‘এটি ভুল নয়, সরাসরি খুনের উদ্দেশ্যেই গুলি’: বিচারের অপেক্ষায় ৭ মাসের ফিলিস্তিনি শিশুটির পরিবার
গত সপ্তাহে ফিলিস্তিনি শহর হেবরনের একটি সাধারণ রাস্তা দিয়ে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিলেন ফাহদ আবু হাইকাল। পাশে স্ত্রী আর কোলে সাত মাসের সন্তান। হঠাৎ সামনের রাস্তায় একদল ইসরায়েলি সেনাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেন তিনি। ফাহদ গাড়ির গতি কমিয়ে আনেন এবং পুরোপুরি থামার অপেক্ষায় ছিলেন। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে একজন ইসরায়েলি সেনা রাইফেল উঁচিয়ে সরাসরি গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি শুরু করেন।
একটি গুলি গাড়ির হুড ভেদ করে ভেতরে ঢুকে যায়। কিন্তু অন্য একটি প্রাণঘাতী গুলি গাড়ির সামনের কাঁচ ফুঁড়ে স্টিয়ারিং হুইল এবং বাবা ফাহদের একটি আঙুল ছুঁয়ে সরাসরি বিদ্ধ হয় ৭ মাস বয়সী শিশু স্যাম আবু হাইকালের মাথায়।
ইসরায়েলি মানবাধিকার সংস্থা বি'সেলেম-এর তথ্য অনুযায়ী, অধিকৃত পশ্চিম তীরে চলতি বছরে ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে নিহত হওয়া ১৩তম শিশু হলো স্যাম। সংস্থাটি জানিয়েছে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলার পর থেকে এখন পর্যন্ত ওই অঞ্চলে ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে মোট ২৩৬ জন শিশু প্রাণ হারিয়েছে।
ঘটনার ঠিক পরের একটি ভিডিওতে এক মর্মস্পর্শী চিত্র ফুটে উঠেছে। বাবা ফাহদ তার রক্তমাখা কোলের শিশুকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে আছেন। রক্তক্ষরণ বন্ধ করার এক বৃথা চেষ্টায় স্যামের মাথায় হাত চেপে ধরে আছেন তিনি। চারপাশে আকাশ-বাতাস ভারী করে তুলছে স্যামের মা ও দাদির গগনবিদারী আর্তনাদ। ফাহদ শান্ত অথচ মরিয়া চোখে চারপাশে তাকাচ্ছিলেন সাহয্যের জন্য। এরপর একটি চলন্ত গাড়ি থামিয়ে স্যামকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যান তিনি।
স্যামের মা দানিয়া বলেন, "ওরা ওকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল, রক্ত দিয়েছিল, কিন্তু কিছুই করার ছিল না। সব চেষ্টা ব্যর্থ করে ও চলে গেল।" ঘটনার কয়েকদিন পর ফাহদ সিএনএন-কে বলেন, "আমি শুধু গাড়ি থেকে বেরিয়ে ওকে নিয়ে হাসপাতালে দৌড়াতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ওর মাথার সেই আঘাতটি দেখার পর কোনো আশা ছিল না। কোনো আশাই অবশিষ্ট ছিল না।"
ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পর ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ৫ জুনের ওই গুলির কথা স্বীকার করে এক বিবৃতিতে দাবি করে যে, তাদের সেনারা "একটি দ্রুতগামী যান তাদের দিকে ধেয়ে আসতে দেখেছিল" এবং একজন ইসরায়েলি সেনা "জবাব হিসেবে গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছে।"
তবে বি'সেলেম-এর সংগৃহীত নতুন একটি ভিডিও সম্পূর্ণ ভিন্ন সত্য প্রকাশ করেছে। কোনো শব্দ না থাকলেও ভিডিওতে স্পষ্টভাবে দেখা যায়, ফাহদের গাড়িটি সেনাদের দিকে ধেয়ে আসার পরিবর্তে উল্টো থামার জন্য গতি অনেক কমিয়ে দিয়েছিল। ভিডিও ধারণকারী ব্যক্তি বি'সেলেম-কে জানিয়েছেন, গাড়িটি ঠিক থামার মুহূর্তেই ওই সেনা গুলি চালিয়েছিলেন। ফাহদ এবং তার মা সিএনএন-এর সাথে ভিডিওটি দেখার সময় গুলির সেই সঠিক মুহূর্তটি শনাক্ত করেছেন। তারা তিনজনই রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা সেই নির্দিষ্ট সেনাকে শনাক্ত করেছেন, যিনি গাড়ি থেকে মাত্র ৩০ ফুট দূর থেকে টার্গেট করে গুলি চালিয়েছিলেন।
