নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইরান-রাশিয়ার ড্রোন নির্মাণে যন্ত্রাংশ সরবরাহ করছে চীন
গত ৫ মার্চ, যখন মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানছিল এবং তেহরান তেল আবিব ও মার্কিন ঘাঁটি থাকা উপসাগরীয় দেশগুলোতে পাল্টা হামলা চালাচ্ছিল, ঠিক তখনই চীন ভিত্তিক একটি সার্ভার থেকে একটি গণ-ইমেইল পাঠানো হয়।
শিয়ামেন ভিক্টরি টেকনোলজি থেকে আসা সেই বার্তায় লেখা ছিল, "ইরানের বিরুদ্ধে এই আগ্রাসনে আমরা গভীরভাবে শোকাহত ও ক্ষুব্ধ, আমাদের হৃদয় আপনাদের সাথে আছে।" কোম্পানিটি তাদের ইমেইলে জার্মানির নকশা করা বিশেষ এক ধরণের ইঞ্জিন বিক্রির প্রস্তাব দেয়, যা সাধারণত ;ওয়ান-ওয়ে অ্যাটাক ড্রোন' বা আত্মঘাতী ড্রোনে ব্যবহৃত হয়।
যুক্তরাষ্ট্র ইরান ও রাশিয়ার কাছে 'লিমবাখ এল৫৫০' নামক এই ইঞ্জিনের বিক্রি নিষিদ্ধ করেছে। এটি ইরানের শাহেদ-১৩৬ আত্মঘাতী ড্রোনের একটি গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র, যা রাশিয়া বর্তমানে ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করছে। ভিক্টরি টেকনোলজি তাদের ওয়েবসাইটের পণ্য তালিকায় শাহেদ স্টাইলের ড্রোনের ছবি ব্যবহার করেছে এবং সাথে স্লোগান দিয়েছে— "ইনোভেটিং এভিয়েশন ইঞ্জিন সল্যুশনস।"
অখ্যাত এক ছোট চীনা কোম্পানির এমন প্রকাশ্য যুদ্ধকালীন বিপণন কৌশল ওয়াশিংটনের জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে 'ডুয়াল-ইউজ' বা দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য পণ্য (যা বেসামরিক ও সামরিক উভয় কাজে লাগে) শত্রুপক্ষের হাতে পৌঁছানো রোধ করতে হিমশিম খাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।
চীনের কাস্টমস তথ্যানুযায়ী, দেশটির কোম্পানিগুলো রাশিয়া ও ইরানে কয়েকশ কনটেইনার ভর্তি এধরনের পণ্য বা যন্ত্রাংশ পাঠাচ্ছে। প্যাকিং লিস্টে থাকা এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে ইঞ্জিন, কম্পিউটার চিপ, ফাইবার-অপটিক কেবল এবং জাইরোস্কোপ। সাবেক মার্কিন ট্রেজারি কর্মকর্তা ও অস্ত্র বিশ্লেষকদের মতে, এক সময় চীনা রপ্তানিকারকরা নিষেধাজ্ঞা এড়াতে চালানের গায়ে ভুল লেবেল ব্যবহার করত, কিন্তু এখন অনেক ক্ষেত্রে তারা আর সেই পরোয়াও করছে না।
ড্রোন যুদ্ধের এই যুগে অস্ত্রের বিস্তার রোধ মার্কিন কর্মকর্তাদের সামনে এটি এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। স্নায়ুযুদ্ধের সময় এক্ষেত্রে নজর ছিল পারমাণবিক অস্ত্র বা ব্যালিস্টিক মিসাইলের ওপর, যার যন্ত্রাংশ শনাক্ত করা ছিল সহজ। কিন্তু ড্রোনের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। সস্তা এবং ওয়ান-টাইম ব্যবহারের এই ড্রোনগুলো তৈরি হয় সাধারণ সব যন্ত্রাংশ দিয়ে, যা বিশ্ববাণিজ্যের স্রোতে সহজেই শনাক্তকরণ এড়িয়ে অন্য দেশে রপ্তানি হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাবেক কর্মকর্তাদের মতে, এই চ্যালেঞ্জকে আরও জটিল করে তুলছে চীন। যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী দেশটি দীর্ঘদিন ধরে এমন এক মধ্যবর্তী কেন্দ্র হিসেবে কাজ করেছে, যেখানে মার্কিন ও ইউরোপীয় তৈরি যন্ত্রাংশ আসার পর সেগুলো ইরান ও রাশিয়ার ড্রোন কারখানায় পাঠানো হতো। এখন ক্রমেই দেখা যাচ্ছে, এসব যন্ত্রাংশ সরাসরি চীনের ভেতরেই উৎপাদিত হচ্ছে, প্রায়শই ছোট ছোট কারখানায়, যারা পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞাকে খুব একটা তোয়াক্কা করে না।
