উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে নীরব চীন; তবে কি জিতলেন কিম জং উন?
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের মধ্যকার বহুল আলোচিত শীর্ষ বৈঠকের পর দুই দেশের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলো হাজার হাজার শব্দের প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তবে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও চতুরতার সঙ্গে সেখানে একটি বিষয় সম্পূর্ণ এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে—আর তা হলো পিয়ংইয়ংয়ের পারমাণবিক কর্মসূচির প্রসঙ্গ। পশ্চিমা বিশ্বের জন্য চরম উদ্বেগের এই বিষয়টি নিয়ে বেইজিংয়ের এমন রহস্যময় নীরবতা মূলত উত্তর কোরিয়া প্রশ্নে চীনের দীর্ঘদিনের নীতিতে এক বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
২০১৯ সালে নিরস্ত্রীকরণ আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার আগপর্যন্ত উত্তর কোরিয়াকে পারমাণবিক কর্মসূচি থেকে দূরে রাখতে এবং বিনিময়ে আর্থিক সহায়তা ও রাজনৈতিক স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন একসঙ্গে কাজ করছিল। বেইজিং তখন 'নিউক্লিয়ার নিরস্ত্রীকরণ' বা ডেনিউক্লিয়ারাইজেশন নীতির পক্ষে জোর দিয়েছিল, যা ওয়াশিংটন, সিউল ও টোকিওর মনে এই আশা জাগিয়েছিল যে চীন তার অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে পিয়ংইয়ংয়ের পারমাণবিক অবস্থান নরম করবে। কিন্তু দীর্ঘ সাত বছর পর উত্তর কোরিয়ায় শি জিনপিংয়ের এই প্রথম সফর সেই আশার গুড়ে বালি ঢেলে দিল।
বিশ্লেষকদের মতে, শি জিনপিংয়ের এই নীরবতা আসলে ২০১১ সালে কিম জং উন ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে উত্তর কোরিয়ার অর্জিত শক্তিশালী পারমাণবিক সক্ষমতাকে পরোক্ষভাবে মেনে নেওয়ারই নামান্তর। এটি একই সঙ্গে এই বাস্তবতাকে নির্দেশ করে যে, কোনো কূটনৈতিক চাপের মুখে পিয়ংইয়ং তাদের একমাত্র 'সুরক্ষা কবচ' হিসেবে বিবেচিত এই পরমাণু অস্ত্র পরিত্যাগ করবে না।
অথচ ২০১৯ সালে উত্তর কোরিয়া সফরের সময় শি জিনপিংয়ের অবস্থান ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তখন চীনের গণমাধ্যমগুলো তাকে উদ্ধৃত করে লিখেছিল যে কোরীয় উপদ্বীপের নিরস্ত্রীকরণে বেইজিং একটি গঠনমূলক ভূমিকা পালন করবে।
বর্তমানে চীনের প্রধান লক্ষ্য হলো উত্তর কোরিয়া এবং সমগ্র অঞ্চলের স্থিতিশীলতা রক্ষা করা। বেইজিং আশঙ্কা করছে, পিয়ংইয়ংয়ের পতন হলে লাখ লাখ মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে চীনে প্রবেশ করতে পারে, যা চীনের জন্য বড় সংকট তৈরি করবে। তিয়ানজিন ফরেন স্টাডিজ ইউনিভার্সিটির রিজিওনাল স্টাডিজ ইনস্টিটিউটের ডিন জিইয়ং ঝেং মনে করেন, চীন কখনোই উত্তর কোরিয়াকে সরাসরি পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করতে চাপ দেয়নি।
এর পরিবর্তে বেইজিং সর্বদা সমগ্র কোরীয় উপদ্বীপের নিরস্ত্রীকরণের ওপর জোর দিয়েছে। এর মাধ্যমে তারা মূলত ইঙ্গিত করে যে, দক্ষিণ কোরিয়াকে পারমাণবিক ছাতা দিয়ে সুরক্ষা দেওয়ার যে মার্কিন প্রতিশ্রুতি রয়েছে, তা বন্ধ করা হোক এবং উপদ্বীপের কাছে মার্কিন বোমারু বিমানের টহল বন্ধ হোক। ঝেং বলেন, 'চীন ক্রমেই এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাচ্ছে যে, কেবল নিরস্ত্রীকরণ-প্রথম নীতিটি অবাস্তব এবং তা এই অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করতে পারে।'
কিমের জন্য তার পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো সমালোচনা না হওয়াটা এক ধরনের কূটনৈতিক বিজয়। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি উত্তর কোরিয়াকে একটি পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্র হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছেন। এমন স্বীকৃতি মিললে দেশটির ওপর আরোপিত জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা শিথিল হওয়ার পথও তৈরি হতে পারে।
