যুদ্ধ শুরু করে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র আছে ‘বহাল তবিয়তে’, চরম ভোগান্তিতে সারা বিশ্ব
ইরানে আমেরিকার শুরু করা যুদ্ধের বয়স মাত্র দুই মাস। কিন্তু তার জেরেই এখন ধুঁকছে ভারত ও বাংলাদেশের টেক্সটাইল কারখানাগুলো। আয়ারল্যান্ড, পোল্যান্ড ও জার্মানির আকাশে বিমান চলাচল বিপর্যস্ত। ভিয়েতনাম, দক্ষিণ কোরিয়া ও থাইল্যান্ডে শুরু হয়েছে জ্বালানি রেশনিং। আর বিশ্বজুড়ে এই চরম আর্থিক বিশৃঙ্খলার মধ্যেও যে দেশটি কার্যত অক্ষত রয়েছে, সেটি হলো খোদ আমেরিকা—যারা এই যুদ্ধ শুরু করেছে।
এশিয়া ও ইউরোপের একাধিক দেশে যখন মন্দার মেঘ ঘনাচ্ছে, তখন উল্টো ছবি আমেরিকায়। বিশ্বের অধিকাংশ উন্নত অর্থনীতিকে সম্ভবত অবলীলায় টেক্কা দেবে তারা। আর্থিক প্রবৃদ্ধি স্থিতিশীল, বেকারত্বের হারও কম। রয়্যাল ব্যাঙ্ক অভ কানাডার গত সপ্তাহের পর্যবেক্ষণ, 'যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির বিরুদ্ধে বাজি ধরা এখনও কঠিন।'
২ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যের সার্বভৌম সম্পদ তহবিলের মালিক সংযুক্ত আরব আমিরাত। বিশ্বের অন্যতম ধনী এই রাষ্ট্রও এখন আমেরিকার কাছে আর্থিক লাইফলাইন চেয়েছে। মিসাইলের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত গ্যাসক্ষেত্র ও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কার্যত দিশেহারা দেশটি।
মাত্র আট সপ্তাহে—একটি সাধারণ ফ্রুটকেক তৈরি হতে যেটুকু সময় লাগে—বিশ্ব অর্থনীতির চালচিত্র আমূল ওলটপালট হয়ে গেছে।
তবে যুদ্ধের সবচেয়ে বড় মাশুল দিতে হবে দরিদ্র দেশগুলোকে। জ্বালানির চড়া দাম মেটানোর সামর্থ্য এওব দেশের ভোক্তাদের নেই। আবার সেই ভার লাঘব করার ক্ষমতা নেই সরকারগুলোরও। বিশ্ববাজারে ঋণের সংস্থান কমে আসায় এই দেশগুলোর পক্ষে জরুরি প্রয়োজনে ধার নেওয়াও এখন অত্যন্ত ব্যয়সাপেক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জ্বালানি ও সারের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে বছরের শেষে খাদ্যপণ্যের দাম আরও বাড়বে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) গত সপ্তাহে বলেছে, আফ্রিকায় বড়সড় খাদ্যসংকট ঘনিয়ে আসছে। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) মতে, এই যুদ্ধের প্রভাবে এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের কবলে পড়তে পারে।
রিজার্ভ ব্যাংক অভ ইন্ডিয়ার সাবেক গভর্নর ও শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ রঘুরাম রাজন বলেন, এশিয়ার অনেক দেশ ইতিমধ্যেই জ্বালানি সংকটে জর্জরিত। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে।
আইএমএফের সাবেক এই শীর্ষক কর্মর্তা বলেন, জ্বালানির এই ঘাটতি ক্রমশ বাড়বে। অনেক দেশে সংকটের আসল রূপ সবে প্রকাশ পেতে শুরু করেছে।
তিনি আরও বলেন, জ্বালানির মজুত ফুরিয়ে আসছে, সরবরাহও ব্যাহত। এবার বড় বড় শিল্প কলকারখানা বন্ধ হওয়া শুধু সময়ের অপেক্ষা।
জ্বালানির চড়া দাম এবং চাহিদাও কমতে পারে—এই আশঙ্কায় ভারতের ইস্পাত কারখানা ও জাপানের গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। চীনের খেলনা কারখানাগুলো আগে থেকেই আমেরিকার শুল্কের চাপে ভুগছিল; এখন কাজ হারানো হাজার হাজার শ্রমিকের ক্ষোভ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
