বিশ্বকাপে দায়িত্ব পালন করতে যাওয়া সোমালি রেফারিকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে দেওয়া হলো না
ফিফা বিশ্বকাপে দায়িত্ব পালনের জন্য সোমালিয়ার রেফারি ওমর আরতান শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ফ্লোরিডায় পৌঁছানোর পর তাকে দেশটিতে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ সোমবার আল জাজিরাকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
ওমরকে প্রবেশের অনুমতি না দেওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ভ্রমণ বিধিনিষেধ এবং বিশ্বকাপে তার সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি না পাওয়ার পর সোমালিয়ার রেফারি ওমর আরতানকে বিশ্বকাপের ম্যাচ পরিচালনার তালিকা থেকে সরিয়ে দিয়েছে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা।
ফিফা এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার পর আরতানকে টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণের সুযোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, 'ওমর আরতান যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে অনুমতি না পাওয়ায় ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে ম্যাচ পরিচালনা ও দায়িত্ব পালনের জন্য প্রশিক্ষণ নিতে পারবেন না।'
যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের এক মুখপাত্র ইমেইল বার্তায় জানিয়েছেন, ওমরকে 'ভেটিং–সংক্রান্ত উদ্বেগ দেখিয়ে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি।'
এ বিষয়ে বিস্তারিত আর কিছু জানানো হয়নি। তবে ওমরের যুক্তরাষ্ট্রে আগমন ইঙ্গিত দেয়, তার কাছে ভ্রমণের আগে বৈধ ভিসা ছিল।
সোমালিয়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত। ট্রাম্প অতীতেও দেশটি ও তার জনগণকে নিয়ে একাধিকবার কটূক্তি করেছেন। গত বছরের শেষ দিকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত সোমালি অভিবাসীদের 'আবর্জনা' বলে মন্তব্য করে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন।
বিশ্বকাপে অফিশিয়াল দায়িত্বপালনের জন্য যে ৫২ জন রেফারির নাম তালিকাভুক্ত করা হয়েছে, ওমর আরতান তাদের মধ্যে একজন। তিনি আফ্রিকার শীর্ষ রেফারিদের একজন হিসেবে পরিচিত এবং প্রথম সোমালি হিসেবে বিশ্বকাপ ম্যাচ পরিচালনার সুযোগ পাওয়ার কথা ছিল তার।
যুক্তরাষ্ট্রের ভ্রমণ নীতি এবং বিশ্বকাপ ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্কের সর্বশেষ সংযোজন এই ঘটনা। আসন্ন বিশ্বকাপটি আয়োজন করছে যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো এবং কানাডা।
ইরানের জাতীয় দলকে ভিসা জটিলতার কারণে মেক্সিকোতে অবস্থান করতে হচ্ছে। দেশটির খেলোয়াড়দের যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে ম্যাচ খেলার অনুমতি দেওয়া হলেও ম্যাচ শেষে তাদের আবার মেক্সিকোতে ফিরে যেতে হবে। তবে দলের কিছু কর্মকর্তাকে সম্পূর্ণভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা দেওয়া হয়নি।
এছাড়া, স্টেডিয়ামগুলোর আশপাশে বা ভেতরে বিদেশি নাগরিকদের হয়রানি এবং অবৈধ অভিবাসীদের লক্ষ্য করে ফেডারেল এজেন্টদের তৎপরতা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