তবে পিয়ংইয়ং সফরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং দৃশ্যত পারমাণবিক ইস্যু এড়িয়ে গেলেও দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র পার্ক ইল মঙ্গলবার বলেন, এ কারণে সিউলের প্রত্যাশা কমানো উচিত হবে না। তার দাবি, চীন এখনো কোরীয় উপদ্বীপকে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত করার লক্ষ্যকে সমর্থন করে যাচ্ছে।
গত মাসে ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের বৈঠকের পর হোয়াইট হাউস দাবি করেছিল যে দুই নেতা উত্তর কোরিয়ার নিরস্ত্রীকরণের লক্ষ্য পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তবে চীনের বিবৃতিতে কেবল আলোচনা হওয়ার কথা বলা হয়েছিল।
কিমের ক্ষমতাধর বোন ও সরকারের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা কিম ইয়ো জং পরবর্তীতে হোয়াইট হাউসের সেই বক্তব্যকে 'ভুল তথ্য' বলে উড়িয়ে দেন। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, উত্তর কোরিয়ার নিরস্ত্রীকরণের মার্কিন প্রচেষ্টা মূলত একটি 'অপ্রাসঙ্গিক বা সেকেলে স্বপ্ন'।
এর আগে কিম জং উন তাঁর একটি নতুন ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্ল্যান্ট উদ্বোধন করে পারমাণবিক শক্তি জ্যামিতিক হারে বাড়ানোর ঘোষণা দেন।
সিউলের ইওহা উইমেন্স ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক পার্ক ওয়ন গন মনে করেন, চীন হয়তো উত্তর কোরিয়াকে নিজের প্রভাব বলয়ের মধ্যে রাখতে চায় এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দর-কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে সেই সম্পর্ক ব্যবহার করতে আগ্রহী।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং সোমবার দাবি করেন, উত্তর কোরিয়া প্রতি বছর ১০ থেকে ২০টি পারমাণবিক বোমা তৈরির মতো জ্বালানি উৎপাদন করছে এবং দেশটি এমন আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির কাছাকাছি পৌঁছে গেছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে পারমাণবিক ওয়ারহেড পৌঁছে দিতে সক্ষম।
অন্যদিকে কিম জং উন বারবার জোর দিয়ে বলেছেন, পারমাণবিক অস্ত্র উত্তর কোরিয়ার জাতীয় পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তিনি দেশের সংবিধানেও পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রের মর্যাদা অন্তর্ভুক্ত করেছেন এবং এ কর্মসূচির জন্য ক্রমবর্ধমান সম্পদ বরাদ্দ দিচ্ছেন।
কিছু বিশ্লেষকের মতে, শি জিনপিংয়ের সাম্প্রতিক সফরে 'নিরস্ত্রীকরণ' শব্দটি এড়িয়ে যাওয়া বেইজিংয়ের অবস্থানের স্পষ্ট পরিবর্তন এবং উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক মর্যাদাকে নীরব স্বীকৃতি দেওয়ার শামিল।
যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কবিষয়ক জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ ফাউন্ডেশনের জ্যেষ্ঠ ফেলো সিয়ং হিয়ন লি বলেন, এর অর্থ হতে পারে উত্তর কোরিয়াকে ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার প্রচেষ্টা আর সাময়িক নয়, বরং স্থায়ী বৈশিষ্ট্যে পরিণত হবে।
তার ভাষায়, 'বেইজিংয়ের নীরবতাকে প্রশাসনিক ভুল হিসেবে দেখা উচিত নয়; এটি একটি সচেতন কৌশলগত বার্তা। উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক মর্যাদাকে নীরবে মেনে নিয়ে ভবিষ্যতের যেকোনো আলোচনায় চীন নিজেকে অপরিহার্য অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে।'
তবে বিশ্লেষকদের মতে, উত্তর কোরিয়ার সামরিক শক্তি বৃদ্ধির বিষয়ে চীনের সমর্থন নিঃশর্ত নয়। ইওহা উইমেন্স ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক লেইফ-এরিক ইজলি বলেন, শি জিনপিংয়ের সাম্প্রতিক সফর কিম জং উনের প্রতি বেইজিংয়ের রাজনৈতিক সমর্থনের ইঙ্গিত দিলেও এর অর্থ এই নয় যে চীন উত্তর কোরিয়ার সব পদক্ষেপ মেনে নেবে।
তার মতে, চীনের প্রধান লক্ষ্য হলো অঞ্চলে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং নিজের কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা করা। কিন্তু উত্তর কোরিয়া যেভাবে ধারাবাহিকভাবে সামরিক সক্ষমতা বাড়িয়ে চলেছে, তা একসময় চীনের জন্যও অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠতে পারে।
