্যাসোলিনের মজুতও গত বছরের তুলনায় মাত্র ৫ শতাংশ কমেছে।
দ্বিবেদী বলেন, মজুত ফুরিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাস্তব হলেও, বাজারে চড়া দামের প্রবক্তারা সমস্যাটিকে একটু বেশিই ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখছেন।
তিনি আরও বলেন, 'ধরা যাক, আপনি কোনো শোধনাগারের তেল ব্যবসায়ী। তেল জোগাড় করাই আপনার কাজ। সংকটের দিনগুলোতে যেখানে তেল পেতে আপনাকে ১০ জায়গায় ফোন করতে হতো, এখন করতে হচ্ছে ৫-৬ জায়গায়। আর আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বিক্রেতারাই সেধে আপনার কাছে আসবে। বলবে—"আমার কাছে তেল আছে, কিনবেন নাকি?"'
