যুক্তরাজ্যে ১২ বছরের শিশুকে ধর্ষণের দায়ে দোষী সাব্যস্ত আফগান আশ্রয়প্রার্থী
যুক্তরাজ্যের নানিটনে ১২ বছরের এক কিশোরীকে অপহরণ ও ধর্ষণের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন এক আফগান আশ্রয়প্রার্থী।
অভিযোগ অনুযায়ী, ২৩ বছর বয়সী আহমদ মুলাখিল গত ২২ জুলাই ভুক্তভোগীকে একটি নির্জন এলাকায় নিয়ে যান। সেখানে তিনি 'অত্যন্ত জঘন্য যৌন অপরাধ' ঘটান।
ওয়ারউইক ক্রাউন কোর্ট তাকে ধর্ষণ, অপহরণ, যৌন নিপীড়ন এবং ভুক্তভোগীর অশ্লীল ভিডিও ধারণের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করেছে।
মোহাম্মদ কবির (২৪) নামে আরেক আফগান আশ্রয়প্রার্থীও এ মামলায় অভিযুক্ত ছিলেন। তবে শ্বাসরোধ, অপহরণের চেষ্টা এবং যৌন অপরাধের চেষ্টার অভিযোগ থেকে তাকে খালাস দেওয়া হয়েছে।
১০ দিনের বিচার প্রক্রিয়ায় জুরিরা ভুক্তভোগীর সাক্ষ্য শোনেন। ভুক্তভোগী জানায়, হামলার সময় মুলাখিল হাসছিল।
গ্রেপ্তারের পর আসামিদের নাগরিকত্ব ও অভিবাসন মর্যাদা প্রকাশ না করায় নানিটনে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছিল। এই ঘটনার পর গ্রেপ্তারকৃতদের নাগরিকত্ব প্রকাশের নীতিমালায় পরিবর্তন আনা হয়েছে।
মুলাখিল ২০২৫ সালের মার্চে ফ্রান্স থেকে ছোট নৌকায় করে যুক্তরাজ্যে এসেছিলেন। এর চার মাস পরেই তিনি ধর্ষণের ঘটনা ঘটান।
আদালতে রায় শোনার সময় কাঠগড়ায় তাকে কাঁদতে এবং টিস্যু দিয়ে নাক মুছতে দেখা গেছে।
বিচারক ক্রিস্টিনা মন্টগোমারি কেসি তাকে জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন। আগামী মাসে সাজা ঘোষণা করা হবে।
বিচারক বলেন, 'তিনি নিশ্চিতভাবেই দীর্ঘমেয়াদী কারাদণ্ড পাবেন। সাজার মেয়াদ শেষে তাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো (ডিপোর্ট) হবে।'
আদালতে জানানো হয়, আফগানিস্তানে 'সমস্যা'র কথা বলে মুলাখিল অভিবাসনের আবেদন করেছিলেন।
এই দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের পর রিফর্ম ইউকে নেতা নাইজেল ফারাজ এবং ওয়ারউইকশায়ার কাউন্টি কাউন্সিলের নেতা জর্জ ফিঞ্চ অভিযোগ করেছিলেন যে, হামলার তথ্য 'ধামাচাপা' দেওয়া হয়েছে।
ফারাজ পরে যুক্তরাজ্যের পুলিশকে অভিযুক্তদের অভিবাসন মর্যাদা প্রকাশের আহ্বান জানান।
তখন ওয়ারউইকশায়ার পুলিশ বলেছিল, চার্জ গঠনের পর তারা জাতীয় নির্দেশিকা মেনে জাতিগত পরিচয় বা অভিবাসন মর্যাদা প্রকাশ করেনি। তবে কয়েক দিন পরই পুলিশকে হাই-প্রোফাইল মামলায় সন্দেহভাজনদের জাতিগত পরিচয় ও নাগরিকত্ব প্রকাশের বিষয়টি বিবেচনা করতে বলা হয়।
জুরিদের জানানো হয়, হামলার কয়েক ঘণ্টা আগে মুলাখিল শহরে ঘোরাঘুরি করছিলেন। তিনি বিচারের আগেই ধর্ষণের একটি অভিযোগ স্বীকার করেছিলেন।
ভুক্তভোগী জানায়, পার্কে দোলনায় খেলা শেষে দুই আসামি তার কাছে এসেছিল।
