যেভাবে ইরানের আইআরজিসি যুদ্ধের জন্য লেবাননের হিজবুল্লাহকে পুনর্গঠিত করেছে
২০২৪ সালে ইসরায়েলি হামলায় বড় ধরনের বিপর্যয়ের পর লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর সামরিক কমান্ডকে নতুন করে পুনর্গঠন করেছে ইরানের ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ডস কোর (আইআরজিসি)। ইরানি কর্মকর্তাদের সরাসরি তত্ত্বাবধানে হিজবুল্লাহর সাংগঠনিক দুর্বলতাগুলো পূরণ করে দলটিকে বর্তমানে তেহরানের সমর্থনে চলমান যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। আইআরজিসির এই কার্যক্রম সম্পর্কে অবগত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুটি বিশ্বস্ত সূত্রের বরাতে এ তথ্য জানা গেছে।
১৯৮২ সালে আইআরজিসি কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর হিজবুল্লাহর ভেতরে এটিই প্রথম এ ধরনের বড় কোনো সংস্কার। ২০২৪ সালের যুদ্ধে গোষ্ঠীটির প্রধান হাসান নাসরাল্লাহসহ শীর্ষ নেতাদের নিহতের পর ইরান এখন সরাসরি হিজবুল্লাহর পরিচালনার দায়িত্ব হাতে নিয়েছে।
রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হিজবুল্লাহ মার্কিন-ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের এই যুদ্ধকে অনিবার্য মনে করে গত কয়েক মাস ধরে প্রস্তুতি নিচ্ছিল। আইআরজিসি কেবল প্রশিক্ষণই দেয়নি, বরং হিজবুল্লাহর সামরিক কাঠামোকে এমনভাবে বদলে দিয়েছে যাতে ইসরায়েলি গোয়েন্দারা সহজে কোনো তথ্য না পায়।
কমান্ড কাঠামোয় বড় পরিবর্তন
সূত্রগুলো জানিয়েছে, ২০২৪ সালের নভেম্বরে যুদ্ধবিরতির পরপরই প্রায় ১০০ জন আইআরজিসি কর্মকর্তা লেবাননে এসে কাজ শুরু করেন। তারা হিজবুল্লাহর পুরনো ক্রমভিত্তিক কমান্ড কাঠামো ভেঙে দিয়ে একটি 'বিকেন্দ্রীভূত' ব্যবস্থা চালু করেছেন। নতুন এই কাঠামোতে হিজবুল্লাহর ছোট ছোট ইউনিটগুলো একে অপরের কার্যক্রম সম্পর্কে খুব সামান্যই জানে, যা অপারেশনাল গোপনীয়তা বজায় রাখতে অত্যন্ত কার্যকর।
কিংস কলেজ লন্ডনের নিরাপত্তা বিশ্লেষক আন্দ্রেয়াস ক্রিগ একে 'মোজাইক ডিফেন্স' হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, 'আইআরজিসি হিজবুল্লাহকে একটি ফ্ল্যাট সিস্টেমে পুনর্গঠিত করেছে, যা অনেকটা আশির দশকের হিজবুল্লাহর মতো ছোট ছোট সেলে বিভক্ত।'
যুগ্ম ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ও রণকৌশল
আইআরজিসির পরিকল্পনা অনুযায়ী, গত ১১ মার্চ প্রথমবারের মতো ইরান ও লেবানন থেকে ইসরায়েলে একযোগে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়। লেবাননের একটি নিরাপত্তা সূত্র জানিয়েছে, ইরানি কমান্ডাররা হিজবুল্লাহর সামরিক ক্যাডারদের পুনর্বাসিত করতে সাহায্য করছেন। তবে তারা লক্ষ্যবস্তু নির্বাচনের চেয়ে যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণে বেশি মনোযোগী।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর এক মুখপাত্র গত ১২ মার্চ জানিয়েছেন, গত তিন বছরে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হলেও হিজবুল্লাহ এখনো একটি প্রাসঙ্গিক এবং বিপজ্জনক বাহিনী হিসেবে টিকে আছে। গত ২ মার্চ থেকে আঞ্চলিক যুদ্ধে যোগ দেওয়ার পর হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। এর জবাবে ইসরায়েলি হামলায় লেবাননে এ পর্যন্ত এক হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।
ইরানি কর্মকর্তাদের বহিষ্কার ও হতাহত
আইআরজিসির এই তৎপরতার মধ্যেই লেবানন সরকার এবং যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত সেনাবাহিনী হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। লেবাননের একজন কর্মকর্তার মতে, দেশটিতে বর্তমানে ১০০ থেকে ১৫০ জন ইরানি নাগরিক রয়েছেন যাদের সাথে আইআরজিসির সরাসরি সম্পর্ক আছে। গত মার্চের শুরুতে লেবানন সরকার তাদের দেশ ছাড়ার অনুরোধ জানায় এবং গত ৭ মার্চ প্রায় ১৫০ জন ইরানি একটি ফ্লাইটে করে বৈরুত ত্যাগ করেন।
উল্লেখ্য যে, ২০২৪ সালের যুদ্ধবিরতি থেকে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হওয়ার মধ্যবর্তী সময়ে ইসরায়েলি হামলায় প্রায় ৫০০ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে আইআরজিসির সদস্যরাও রয়েছেন। এমনকি গত ৮ মার্চ বৈরুতের একটি হোটেলে ইসরায়েলি হামলায় আরও বেশ কয়েকজন ইরানি কর্মকর্তা প্রাণ হারান।
হিজবুল্লাহর মিডিয়া অফিস, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় এ বিষয়ে রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেয়নি। তবে নেতানিয়াহু গত জানুয়ারিতেই বলেছিলেন যে, হিজবুল্লাহ ইরানের সহায়তায় তাদের অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ করছে।
হাসান নাসরাল্লাহর মৃত্যু এবং কাসেম সোলেইমানির উত্তরসূরিদের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে হিজবুল্লাহ এখন ইসরায়েলের সম্ভাব্য পূর্ণাঙ্গ স্থল অভিযানের বিরুদ্ধে কতটুকু লড়াই করতে পারবে, তা দেখার অপেক্ষায় রয়েছে সামরিক বিশ্লেষকরা।