গত সপ্তাহের এক সকালে উত্তর ভারতের ফিরোজাবাদ শহরের এক খোলা শ্রমবাজারে দেখা যায় বেকার শ্রমিকদের জটলা। মোহাম্মদ ওয়াসিম নামে এক প্লাস্টার মিস্ত্রি বলেন, 'যুদ্ধের জন্য কাজ কমে গেছে।' একজন নিয়োগকর্তা একটি নির্মাণকাজের জন্য তাকে ৫০০ রুপি দিতে চাইছিলেন, যা তার স্বাভাবিক রোজগারের তুলনায় অনেক কম।
ইট ও সিমেন্ট বয়ে ট্রাকে তোলার কাজ করেন পঁচিশ বছর বয়সি আস মোহাম্মদ। বাড়ি থেকে পাঁচ মাইল পথ হেঁটে বাজারে এসেছিলেন তিনি। পরিবারের স্বার্থে ৫০০ রুপিতেই কাজ করতে রাজি ছিলেন আস, কিন্তু বর্তমান বাজারে ওই সামান্য টাকায় বিশেষ সুরাহা হবে না। কারণ, যে রান্নার গ্যাসের দাম সাধারণত ৮০ রুপি থাকে, এখন তা ২০০ রুপি ছাড়িয়েছে।
একই সংকটে পড়েছেন আরব আমিরাত ও সৌদি আরবে কর্মরত লাখ লাখ ভারতীয় শ্রমিক। প্রতি বছর তারা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স দেশে পাঠান। যুদ্ধের জেরে তারা এখন কর্মহীন অবস্থায় বিদেশের মাটিতেই আটকে রয়েছেন।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় হিলিয়াম, অ্যালুমিনিয়াম ও ন্যাপথা-র মতো খনিজ পদার্থের সংকট দেখা দিয়েছে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে কনডম থেকে মাইক্রোচিপ—হরেক পণ্যের জোগানে।
আমেরিকা অবশ্য এই ধাক্কা থেকে পুরোপুরি সুরক্ষিত নয়। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে সেদেশেও গ্যাসের দাম গ্যালনে ১ ডলারের বেশি বেড়েছে। এই চড়া দামের করভার সাধারণ মার্কিন ক্রেতা, বিশেষ করে নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোর ওপরে চাপ সৃষ্টি করেছে। ওয়াল স্ট্রিটের ব্যাংকগুলো ইতিমধ্যেই আর্থিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা বাড়িয়েছে।
তবে বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় আমেরিকার অভ্যন্তরীণ বাজারে যুদ্ধের আঁচ এখনও অনেক কম। দেশটিতে ভোক্তা ব্যয় শক্তিশালী আছে, চাকরিতে ছাঁটাই কম এবং চলতি বছরে আর্থিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসও জোরালো।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, তেলের দাম যদি ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলার ছাড়িয়ে যায়, তবেই আমেরিকার মন্দা নিয়ে উদ্বেগের কারণ থাকবে।
কিন্তু বিশ্বের বাকি অংশে পরিস্থিতি বেশ উদ্বেগজনক। আর্থিক প্রবৃদ্ধির শ্লথ গতি ও লাগামহীন মূল্যস্ফীতি—এই দ্বিমুখী চাপে স্ট্যাগফ্লেশনের (ধীর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, চড়া মূল্যস্ফীতি ও বেকারত্ব) শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিশ্বজুড়ে পণ্যসংকট ও আকাশছোঁয়া দামে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কমেছে। চড়া দামের কারণে জ্বালানির চাহিদা কমছে। আর চাহিদা না থাকলে উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও খরচ—সব ক্ষেত্রেই টান পড়তে বাধ্য।