ভিক্টরি টেকনোলজির সেই বিপণন প্রস্তাব সম্বলিত ইমেইলটি ঘটনাক্রমে গিয়ে পৌঁছায় 'ইরান ওয়াচ'-এর ইনবক্সে। সংস্থাটি মূলত 'উইসকনসিন প্রজেক্ট অন নিউক্লিয়ার আর্মস কন্ট্রোল'-এর একটি অংশ, যারা ইরানের অস্ত্র বিস্তার নেটওয়ার্কের ওপর নিবিড় নজর রাখে। পরবর্তীতে গোষ্ঠীটি এই চাঞ্চল্যকর তথ্য 'দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল'-এর কাছে হস্তান্তর করে।
উইসকনসিন প্রজেক্টের গবেষক জন কেভস এই তৎপরতা সম্পর্কে বলেন, "তারা অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে এবং বেশ নির্লজ্জের মতোই ইরানে লিমবাখ এল৫৫০ ইঞ্জিন বিক্রির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।"
ইমেইল প্রেরণকারী নিজেকে ক্রিস্টফ চেন হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। তিনি দাবি করেন যে, তার কোম্পানি চলতি বছরের শুরু থেকে ইঞ্জিন বিক্রি শুরু করেছে এবং এপর্যন্ত ইরান বা রাশিয়ায় কোনো পণ্য রপ্তানি করেনি। তবে কেন তিনি 'ইরান ওয়াচ'-এর মতো একটি সংস্থাকে এই ইমেইল পাঠালেন, সে বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
নিষেধাজ্ঞার জাল ও চীনের ভূমিকা
শাহেদ ড্রোন বর্তমানে আমেরিকার অন্যতম প্রধান উদ্বেগের কারণ। এটি ১,০০০ মাইল পর্যন্ত উড়তে পারে এবং একটি ক্রুজ মিসাইলের তুলনায় এটি তৈরি করা অনেক সস্তা, যাতে খরচ হয় মাত্র ২০ থেকে ৫০ হাজার ডলার। ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যে উদ্ধারকৃত শাহেদ ড্রোনের ব্যবচ্ছেদ করে দেখা গেছে, এগুলোর শুরুর দিকের সংস্করণে আমেরিকা ও ইউরোপের তৈরি মাইক্রোইলেকট্রনিক্স ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ ছিল।
মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের তদন্তে দেখা গেছে, এই যন্ত্রাংশগুলো অনুমোদিত ডিস্ট্রিবিউটরদের মাধ্যমে চীন বা হংকংয়ের রিটেইলারদের কাছে যেত, যারা পরে তা ইরান বা রাশিয়ায় পাঠিয়ে দিত। অর্থ লেনদেনের জন্য হংকংয়ে সহজে খোলা যায় এমন সব শেল কোম্পানি ব্যবহার করা হতো। সাবেক ট্রেজারি কর্মকর্তা মিয়াদ মালেকি বলেন, "চীন এই প্রবাহের ব্যাপারে চোখ বুঁজে ছিল। তারা হয় এর পরোয়া করে না, নয়তো এতে হস্তক্ষেপ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।"
অন্যদিকে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা ও নিজস্ব আইন মেনেই দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য পণ্যের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।
রাশিয়া ও ইরানের সরাসরি চীন নির্ভরতা
সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়া ও ইরান সরাসরি চীন থেকে যন্ত্রাংশ সংগ্রহ বাড়িয়েছে। কনফ্লিক্ট আর্মামেন্ট রিসার্চ জানিয়েছে, শাহেদ স্টাইলের ড্রোনে চীনা প্রস্তুতকারকদের তৈরি উপাদানের ব্যবহার লক্ষণীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
২০২৪ সালের শেষের দিকে চীনের কাস্টমস তথ্যে ফাইবার-অপটিক কেবল রপ্তানির এক বিশাল উল্লম্ফন দেখা যায়। ইউক্রেনের সিগন্যাল জ্যামিং এড়াতে যখন রাশিয়া কেবল-চালিত ড্রোন ব্যবহার শুরু করে, তখনই এই রপ্তানি বৃদ্ধি পায়। একই চিত্র দেখা গেছে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির ক্ষেত্রেও। আটলান্টিক কাউন্সিলের জোসেফ ওয়েবস্টার বলেন, "সামরিক উদ্দেশ্য ছাড়া এর আর কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা হতে পারে না। এটি অত্যন্ত স্পষ্ট।"
