যেকোনো মানুষকে হত্যা করাই অপরাধ: ইরানি চলচ্চিত্র নির্মাতা আসগর ফরহাদি
যেকোনো মানুষকে হত্যা করাই অপরাধ বলে মন্তব্য করেছেন নন্দিত ইরানি পরিচালক আসগর ফরহাদি। কান চলচ্চিত্র উৎসবে নিজের নতুন ফরাসি ভাষার সিনেমা 'প্যারালাল টেলস' নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেছিলেন। ওই সম্মেলনে ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি ও সাম্প্রতিক যুদ্ধ নিয়েও কথা বলেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে ফরহাদিকে ইরানের ভেতরের পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন করা হয়। সাম্প্রতিক যুদ্ধের কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, কিছুদিন আগেও তিনি তেহরানে ছিলেন এবং ওই ঘটনাগুলোর প্রভাব এখনো তার মনে গভীরভাবে দাগ কেটে আছে।
ইরানের ভেতরের পরিস্থিতিকে 'বেদনাদায়ক' বলে বর্ণনা করে অস্কারজয়ী এই পরিচালক বলেন, 'নিরীহ মানুষ ও সাধারণ নাগরিকদের হত্যার বিরোধিতা করার অর্থ এই নয় যে আপনি রাস্তায় মানুষ হত্যাকে সমর্থন করছেন।'
যেকোনো মানুষকে হত্যা করাকেই অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করেছেন ফরহাদি। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, যেকোনো দৃষ্টিকোণ থেকেই মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়া তার কাছে অগ্রহণযোগ্য। তিনি বলেন, 'এটা খুবই বেদনাদায়ক যে এই শতাব্দীতে এসেও, এত উন্নতির পরও, আমাদের প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে অকারণে নিরীহ মানুষ নিহত হওয়ার খবর শুনতে হয়।'
কিশলোভস্কির অনুপ্রেরণা ও ডিজিটাল যুগের ভয়্যারিজম
'প্যারালাল টেলস' সিনেমার উদ্বোধনী প্রদর্শনীতে ফরহাদি এবং তার ফরাসি অভিনয়শিল্পীদের সাড়ে ৫ মিনিট ধরে দাঁড়িয়ে সম্মান (স্ট্যান্ডিং ওভেশন) জানান দর্শকেরা। সিলভি নামের এক নারীকে কেন্দ্র করে এই ছবির গল্প এগিয়েছে, যিনি নিজের নতুন উপন্যাসের জন্য অনুপ্রেরণা খুঁজতে প্রতিবেশীদের ওপর নজর রাখেন। কিন্তু অ্যাডাম নামের এক তরুণ তার জীবনে প্রবেশ করার পর সবকিছু এক অপ্রত্যাশিত মোড় নেয়।
ফরহাদি জানান, এই সিনেমার প্রাথমিক ধারণা পোলিশ পরিচালক ক্রিস্তফ কিশলোভস্কির একজন সহলেখক তাকে দিয়েছিলেন, যা কিশলোভস্কির বিখ্যাত 'ডেকালগ' সিরিজের একটি পর্ব থেকে অনুপ্রাণিত। ফরহাদি প্রয়াত এই পোলিশ পরিচালকের থেকে ধারণাটি গ্রহণ করেন। বিশেষ করে সিরিজের ষষ্ঠ পর্বটি—যা পরে 'আ শর্ট ফিল্ম অ্যাবাউট লাভ' নামে পরিচিতি পায়—বেছে নিয়ে তিনি একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র তৈরি করেছেন।
ফরহাদি বলেন, 'একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে এগুলো কোনো সচেতন সিদ্ধান্ত নয়; আপনি শুধু গল্পকে তার নিজের পথে এগোতে দেন।'
ভয়্যারিজম (গোপনে অন্যের দিকে নজর রাখার মানসিকতা) এবং কল্পনা ও বাস্তবতার মধ্যে যে সূক্ষ্ম রেখা রয়েছে, তা নিয়েও কথা বলেন ফরহাদি। তিনি বলেন, 'আমরা এমন এক পৃথিবীতে বাস করি, যা আখ্যান বা গল্পে ভরা। আমাদের চারপাশে অসংখ্য গল্প রয়েছে। এসব গল্পের মাধ্যমেই আমাদের বলে দেওয়া হয় যে আমরা কী ভাবব এবং কোনো বিষয়কে কীভাবে দেখব। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা সবাই যেন অন্যের জীবনে উঁকি মারা এক একজন "ভয়্যার"। এরপর আমরা তাদের নিয়ে নানা কল্পনা করি এবং ভাবি যে আমরা সব জানি।'
ডিজিটাল যুগের এই চিত্রটি বুঝতে নিজের কন্যারা তার 'সবচেয়ে বড় শিক্ষক' হিসেবে কাজ করেছে বলেও স্বীকার করেন ফরহাদি।
অতীতের অভিযোগ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
'প্যারালাল টেলস' সিনেমার গল্পে অন্যের কাজ নিজের বলে চালিয়ে দেওয়া বা চুরির (প্ল্যাজিয়ারিজম) বিষয়টি উঠে এসেছে। এই বিষয়টির সঙ্গে তার আগের সিনেমা 'আ হিরো' নিয়ে হওয়া আইনি বিবাদের কোনো সম্পর্ক আছে কি না—এমন প্রশ্নেরও উত্তর দেন ফরহাদি (উল্লেখ্য, 'আ হিরো' সিনেমার মূল গল্পটি পাবলিক ডোমেইন বা সবার জন্য উন্মুক্ত থাকায় শেষ পর্যন্ত তিনি ওই অভিযোগ থেকে মুক্তি পান)।
ফরহাদি বলেন, 'আমি যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছি, এটি হয়তো অবচেতনভাবেই তার ফল। তবে কিশলোভস্কির এই প্রজেক্টটি ওই ঘটনার অনেক আগের, তাই আমি জানি না এই দুটির মধ্যে কোনো সংযোগ আছে কি না।'
ইরানি শিল্পী ও কলাকুশলী নিয়ে দেশের বাইরে কোনো ইরানি সিনেমা তৈরি করা সম্ভব কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ফরহাদি বলেন, 'তুরস্ক বা জর্জিয়ার মতো জায়গায় লোকেশন রিক্রিয়েট করা (নতুন করে সেট বানানো) বেশ ব্যয়বহুল হবে। তবে এতে আমার কোনো সমস্যা নেই। আমি যদি ইরানের বাইরে বসেও পুরোপুরি একটি ইরানি সিনেমা বানাতে চাই, হয়তো ভবিষ্যতে বানাব।'
তার পরের প্রজেক্ট বা সিনেমা কী হতে যাচ্ছে—এমন প্রশ্নের জবাবে মুচকি হেসে এই পরিচালক বলেন, 'এই বাচ্চাটার তো মাত্রই জন্ম হলো।'