জার্মান এয়ারলাইন লুফথানসা ইতিমধ্যেই আগামী গ্রীষ্মের প্রায় ২০ হাজার ফ্লাইট বাতিল করেছে। জাহাজ চলাচল-সংক্রান্ত ডিজিটাল মার্কেটপ্লেস ফ্রেটোস-এর তথ্যমতে, জেট ফুয়েলেত দাম দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বের প্রথম সারির ২০টি এয়ারলাইনই ফ্লাইটসংখ্যা কমিয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে পর্যটন ও ব্যবসায়িক ভ্রমণের ওপর। এতে হোটেল, রেস্তোরাঁ ও রিটেইল মার্কেটে মানুষের খরচ কমেছে।
আমেরিকার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, বিশ্বের অন্যান্য সমগোত্রীয় দেশের তুলনায় তারা নিজেদের চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি তেল ও গ্যাস উৎপাদন করে। এর ফলে বিশ্ববাজারের অস্থিরতা তাদের পুরোপুরি স্পর্শ করতে পারেনি।
এছাড়া আমেরিকার অর্থনীতি মূলত সেবা খাত-নির্ভর। তেলের দাম বাড়লে জ্বালানিঘন উৎপাদন শিল্প যেভাবে ধাক্কা খায়, আমেরিকার ওপর তার প্রভাব পড়ে অনেক পরে। যুদ্ধের আগেও তাদের অর্থনীতি যথেষ্ট মজবুত ছিল, যা যেকোনো মন্দা মোকাবিলায় ঢাল হিসেবে কাজ করছে।
কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার অন গ্লোবাল এনার্জি পলিসি-র প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক জেসন বরডফ বলেন, 'বাকি বিশ্ব যে যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, আমেরিকা এখনও তা টের পাচ্ছে না।' তিনি বলেন, বিশ্ব অর্থনীতির এই টালমাটাল অবস্থায় এশিয়ায় যে সরবরাহ ঘাটতি দেখা দিয়েছে, তা ইউরোপ হয়ে আমেরিকায় পৌঁছাবে সবার শেষে।
তবে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে এই আছ থেকে বাঁচবে না ওয়াশিংটনও। জ্বালানির দাম বাড়লে পণ্য পরিবহন ব্য্য বাড়বে, যার জেরে অন্যান্য নিত্যপণ্যের দামও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে।
বাইডেন প্রশাসনের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ বেন হ্যারিস বলেন, 'এই ধাক্কা কতদিন স্থায়ী হবে, তা আমরা জানি না। পরিস্থিতি এমন চলতে থাকলে আগামী ছয় মাস পর আলোচনার মোড় সম্পূর্ণ ঘুরে যেতে পারে।'
এমনকি আগামীকালই যদি যুদ্ধ থেমে যায়, তবু হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল আগের মতো স্বাভাবিক হওয়া নিয়ে সন্দিহান অধিকাংশ জ্বালানি কোম্পানির শীর্ষ নির্বাহী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটি যে কত সহজে বন্ধ করে দেওয়া সম্ভব, তা এই যুদ্ধ দেখিয়ে দিয়েছে। ফলে আগামী দিনে ঝুঁকি ও বিমা খরচ—দুই-ই বাড়বে। এছাড়া মিসাইলের আঘাতে অবকাঠামোর যে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার জেরে আগামী চার বছর তেলের দাম চড়া থাকবে বলে মনে করছে হাই ফ্রিকোয়েন্সি ইকোনমিকস নামক সংস্থা।
পিটাসান ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক্স-এর প্রেসিডেন্ট অ্যাডাম পোজেনের মতে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের খামখেয়ালি বাণিজ্য নীতি ও গ্রিনল্যান্ড দখলের মতো অদ্ভুত সব দাবির কারণে ইতিমধ্যে মিত্র দেশগুলোও আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছিল।
পোজেন বলেন, এবার ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করে ট্রাম্প আমেরিকার বিশ্বজোড়া আধিপত্যকেই সংকটে দিয়েছেন। 'সাময়িকভাবে আমেরিকা হয়তো কম সমস্যায় রয়েছে, কিন্তু এই স্বস্তি খুব বেশিদিন স্থায়ী হবে না।'
