ক্রুসেডের সময়ের বিউফোর্ট দুর্গ এখন ইসরায়েলের দখলে; জড়িয়ে আছে সালাহউদ্দিন আইয়ুবির নাম, ছিল নাইট টেম্পলারদের দখলেও
লেবাননের আরও গভীরে ঢুকে পড়ে ক্রুসেডের সময় নির্মিত দ্বাদশ শতাব্দীর একটি দুর্গ দখল করে নিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী।
ইউনেস্কো স্বীকৃত ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটি 'বিউফোর্ট ক্যাসেল' বা 'কালাত আল-শাকিফ' নামেও পরিচিত। এটি লিতানি গিরিখাতের প্রান্তে একটি উঁচু পাথুরে পাহাড়ের ওপর অবস্থিত, যেখান থেকে দক্ষিণ লেবাননের এক বিশাল এলাকা নজরে আসে।
ঐতিহাসিকভাবে এটি একটি অত্যন্ত কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে পরিচিত, বিশেষ করে ক্রুসেড যুদ্ধের সময় এর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দক্ষিণ লেবাননের ঐতিহাসিক বিউফোর্ট দুর্গ দখল করে নেওয়ার ঘটনাকে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলি অভিযানে এক 'নাটকীয় পরিবর্তন' হিসেবে অভিহিত করেছেন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।
এক ভিডিও বিবৃতিতে নেতানিয়াহু বলেন, 'আজ আমরা ভিন্নভাবে বিউফোর্টে ফিরে এসেছি। আমরা ঐক্যবদ্ধ, সংকল্পবদ্ধ এবং আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে ফিরেছি।'
তিনি আরও বলেন, 'বিউফোর্ট দুর্গ দখল করা আমাদের বর্তমান নীতির একটি নাটকীয় পর্যায় এবং নাটকীয় পরিবর্তন। আমরা ভয়ের বাধা ভেঙে ফেলেছি। এখন উদ্যোগ আমাদের হাতে; আমরা সিরিয়া, গাজা এবং লেবানন—সবগুলো ফ্রন্টেই একযোগে অভিযান পরিচালনা করছি।'
কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত এই দুর্গ থেকে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের বড় একটি অংশের ওপর নজরদারি করা যায়। তাই ইসরায়েলি বাহিনীর এ অর্জনকে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হচ্ছে।
ক্রুসেড কি?
একাদশ শতাব্দীর শেষভাগে ইউরোপজুড়ে ল্যাটিন খ্রিষ্টানদের পরিচালিত ধারাবাহিক সামরিক অভিযানগুলোই ইতিহাসে 'ক্রুসেড' বা 'ধর্মযুদ্ধ' নামে পরিচিত। এই অভিযানগুলোর গন্তব্য ছিল বিভিন্ন অঞ্চল, তবে এর মধ্যে সবথেকে উল্লেখযোগ্য ছিল 'পবিত্র ভূমি' বা ফিলিস্তিন।
ক্রুসেড ছিল মূলত এক ধরণের সশস্ত্র তীর্থযাত্রা, যেখানে যুদ্ধ এবং আধ্যাত্মিক চেতনার এক সংমিশ্রণ ঘটেছিল। তৎকালীন পোপরা এই যুদ্ধের ডাক দিতেন। যারা ধর্মযুদ্ধের শপথ নিয়ে এসব অভিযানে অংশ নিতেন, পোপ তাদের জন্য বিশেষ আধ্যাত্মিক পুরস্কার বা পুণ্যের প্রতিশ্রুতি দিতেন।
সময়ের সাথে সাথে ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের ফলে ক্রুসেডের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যও পরিবর্তিত হয়েছে। ১০৯৫ খ্রিস্টাব্দে ঘোষিত প্রথম ক্রুসেডের প্রধান লক্ষ্য ছিল জেরুজালেমের পবিত্র স্থানগুলোকে সেলজুক তুর্কিদের হাত থেকে 'মুক্ত' করা। উল্লেখ্য, সেলজুক তুর্কিরা ছিল একটি সুন্নি মুসলিম গোষ্ঠী, যারা তৎকালীন সময়ে এশিয়া মাইনর অঞ্চলে ক্ষমতায় ছিল।
ক্রুসেডাররা ওই অঞ্চলের পূর্বদেশীয় খ্রিষ্টানদের সামরিক সহায়তা দিতে চেয়েছিল। তবে অন্য সব সামরিক অভিযানের তুলনায় ক্রুসেডের বিশেষত্ব ছিল এই, একে একটি আধ্যাত্মিকভাবে পুণ্যময় যুদ্ধ হিসেবে দেখা হতো। প্রথম ক্রুসেডের মাধ্যমেই ক্রুসেডার রাষ্ট্রগুলো প্রতিষ্ঠিত হয়, যার প্রাণকেন্দ্রে ছিল 'জেরুজালেম রাজ্য'।
কারা এবং কেন এই দুর্গ নির্মাণ করেছিল?