ফাহদের মা ফেরিয়াল বলেন, "আমরা আশা করেছিলাম তারা আমাদের বলবে— 'বেরিয়ে যাও, ফিরে যাও' অথবা ঘোরানোর সুযোগ দিতে বড়জোর ফাঁকা গুলি ছুড়বে। কিন্তু তারা সরাসরি ওকে গুলি করে দিল।" ভিডিওতে দেখা যায়, গুলি চালানোর পর ওই সেনা গাড়িটির দিকে না এগিয়ে বরং নির্বিকারভাবে উল্টো দিকে হেঁটে চলে যাচ্ছেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, উপস্থিত কোনো সেনাই শিশুটিকে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার জন্য এগিয়ে আসেনি।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা এই ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে। সিএনএন ঘটনাস্থলে বেশ কয়েকটি সিসিটিভি ক্যামেরা শনাক্ত করলেও কোনো ফুটেজ পায়নি। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ইসরায়েলি বাহিনী পরে এলাকায় ফিরে এসে সমস্ত সিসিটিভি রেকর্ডিং জব্দ করে নিয়ে গেছে। ইসরায়েলি বাহিনী এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
ফাহদ এই তদন্তে সহযোগিতা করছেন, যদিও তিনি জানেন ইসরায়েলি সামরিক তদন্তে অপরাধীদের সাজা হওয়ার নজির খুব একটা নেই। তিনি বলেন, "যখন আপনি চোখের সামনে কাউকে লক্ষ্য করে গুলি করেন, তখন তা ভুল হতে পারে না। সে সরাসরি হত্যার উদ্দেশ্যেই গুলি করেছে।"
বেথলেহেমে শোকাতুর আবু হাইকাল পরিবারের ঘরে এখন শুধু কান্নার রোল। স্যামের মা দানিয়া ঘরের এক কোণে বিছানায় শুয়ে আছেন। সন্তান হারানোর অসীম শোকের পাশাপাশি তিনি নিজের শারীরিক ক্ষত নিয়েও লড়াই করছেন। তার সন্তানকে বিদ্ধ করা সেই বুলেটের একটি অংশ দানিয়ার মুখেও আঘাত করেছিল—যা তার ডান গাল দিয়ে ঢুকে কানের পেছন দিয়ে বেরিয়ে যায়। স্প্লিন্টারের কিছু অংশ এখনো তার বুকে বিদ্ধ হয়ে আছে। হৃদপিণ্ডের খুব কাছে হওয়ায় চিকিৎসকরা অস্ত্রোপচার করে সেগুলো বের করার সাহস পাচ্ছেন না।
শারীরিক যন্ত্রণার চেয়েও দানিয়াকে এক নিদারুণ মানসিক কষ্ট তিলে তিলে মারছে। তিনি বলেন, "আমি ওকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছিলাম। এখন আমার বুকে খুব ব্যথা হয়।" এই যন্ত্রণার কারণে তাকে প্রতিদিন ব্রেস্ট পাম্প দিয়ে দুধ বের করতে হচ্ছে, যা তাকে প্রতি মুহূর্তে মনে করিয়ে দিচ্ছে যে তিনি কী হারিয়েছেন। তিনি হাউমাউ করে কেঁদে উঠে বলেন, "যতবার আমি এই পাম্প ব্যবহার করি, আমি ডুকরে কেঁদে উঠি।"
স্যাম ছিল দানিয়ার একমাত্র সন্তান। তার ফোনের গ্যালারি জুড়ে রয়েছে স্যামের হাসিমাখা অজস্র ছবি। স্যামের নানা নিদাল সালামেহ কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, "আমার সাতজন নাতি-নাতনি ছিল, এখন আছে ছয়জন। স্যাম ছিল অনন্য। ও দুই হাত বাড়িয়ে আমার কোলে আসার জন্য ব্যাকুল হয়ে থাকত। এই ৭ মাসের নিষ্পাপ শিশুটি তাদের কী ক্ষতি করেছিল?"
সন্তান হত্যার বিচার নিয়ে দানিয়ার মনে এখন আগ্নেয়গিরির মতো ক্ষোভ। তিনি চান তার সন্তানকে হত্যাকারী সেনা ঠিক সেই পরিমাণ ব্যথা অনুভব করুক যা তিনি করছেন। তিনি বলেন, "তার শাস্তি হওয়া উচিত। সে যেন কিছুতেই পার পেয়ে না যায়।" ফিলিস্তিনিদের এই অবিরাম আর্তনাদ আর বিচারহীনতার দীর্ঘ ইতিহাসের মাঝে দানিয়া এখন শুধু এক টুকরো ইনসাফের অপেক্ষায়।
