ট্রাম্প-শি শীর্ষ সম্মেলনের আগে এপ্রিলের রপ্তানি তথ্য জানাল চীন, প্রবৃদ্ধি ১৪.১০ শতাংশ
ইরান যুদ্ধ এবং যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত উচ্চ শুল্কের নেতিবাচক প্রভাব সত্ত্বেও— এপ্রিলে চীনের রপ্তানি আয় গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৪ দশমিক ১০ শতাংশ বেড়েছে। আজ শনিবার (৯ মে) চীন সরকারের পক্ষ থেকে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়।
আগামী সপ্তাহে বেইজিংয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যে একটি বহুল প্রতিক্ষীত বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। এই শীর্ষ বৈঠকের মাত্র কয়েক দিন আগেই ইতিবাচক এ তথ্য সামনে এল।
রপ্তানির এই হার বিশ্লেষকদের ধারণাকেও ছাড়িয়ে গেছে। গত মার্চে চীনের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ২.৫ শতাংশ, সেই তুলনায় এপ্রিলের ১৪.১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি একটি বড় উল্লম্ফন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো, যুক্তরাষ্ট্রে চীনের রপ্তানি গত বছরের তুলনায় ১১.৩ শতাংশ বেড়েছে, যা মার্চে ২৬.৫ শতাংশ কমে গিয়েছিল। অন্যদিকে, এপ্রিলে চীনের আমদানি ২৫.৩ শতাংশ বেড়েছে, যা মার্চের ২৭.৮ শতাংশের চেয়ে কিছুটা কম হলেও বেশ শক্তিশালী।
ট্রাম্প-শি-র এই আসন্ন বৈঠক এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে যখন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নানা ইস্যুতে জর্জরিত। বিশেষ করে ইরান যুদ্ধের অবসান ঘটানোর কূটনৈতিক তৎপরতা— এখন দুই দেশের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক সংঘাতকেও ছাপিয়ে গেছে।
ডাচ ব্যাংক আইএনজি-র গ্রেটার চীন অঞ্চলের প্রধান অর্থনীতিবিদ লিন সং বলেন, "আমরা আশা করছি সেমিকন্ডাক্টর এবং অটোমোবাইল খাতের হাত ধরে, চলতি বছর বহিঃবিশ্বে চীনের পণ্যের চাহিদা প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে থাকবে।"
গত মার্চে চীনের নেতারা বার্ষিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৪.৫% থেকে ৫% নির্ধারণ করেছেন, যা ১৯৯১ সালের পর সর্বনিম্ন। তবে ইউরোপ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, লাতিন আমেরিকা এবং আফ্রিকায় রপ্তানি বাড়ার কারণে চীনের সামগ্রিক অর্থনীতি শক্তিশালী থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।
গত বছর ট্রাম্প ক্ষমতা গ্রহণের পর কঠোর শুল্ক ও প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করায়— যুক্তরাষ্ট্রে চীনের রপ্তানি বছরের অধিকাংশ সময় নিম্নমুখী ছিল। তবে অর্থনীতিবিদ লিন সং মনে করেন, ২০২৫ সালের শুল্ক যুদ্ধের ধাক্কা কাটিয়ে চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের বাণিজ্য পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে।
গত বছর দক্ষিণ কোরিয়ায় ট্রাম্প-শি'র বৈঠকের পর অর্জিত এক বছরের বাণিজ্যিক 'শান্তি চুক্তি'র ধারাবাহিকতায়, এবারের বৈঠকে বিরল খনিজ এবং মার্কিন প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর বিধিনিষেধ নিয়ে আলোচনা হতে পারে। এইচএসবিসি-র অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, এই বৈঠকে বড় কোনো নাটকীয় পরিবর্তন না এলেও— বাণিজ্যিক টানাপোড়েন কমানোর ক্ষেত্রে কিছু 'ক্রমবর্ধমান' পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।
ক্যাপিটাল ইকোনমিকস-এর জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ লেয়াহ ফাহি এক নোটে লিখেছেন, "সব মিলিয়ে চীন এখন সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। উচ্চ শুল্ক আরোপ সত্ত্বেও গত এক বছরে চীনের রপ্তানি বৃদ্ধি থামানো যায়নি। বেইজিং প্রমাণ করেছে যে তারা মার্কিন চাপ মোকাবিলা করে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে প্রস্তুত।"
অন্যদিকে, বিএনপি পারিবাস সিকিউরিটিজ (চীন)-এর মাল্টি-অ্যাসেট ইনভেস্টমেন্ট প্রধান ওয়েই লি সতর্ক করেছেন যে, ইরান যুদ্ধের কারণে তেল ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি— চীনের কারখানাগুলোর উৎপাদন ও পরিবহন খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এছাড়া বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি বিদেশের বাজারে ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে।
তা সত্ত্বেও, বিশাল তেলের মজুদ এবং জ্বালানির বহুমুখী উৎসের কারণে অন্যান্য দেশের তুলনায় চীনের অর্থনীতি বর্তমানে অনেক বেশি স্থিতিশীল। আইএনজি-র মতে, আবাসনখাতের দীর্ঘস্থায়ী সংকট কাটিয়ে চীন ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে, ফলে ২০২৬ সালে দেশটির আমদানি প্রবাহ আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