১১৩৯ খ্রিস্টাব্দে ফ্রাঙ্কদের মাধ্যমে ক্রুসেডার দুর্গ হিসেবে এই স্থানটির যাত্রা শুরু হয়। তৎকালীন প্রাচ্যে বসতি স্থাপনকারী পশ্চিম ইউরোপীয়দের 'ফ্রাঙ্ক' বলা হতো। ফ্রাঙ্করা যখন এই স্থানে পৌঁছায়, কৌশলগত অবস্থানের কারণে এটি সম্ভবত আগে থেকেই কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যবহৃত হচ্ছিল।
সেই সময়ে জেরুজালেমের রাজা ছিলেন ফুল্ক, যিনি একজন ফ্রাঙ্ক ছিলেন। বিউফোর্ট দুর্গের স্থানটি তার দখলে আসার ৪০ বছর আগেই জেরুজালেম রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ১১৩৯ খ্রিস্টাব্দের দিকে তিনি বিউফোর্ট দুর্গ নির্মাণ শুরু করেন।
প্রাচীন ফরাসি ভাষায় 'বিউফোর্ট' শব্দের অর্থ হলো 'সুন্দর দুর্গ'। শেষ পর্যন্ত এটি দুই স্তরের একটি বিশাল দুর্গে পরিণত হয়, যার আকৃতি ছিল অনেকটা ত্রিভুজাকার। ওই আমলের অন্যান্য স্থাপত্যের মতোই সময়ের ব্যবধানে এর বিভিন্ন অংশ যেমন নতুন করে যুক্ত হয়েছে, তেমনি অনেক অংশ ধ্বংসও হয়েছে।
বর্তমানে যা অবশিষ্ট আছে তা মূলত ফ্রাঙ্কদের নির্মাণশৈলী এবং কয়েক শতাব্দী ধরে বিভিন্ন মুসলিম শাসকদের করা বর্ধিত সংস্কার কাজের একটি মিশ্রণ। ল্যাটিন খ্রিষ্টানরা এটিকে সুরক্ষিত দুর্গগুলোর একটি নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে দেখত। তারা আশা করেছিল, এই দুর্গটি ওই অঞ্চলে ফ্রাঙ্কদের বসতি স্থাপনে শক্তিশালী ভূমিকা রাখবে।
সালাদিনের বিউফোর্ট দুর্গ জয়
বিউফোর্ট দুর্গের ইতিহাসে পরবর্তী অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হলেন সুলতান সালাদিন (সালাহউদ্দিন আইয়ুবি)। ক্রুসেডের ইতিহাসে তিনি কেবল এই অঞ্চলেই নন, বরং সামগ্রিক ইসলামি ইতিহাসেও অন্যতম প্রখ্যাত এক নাম।
সালাদিন ছিলেন কুর্দি বংশোদ্ভূত। যখন বিউফোর্ট দুর্গ ল্যাটিন খ্রিষ্টানদের নিয়ন্ত্রণে ছিল, তখন তিনি একাধারে মিশর ও সিরিয়ার সুলতান। সমসাময়িক বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি ছিলেন একজন অত্যন্ত আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব এবং ধূর্ত ও কৌশলী সামরিক নেতা। ল্যাটিন খ্রিষ্টানদের বিরুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর সামরিক অভিযানে তিনি প্রধান ভূমিকা পালন করেন।
১১৯০ খ্রিস্টাব্দে সালাদিন বিউফোর্ট দুর্গ জয় করেন। এটি ছিল তার পরিচালিত 'কাউন্টার-ক্রুসেড' বা ক্রুসেডবিরোধী সফল অভিযানের একটি অংশ।
এর কয়েক বছর আগে তিনি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিজয় অর্জন করেছিলেন, যার মধ্যে সবথেকে উল্লেখযোগ্য ছিল ঐতিহাসিক হাত্তিনের যুদ্ধ (যা রিডলি স্কটের ২০০৫ সালের চলচ্চিত্র 'কিংডম অব হেভেন'-এ চিত্রিত হয়েছে)। এছাড়া ১১৮৭ সালে তিনি জেরুজালেম শহরটি জয় করেন, যা ক্রুসেডারদের জন্য ছিল এক বিশাল ক্ষতি।
সালাদিনের এই দুর্গ জয় ছিল মূলত ওই অঞ্চলে তার অদম্য বিজয়যাত্রারই একটি অংশ। ১১৯৩ খ্রিস্টাব্দে তার মৃত্যুর পরও ১২৪০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত দুর্গটি মুসলিমদের দখলেই ছিল।
পরবর্তীতে ব্যারনদের ক্রুসেডের সময় নাভারের রাজা থিওবল্ড প্রথম-এর সঙ্গে একটি চুক্তির মাধ্যমে এটি আবারও ল্যাটিন খ্রিস্টানদের মালিকানায় চলে যায়। সবশেষে ১২৬০ খ্রিস্টাব্দে এই দুর্গের দায়িত্ব অর্পিত হয় 'নাইটস টেম্পলার'দের ওপর।
কারা ছিলেন এই 'নাইটস টেম্পলার'?