যৌন হামলার সময় ভুক্তভোগী থামতে বলেছিল। পুলিশ যখন জিজ্ঞেস করে মুলাখিল কী বলছিল, ভুক্তভোগী উত্তর দেয়: 'কিছুই না। সে শুধু হাসছিল।'
মুলাখিল পুলিশকে বলেছিল, সে ভেবেছিল ভুক্তভোগীর বয়স ১৯ এবং ভুক্তভোগী প্রথম এগিয়ে এসেছিল।
প্রসিকিউটর ড্যানিয়েল অস্কারফট আসামির ভুক্তভোগীকে দোষারোপ করার এই চেষ্টাকে 'বমি আসার মতো' এবং 'ঘৃণ্য' বলে বর্ণনা করেছেন।
জুরিদের উদ্দেশে শেষ বক্তব্যে প্রসিকিউটর বলেন, 'তার সাক্ষ্যে অনুশোচনার কোনো লেশমাত্র ছিল না। সে একবারও ভাবেনি যে সে ভুল করেছে।'
'সে উল্টো ভুক্তভোগীকেই দোষারোপ করছে।'
'সে বোঝানোর চেষ্টা করেছে যে সে ভুক্তভোগীকে প্রাপ্তবয়স্ক ভেবেছিল। সে প্রথমে কিছুই করতে চায়নি, ভুক্তভোগীই সব করিয়েছে এবং পুরো সময় সম্মতি দিয়েছে।'
ভুক্তভোগীর সাহসিকতার প্রশংসা
পুলিশ ভুক্তভোগীকে 'অত্যন্ত সাহসী' বলে প্রশংসা করেছে। তারা ঘটনাটিকে 'ভয়াবহ যৌন অপরাধ' বলে অভিহিত করেছে।
ওয়ারউইকশায়ারের মেজর ইনভেস্টিগেশন ইউনিটের প্রধান ডিটেকটিভ চিফ ইন্সপেক্টর কোলেট ও'কিফ বলেন, এই ঘটনা সারাজীবন ভুক্তভোগীকে তাড়া করবে।
তিনি বলেন, 'যেকোনো বয়সে যৌন অপরাধের শিকার হওয়াটা ট্রমাদায়ক।'
'আমি ভুক্তভোগীর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে চাই। অনেক আলোচনার ভিড়ে এটা হারিয়ে যাচ্ছে যে, এই তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ১২ বছরের এক শিশু।'
'আসামিদের জাতিপরিচয় বা নাগরিকত্ব যা-ই হোক, আমাদের মনে রাখা উচিত যে ভুক্তভোগী ধর্ষিত হয়েছে এবং সে অসীম সাহসিকতা দেখিয়েছে।'
মামলার পর স্বরাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র বলেছেন, 'আমরা বিদেশি অপরাধী ও অবৈধ অভিবাসীদের আমাদের আইন অপব্যবহার করতে দেব না। আমরা মানবাধিকার আইন সংস্কার করছি এবং আপিল ব্যবস্থা বদলাচ্ছি যাতে দ্রুত ডিপোর্ট করা যায়।'
'স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সম্প্রতি অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে বড় ধরনের সংস্কারের ঘোষণা দিয়েছেন।'
'এতে ব্রিটেন অবৈধ অভিবাসীদের কাছে কম আকর্ষণীয় হবে এবং তাদের বের করে দেওয়া সহজ হবে।'
নানিটন এবং বেডওয়ার্থ বরো কাউন্সিলের মুখপাত্র জানিয়েছেন, তারা জানেন বিষয়টি 'কতটা বেদনাদায়ক'।
তারা বলেন, 'এই কঠিন সময়ে আমরা পুলিশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছি।'
'বাসিন্দাদের যেকোনো উদ্বেগ নিয়ে আলোচনার জন্য আমরা এবং পুলিশ সবসময় প্রস্তুত।'
খালাস পাওয়ার পর কবিরকে কাঠগড়া থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। তাকে তার বর্তমান ঠিকানায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য এসকর্ট সার্ভিসের জিম্মায় দেওয়া হয়েছে।
