যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তি আলোচনা: পাকিস্তান পৌঁছেছে ইরানের প্রতিনিধিদল
যুদ্ধবিরতি নিয়ে মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনার জন্য ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মুহাম্মদ বাকের গালিবাফের নেতৃত্বে শনিবার ভোরে একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদল ইসলামাবাদে পৌঁছেছে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দু-সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির পর এই বৈঠক হতে চলেছে।
পাক পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিও ওই প্রতিনিধিদলে রয়েছেন। ইসলামাবাদের বৈঠকে তার অংশ নেওয়ার কথা আছে।
এদিন ইরানি প্রতিনিধিদলকে স্বাগত জানান পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার। এছাড়াও বিমানবন্দরে উপস্থিত ছিলেন পাকিস্তানের ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির স্পিকার সর্দার আয়াজ সাদিক, চিফ অভ আর্মি স্টাফ ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি।
প্রতিনিধিদলকে স্বাগত জানিয়ে ইসহাক দার ইতিবাচক আলোচনার আশা প্রকাশ করেন। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে পাকিস্তান যে সব উপায়ে সাহায্য করতে প্রস্তুত, তা-ও বলেন তিনি।
এর আগে পাক প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ বলেন, স্থায়ী যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে পৌঁছনোর জন্য এই বৈঠক একরকম 'চূড়ান্ত সুযোগ'। আজ থেকেই ইসলামাবাদে দু-পক্ষের শীর্ষ নেতৃত্বের আলোচনা শুরু হওয়ার কথা।
ছয় সপ্তাহের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দু-সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেন। ফলে ইরানের উপর আমেরিকা ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা আপাতত বন্ধ রয়েছে। তার পরেই এই আলোচনা শুরু হতে চলেছে।
যদিও দু-পক্ষের মধ্যে এখনও গভীর মতভেদ রয়েছে। যুদ্ধবিরতির শর্ত পুরোপুরি না মানার জন্য একে অপরকে দুষছে আমেরিকা ও ইরান। এর মধ্যেই হরমুজ প্রণালি নিয়ে টানাপড়েন অব্যাহত আছে। পাশাপাশি লেবাননে ইসরায়েল ও ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিসবুল্লার মধ্যে সংঘাত চলছে।
বৈঠকের আগে গালিবাফ হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, আমেরিকাকে তাদের পুরনো প্রতিশ্রুতিগুলো আগে পালন করতে হবে। বাজেয়াপ্ত করা ইরানি সম্পত্তি ফিরিয়ে দেওয়া ও লেবাননে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার দাবি জানান তিনি। এই শর্তগুলো মানা না-হলে আলোচনা এগোবে না বলেও স্পষ্ট করে দিয়েছেন গালিবাফ।
আলোচনার আগে আমেরিকার ওপর নিজেদের আস্থার অভাবের কথাও বলেছেন ইরানের স্পিকার। বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে আমেরিকার অতীতের 'বিশ্বাসঘাতকতা'র কথা মনে করিয়ে দেন তিনি।
গালিবাফ বলেন, 'এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে দুবার আলোচনার মাঝপথে আমাদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে। ইরানের তরফে সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তারা হামলা চালিয়ে যুদ্ধাপরাধ ঘটিয়েছে।'
ইরানের স্পিকার আরও বলেন, 'আমাদের সদিচ্ছা রয়েছে। কিন্তু আমেরিকার ওপর কোনো আস্থা নেই।'
তিনি বলেন, আমেরিকা যদি প্রকৃত অর্থেই চুক্তি করতে চায় এবং ইরানি নাগরিকদের অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়, তবে ইরানের তরফেও ইতিবাচক পদক্ষেপ দেখা যাবে।
কিন্তু ওয়াশিংটন যদি এই আলোচনাকে নিছকই লোকদেখানো বা প্রতারণার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করে, তবে তেহরান তা মানবে না বলে মন্তব্য করেন গালিবাফ।
অন্যদিকে মার্কিন প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে রয়েছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। এই বৈঠক থেকে ইতিবাচক সমাধান আসবে বলে আশা প্রকাশ করলেও, কড়া বার্তাও দিয়েছেন তিনি। ভ্যান্সের হুঁশিয়ারি, আলোচনার নামে ইরান যদি আমেরিকার সঙ্গে 'চালাকির' চেষ্টা করে, তবে তার কড়া জবাব দেওয়া হবে।
যুদ্ধবিরতি ঘোষণা হলেও ব্যাংকিং ও জ্বালানি ক্ষেত্রে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে বিদেশে আটকে থাকা কয়েক হাজার কোটি ডলারের সম্পত্তিতে এখনও হাত দিতে পারছে না তেহরান। স্বভাবতই ইসলামাবাদের এই বৈঠক থেকে ওই বিপুল পরিমাণ টাকা উদ্ধারের চেষ্টা চালাবে ইরান।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পরেই মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাতের সূত্রপাত হয়। ওই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনি নিহত হন। নিশানা করা হয় ইরানের সামরিক ও পরমাণু কেন্দ্রগুলোকেও। গত পাঁচ সপ্তাহের ওই টানা সংঘাতে প্রাণ হারিয়েছেন ২ হাজারেরও বেশি মানুষ।
পাল্টা জবাব দেয় তেহরানও। গোটা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ নিতে শুরু করে তারা। হরমুজ় প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কার্যত অবরুদ্ধ করে দেওয়া হয়। একইসঙ্গে ইসরায়েলি ভূখণ্ড ও উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতেও ধারাবাহিক হামলা চালায় ইরান।
অবশেষে ৮ এপ্রিল ওয়াশিংটন ও তেহরানের সম্মুখসমরে রাশ টানা যায়। ওই দিনই দু-সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির কথা ঘোষণা করেন পাক প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ।
শান্তি আলোচনার জন্য ওয়াশিংটনের তরফে ১৫ দফার একটি রূপরেখা প্রস্তাব করা হয়েছে। যেখানে মূলত ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং হরমুজ় প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়গুলিতে জোর দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, শান্তি আলোচনার জন্য পাল্টা ১০ দফার একটি প্রস্তাব দিয়েছে তেহরানও। তাতে হরমুজের ওপর অধিকতর নিয়ন্ত্রণ, ট্রানজিট টোল চালু করা, মার্কিন আঞ্চলিক সামরিক অভিযান পুরোপুরি বন্ধ করা এবং সব ধরনের আর্থিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার দাবি জানিয়েছে তারা।