সোমবার নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি বিশ্বকাপ চলাকালে শহরে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইস) এজেন্টদের বড় ধরনের উপস্থিতি বাড়ানোর ট্রাম্প প্রশাসনের পরিকল্পনার কড়া সমালোচনা করেন।
তার শহরটি আসন্ন টুর্নামেন্টে একাধিক ম্যাচ, এমনকি ফাইনাল ম্যাচেরও (যা কাছের নিউ জার্সিতে অনুষ্ঠিত হবে) আয়োজক হিসেবে প্রস্তুত রয়েছে।
একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টে মামদানি লেখেন, 'অভিবাসী ছাড়া ফুটবল কল্পনাই করা যায় না। অভিবাসীরাই এই খেলা খেলে, কোচিং করায়, স্টেডিয়ামে কাজ করে, গ্যালারি ভরিয়ে ফেলে এবং বিশ্বকাপের মতো উদ্যাপনকে সম্ভব করে। যুক্তরাষ্ট্রের পুরুষ জাতীয় দলের ছয়জন খেলোয়াড়ই অভিবাসী।'
তিনি আরও বলেন, 'আমরা আমাদের কমিউনিটিতে ভয় ছড়াতে আইস বা অন্য কাউকে অনুমতি দেব না। বিশেষ করে এমন সময়ে, যখন পুরো বিশ্ব আমাদের শহরে আসছে। আমরা গর্বের সঙ্গে আমাদের অভিবাসী প্রতিবেশীদের পাশে দাঁড়াব এবং এসব আক্রমণকে বিভাজনের চেষ্টা হিসেবে প্রত্যাখ্যান করব।'
এদিকে, আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস কাউন্সিল (সিএআইআর) ওমর আরতানকে প্রবেশের অনুমতি না দেওয়ার পর ট্রাম্প প্রশাসনের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার তীব্র সমালোচনা করেছে।
সংস্থাটির ডেপুটি ডিরেক্টর এডওয়ার্ড আহমেদ মিচেল আল জাজিরাকে বলেন, 'আমাদের দেশে কারও প্রবেশ নিষিদ্ধ করা উচিত নয় শুধু তার জাতি বা জাতিগত পরিচয়ের কারণে। বিশেষ করে বিশ্বকাপে অংশ নিতে আসা কোনো কোচ বা রেফারির ক্ষেত্রে এটি আরও বেশি সত্য।'
তিনি আরও বলেন, 'সোমালিরা অন্যান্য ভিজিটরের মতোই একই ধরনের যাচাই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়। একবার সেই প্রক্রিয়া শেষ হলে কেবল জাতীয়তার কারণে কাউকে নিষিদ্ধ করার কোনো যুক্তি নেই। এটি আমাদের মূল্যবোধ ও আইনের পরিপন্থী।'
ফিফা এ বিষয়ে আল জাজিরার মন্তব্যের অনুরোধের পর তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ জানিয়েছে, বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ—অ্যাথলেট, কোচ বা স্টাফ কারও ক্ষেত্রেই—কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রোটেকশন (সিবিপি)-এর বিমানবন্দর বা সীমান্তে সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলে না।
এক মুখপাত্র বলেন, 'প্রবেশযোগ্যতা নির্ধারণ করা হয় প্রতিটি ক্ষেত্রে আলাদাভাবে, আইনশৃঙ্খলা, জাতীয় নিরাপত্তা এবং অভিবাসন সংক্রান্ত তথ্যের ভিত্তিতে।'
তিনি আরও বলেন, 'সিবিপি কর্মকর্তাদের ভ্রমণকারীদের জিজ্ঞাসাবাদ, তল্লাশি এবং যুক্তরাষ্ট্রের আইনের আওতায় প্রবেশযোগ্যতা নির্ধারণের পূর্ণ ক্ষমতা রয়েছে।'
এর আগে মোগাদিশুতে আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ওমর আরতান বলেন, সব প্রতিকূলতা ও সংঘাতের মধ্যেও বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে অংশ নেওয়া তার জন্য এক বিশাল সম্মানের বিষয়।
তিনি জানান, সোমালিয়ায় সহিংসতা ও বিস্ফোরণের কারণে অনেক সময় তাকে স্থানীয় স্টেডিয়ামে যাওয়ার রুট পরিবর্তন করতে হয়।
তিনি বলেন, 'আপনি রেফারি হিসেবে কখনোই হাল ছেড়ে দিতে পারেন না। আপনার একটি লক্ষ্য থাকতে হবে। আমারও সেই লক্ষ্য ছিল, কিন্তু পথটা সহজ ছিল না।'
তিনি আরও বলেন, 'আপনাকে এগিয়ে যেতে হবে, লড়াই করতে হবে—যদি আপনি বিশ্বকাপের মতো জায়গায় পৌঁছাতে চান।'