'নাইটস টেম্পলার' ছিল একটি সামরিক ধর্মীয় গোষ্ঠী, যা মূলত যোদ্ধা এবং সন্ন্যাসীদের এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ। ১১১৮ সালে জেরুজালেম রাজ্যে এই গোষ্ঠীর পত্তন হয়। শুরুতে তাদের মূল কাজ ছিল পবিত্র ভূমি দর্শনে আসা খ্রিষ্টান তীর্থযাত্রীদের নিরাপত্তা দেওয়া। তবে সময়ের সাথে সাথে তাদের প্রভাব ও প্রতিপত্তি বহুগুণ বেড়ে যায়।
তারা 'টেম্পলার নিয়মাবলি' নামক একটি বিশেষ ধর্মীয় বিধান মেনে চলত। গোষ্ঠীর সদস্যরা কৌমার্য রক্ষা, দারিদ্র্য এবং কঠোর আনুগত্যের শপথ নিত এবং এই ব্রত মেনেই তারা একত্রে বসবাস করত।
এই সন্ন্যাসীদের সবথেকে বিস্ময়কর দিকটি ছিল—তারা একই সাথে ছিল উন্নত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত যোদ্ধা। বিশেষ করে অশ্বারোহী নাইট হিসেবে এবং ভারি ও হালকা অশ্বারোহী বাহিনী পরিচালনায় তাদের দক্ষতা ছিল বিশ্বজুড়ে কিংবদন্তিতুল্য। জেরুজালেমের রাজারা দ্রুতই সামরিক পরামর্শ এবং একটি সুশৃঙ্খল 'স্থায়ী সেনাবাহিনী' হিসেবে তাদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন।
মনে করা হতো, এই 'পবিত্র যোদ্ধারা' আধ্যাত্মিক এবং জাগতিক—উভয় রণক্ষেত্রেই লড়াই করার বিশেষ ক্ষমতার অধিকারী। তাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক বার্নার্ড অব ক্লেয়ারভক্সের ভাষায়, 'একজন টেম্পলারের আত্মা যেমন বিশ্বাসের বর্ম দিয়ে সুরক্ষিত থাকে, ঠিক তেমনি তার শরীর সুরক্ষিত থাকে ইস্পাতের বর্মে।'
ধীরে ধীরে রাজা এবং প্রভাবশালী অভিজাতরা টেম্পলারদের জমি ও ধনসম্পদ দান করতে শুরু করেন। এর ফলে তারা ইউরোপ এবং পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে বিপুল সম্পত্তির অধিকারী এক আন্তর্জাতিক সংস্থায় পরিণত হয়।
বিউফোর্ট দুর্গের ক্ষেত্রে নাইটস টেম্পলারদের শাসন টিকে ছিল মাত্র আট বছর। এরপর দুর্গটি আবারও কয়েক শতাব্দীর জন্য মুসলিম শাসকদের অধীনে চলে যায়। আধুনিক ইতিহাসে দুর্গটি লেবাননের নিয়ন্ত্রণে ছিল। তবে চলতি সপ্তাহে ইসরায়েলি বাহিনী এটি পুনরায় দখল করে নিল।
