যুদ্ধ শেষ হলে ইরান পুনর্নির্মাণের কাজ পেতে পারে যেসব প্রতিষ্ঠান
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলায় যখন ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন ছোঁড়া অবশেষে থামবে, তখন এক নতুন প্রতিযোগিতা শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সেটা হলো, ক্ষতিগ্রস্ত তেল ও গ্যাস অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ এবং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে নৌপথ ও প্রভাব পুনরুদ্ধারের চুক্তি পাওয়ার লড়াই।
এই ধ্বংসযজ্ঞ কেবল ইরানে সীমাবদ্ধ নয়। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) প্রধান ফাতিহ বিরল সোমবার সতর্ক করে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের নয়টি দেশজুড়ে অন্তত ৪০টি জ্বালানি সম্পদ 'মারাত্মক বা অত্যন্ত মারাত্মকভাবে' ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তেল ও গ্যাস ক্ষেত্র, শোধনাগার (রিফাইনারি) এবং পাইপলাইন—সবকিছু মেরামত করতে দীর্ঘ সময় লাগবে। তিনি এই সংকটকে ১৯৭০-এর দশকের দুটি তেল সংকট এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের যৌথ প্রভাবের চেয়েও ভয়াবহ বলে বর্ণনা করেছেন।
বিধ্বস্ত পাইপলাইন পুনর্নির্মাণের অপেক্ষায় থাকা প্রকৌশলী বিশেষজ্ঞ থেকে শুরু করে বোমায় বিধ্বস্ত বন্দর ও টার্মিনাল মেরামতে সক্ষম লজিস্টিক সংস্থা—একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী যুদ্ধের শেষকে একটি লাভজনক ব্যবসার শুরু হিসেবে দেখছে।
যুদ্ধ শেষ হলে এবং পুনর্গঠন কার্যক্রম শুরু হলে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যে বিপুলসংখ্যক জ্বালানি ও বন্দর পুনর্নির্মাণ প্রকল্প আসতে পারে, সেগুলোর জন্য কোন খাত ও কোন প্রতিষ্ঠান প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারে—এখানে তার একটি ধারণা দেওয়া হয়েছে।
ইঞ্জিনিয়ারিং কনগ্লোমারেট
যুদ্ধ থামার পর ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়ন এবং পুনর্নির্মাণ পরিকল্পনা তৈরিতে সাহায্য করার জন্য বহুজাতিক প্রকৌশলী জায়ান্টদের প্রথম ডাক পড়বে।
তেল রিগ, শোধনাগার, পাইপলাইন এবং প্রাকৃতিক গ্যাস তরলীকরণ প্ল্যান্ট মেরামত ও নির্মাণে অভিজ্ঞ সংস্থাগুলো ইরানের অর্থনীতি এবং রাজস্ব প্রবাহ পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
চূড়ান্ত বিজয়ী নির্ধারণে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা বড় ভূমিকা রাখবে, কারণ ইরান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উভয় সরকারই চুক্তিগুলো কীভাবে বণ্টন করা হবে সে বিষয়ে কঠোর অবস্থান নেবে। তবুও, কয়েক সপ্তাহের লাগাতার বোমা হামলার পর সেখানে সবার জন্যই প্রচুর কাজ থাকবে।
তেল ও গ্যাস প্রকৌশল সেবায় নিয়োজিত প্রধান মার্কিন সংস্থাগুলোর মধ্যে রয়েছে এসএলবি (সাবেক শ্ল্যামবার্জার), হ্যালিবার্টন, বেকার হিউজেস এবং ওয়েদারফোর্ড। পাশাপাশি ব্যক্তিগত মালিকানাধীন বেকটেল কর্পোরেশনও এই তালিকায় রয়েছে।
অন্যদিকে ইরানের পক্ষে, ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) নিয়ন্ত্রিত 'খাতাম-আল আম্বিয়া' কনস্ট্রাকশন ফার্ম এবং তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতের বৃহত্তম ঠিকাদার 'মাপনা গ্রুপ' শক্তিশালী দেশীয় প্রার্থী। মঙ্গলবার একটি অস্থির সেশনের পরে ওয়াল স্ট্রিটের প্রধান স্টক ইনডেক্সগুলো নিম্নমুখী হয়ে শেষ হয়েছে।