ছোট কোম্পানির বিশাল বাজার
এই বাণিজ্যের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে চীনের ছোট ছোট কিছু কোম্পানি। তারা যুদ্ধের চাহিদা পুঁজি করে মুনাফা লুটছে। এই কোম্পানিগুলো ডলারে লেনদেন করে না, ফলে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ভয় তাদের নেই। ভিক্টরি টেকনোলজির ওয়েবসাইটটি ইংরেজি, জার্মান এবং রুশ ভাষায় পাওয়া গেলেও চীনা ভাষায় নেই—যা তাদের মূল লক্ষ্য যে রপ্তানি বাজার– সে সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দেয়।
শিয়ামেন লিমবাখ নামক আরেকটি স্থানীয় কোম্পানিকে ২০২৪ সালেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল। তাদের মূল কোম্পানিটিই জার্মানির সেই প্রতিষ্ঠানের মালিক যারা এই এল৫৫০ ইঞ্জিনের মূল নকশা তৈরি করেছিল।
মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, তারা এই বাণিজ্য পুরোপুরি বন্ধ করতে পারবেন না, তবে তাদের লক্ষ্য হলো ইরান ও রাশিয়ার জন্য খরচ যতটা সম্ভব বাড়িয়ে দেওয়া। নিম্ন মানের চীনা যন্ত্রাংশের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হওয়ায় অনেক রুশ ড্রোন মাঝপথেই বিধ্বস্ত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের অফিস অব ফরেন অ্যাসেটস কন্ট্রোল (ওএফএসি)- এর সাবেক কর্মকর্তা কেরি বিটশফ বলেন, "আপনাকে খরচের বিশ্লেষণ করতে হবে। আপনি কি ১০০টি ড্রোন চাইবেন যা দুই ঘণ্টা উড়তে পারে, নাকি ৫০টি ড্রোন যা ২০ ঘণ্টা উড়তে পারে?"
বর্তমানে ড্রোন ও আধুনিক সমরকৌশলের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে যে, একটি অত্যন্ত নিখুঁত ও দামী সমরাস্ত্রের চেয়ে অনেকগুলো সস্তা ও মাঝারি মানের অস্ত্র ব্যবহার করা বেশি কার্যকর হয়ে উঠছে। বিশেষজ্ঞরা বিষয়টিকে এভাবে বিশ্লেষণ করছেন:
#সংখ্যার সক্ষমতা: প্রযুক্তিতে সেরা একটি ড্রোন যদি ১০টি সস্তা চীনা ড্রোনের আক্রমণের শিকার হয়, তবে সংখ্যাগত আধিক্যের কারণে দামী ড্রোনটির টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে।
#ব্যয়-সাশ্রয়ী সমরনীতি: শত্রুপক্ষের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করতে শত শত সস্তা ড্রোন ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে রক্ষণাত্মক ব্যবস্থার খরচ বেড়ে যায় এবং এক পর্যায়ে তা অকেজো হয়ে পড়ে।
#স্থায়িত্ব বনাম কার্যকারিতা: অনেক ক্ষেত্রে ২০ ঘণ্টা উড়তে সক্ষম ৫০টি উচ্চমানের ড্রোনের চেয়ে ২ ঘণ্টা উড়তে পারে এমন ১০০টি ড্রোনের চাহিদা বেশি। কারণ, আধুনিক যুদ্ধে লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করাই মূল কথা, যন্ত্রটি কতক্ষণ টিকল তা গৌণ।
আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বীরা—বিশেষ করে ইরান ও রাশিয়া—এখন গুণগত শ্রেষ্ঠত্বের পেছনে না ছুটে স্বল্পমূল্যে বিপুল পরিমাণ সমরাস্ত্র তৈরির কৌশল গ্রহণ করেছে। এই 'কোয়ান্টিটি ওভার কোয়ালিটি' কৌশলটিই বর্তমানে বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞার জাল ছিঁড়ে তাদের যুদ্ধ সক্ষমতা টিকিয়ে রাখছে।