ইতালির সাইপেম, ফ্রান্সের টেকনিপ, ভারতের লারসেন অ্যান্ড টুব্রো এবং দুবাই ভিত্তিক সিদারা-র মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মধ্যপ্রাচ্যে ব্যাপক কার্যক্রম রয়েছে। তাই কাজ দ্রুত শুরু করার জন্য প্রয়োজনীয় যোগাযোগ ও অভিজ্ঞতা তাদের রয়েছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সিএনপিসি, সংযুক্ত আরব আমিরাত ভিত্তিক এনএমডিসি এবং ব্রিটেনের পেট্রোফ্যাকও এই অঞ্চলে সক্রিয় এবং তারা দরপত্রে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তেল ও গ্যাস জায়ান্ট
একবার পাইপলাইনগুলো জোড়া লাগানো এবং জ্বালানি অবকাঠামো মেরামত করা হলে, বিশ্বের তেল ও গ্যাস উৎপাদকরা কূয়া থেকে উত্তোলন শুরু করতে এবং রিফাইনারি ও এলএনজি প্ল্যান্টগুলোকে পূর্ণ কার্যক্ষমতায় ফিরিয়ে আনতে এগিয়ে আসবে।
অঞ্চলের জাতীয় জ্বালানি সংস্থাগুলো প্রধান ভূমিকা পালন করবে, যার মধ্যে রয়েছে ন্যাশনাল ইরানিয়ান অয়েল কোম্পানি, কাতার এনার্জি, সৌদি আরামকো এবং আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি। মার্কিন শীর্ষ তেল উৎপাদক এক্সন মবিল, ফ্রান্সের টোটাল এনার্জি এবং ব্রিটেনের শেল-এর মতো আন্তর্জাতিক জায়ান্টগুলোরও মধ্যপ্রাচ্যে বিস্তৃত কার্যক্রম রয়েছে এবং তারা তাদের অবস্থান রক্ষা করতে চাইবে।
ধ্বংসযজ্ঞের মাত্রা সুযোগের বিশালতা সম্পর্কে ধারণা দেয়। ইসরায়েলি হামলায় ইরানের সাউথ পার্স গ্যাস ফিল্ডের চারটি ইউনিট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, অন্যদিকে কাতারের রাস লাফান শিল্পনগরীতে ইরানের হামলায় এলএনজি স্থাপনার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে যা পুনরুদ্ধার করতে কয়েক বছর সময় এবং দশ বিলিয়ন ডলার খরচ হবে।
শিপিং এবং ইউটিলিটি
ক্ষয়ক্ষতি কেবল তেলের কূপেই সীমাবদ্ধ নেই। অঞ্চলের বন্দর, বিদ্যুৎ গ্রিড এবং পানি সরবরাহ ব্যবস্থা—সবই আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে।
ইরানি জলসীমার আশেপাশে বড় বন্দরগুলো এবং অসংখ্য নৌ ও বাণিজ্যিক জাহাজ সাম্প্রতিক বোমা হামলায় মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হরমুজ প্রণালী—ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী একটি সরু পথ যেখান দিয়ে বিশ্বের অপরিশোধিত তেল ও এলএনজির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়—তা কার্যকরভাবে বন্ধ হয়ে গেছে।
বিশ্বব্যাপী স্বাভাবিক জ্বালানি প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে এটি পুনরায় চালু করা হবে প্রধান শর্ত। বন্দর সুবিধা পুনরুদ্ধার এবং শিপিং চ্যানেলগুলো পরিষ্কার করার জন্য বন্দর পুনর্নির্মাণ এবং সামুদ্রিক উদ্ধারকার্যে বিশেষজ্ঞদের প্রয়োজন হবে, যা কয়েক বছর ধরে চলতে পারে।
বিদ্যুৎ খাতে, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তাভানির এবং মাপনা গ্রুপ ইরানের বেশিরভাগ বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সঞ্চালন নেটওয়ার্ক পরিচালনা করে এবং তারাই অভ্যন্তরীণ পুনরুদ্ধারের কাজ এগিয়ে নেবে।
রাশিয়ার রোসাটম যারা সাম্প্রতিক স্ট্রাইক জোনের কাছে ইরানের বুশেহর পারমাণবিক চুল্লি পরিচালনা করে, তাদের জন্য চ্যালেঞ্জটি আরও জটিল। কারণ ইউএস-সমর্থিত কোনো পুনর্নির্মাণ প্রচেষ্টায় ক্রেমলিনের ভূমিকা বিতর্কিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ইরান ও বাহরাইনে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহকারী ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্ট এবং ইসরায়েলি বিদ্যুৎ গ্রিডের কিছু অংশও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা পুনর্নির্মাণের পরিধিকে ইরানের সীমানার বাইরে নিয়ে গেছে।
এমনকি যদি আজই লড়াই বন্ধ হয়ে যায়, তবুও কয়েক বছরের পুনর্নির্মাণ কাজ সামনে পড়ে থাকবে—আর যখন এটি শুরু হবে, কিছু কোম্পানি আক্ষরিক অর্থেই বিশাল বাণিজ্যের সুযোগ পাবে।
