মালয়লাম থেকে ৭ ভাষায় রিমেক: যেভাবে বিশ্বজয় করল ‘দৃশ্যাম’
ভারতীয় সিনেমায় ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় রিমেক বা অ্যাডাপটেশনের ইতিহাসে 'দৃশ্যাম' ফ্র্যাঞ্চাইজি এখন অন্যতম সফল এক নাম। গল্পের শুরুটা হয়েছিল ২০১৩ সালে, পরিচালক জিতু জোসেফের মালয়লাম ছবি 'দৃশ্যাম'-এর হাত ধরে। এরপর একে একে কন্নড়, তেলুগু, তামিল, হিন্দি, সিংহলি, মান্দারিন ও ইন্দোনেশীয় ভাষায় এর রিমেক হতে থাকে।
জিতু জোসেফের সেই মাস্টারপিসে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন মোহনলাল। সঙ্গে ছিলেন মীনা, আনসিবা হাসান, এস্থার অনিল, কলাভবন শাজন, আশা শরৎ ও নীরজ মাধব। মাত্র ৫ কোটি রুপি বাজেটে নির্মিত ওই সিনেমা বক্স অফিস থেকে তুলে নেয় প্রায় ৬২ কোটি রুপি। ওই বছরের সবচেয়ে ব্যবসাসফল মালয়লাম ছবির তকমাও জুটে যায় এর কপালে।
মালয়লাম সিনেমার ইতিহাসে প্রথম ছবি হিসেবে ৫০ কোটি রুপি আয়ের মাইলফলক ছুঁয়েছিল 'দৃশ্যাম'। সংযুক্ত আরব আমিরাতেও ছবিটি টানা ১২৫ দিন প্রেক্ষাগৃহে চলেছে।
এরপর ২০২১ সালে মুক্তি পায় এর সিক্যুয়েল 'দৃশ্যাম ২'। আর ফ্র্যাঞ্চাইজির তৃতীয় কিস্তি, 'দৃশ্যাম ৩' পর্দায় আসে ২০২৬ সালে। তৃতীয় ছবিটি প্রায় ২৩৭ কোটি রুপি আয় করে নেয়, যা মালয়লাম ফ্র্যাঞ্চাইজির ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
পুরো ফ্র্যাঞ্চাইজির গল্প আবর্তিত হয়েছে ছিমছাম এক পরিবারকে ঘিরে। এক দাপুটে পুলিশ অফিসারের বখাটে ছেলের হাতে হেনস্তার শিকার হয় ওই পরিবারের বড় মেয়ে। একপর্যায়ে সংঘাতের জেরে মা ও মেয়ের হাতে ভুলবশত খুন হয়ে যায় ছেলেটি। এরপর পুলিশের হাত থেকে পরিবারকে বাঁচাতে বাধ্য হয়েই বাবা ফাঁদেন এক নিপুণ পরিকল্পনা।
রিমেকের জাদু
মূল সিনেমার আকাশছোঁয়া সাফল্যের পরপরই শুরু হয়ে যায় রিমেকের ধুম। প্রথম রিমেকটি হয় কন্নড় ভাষায়। পি. ভাসু-র পরিচালনায় ২০১৪ সালে মুক্তি পায় 'দৃশ্যা'। রবিচন্দ্রন, নব্যা নায়ার ও আশা শরৎ অভিনীত ছবিটির সিক্যুয়েল 'দৃশ্য ২' মুক্তি পায় ২০২১ সালে।
ওই বছরই শ্রীপ্রিয়ার পরিচালনায় ছবিটির তেলেগু সংস্করণ 'দ্রুশ্যাম' মুক্তি পায়। এতে অভিনয় করেন ভেঙ্কটেশ, মীনা ও নাদিয়া। ৬ কোটি রুপি বাজেটে নির্মিত ছবিটি বক্স অফিস থেকে তুলে নেয় প্রায় ২০ কোটি রুপি। ২০২১ সালে মুক্তি পায় এর সিক্যুয়েলও।
এরপর ২০১৫ সালে দুই ভাষায় মুক্তি পায় 'দৃশ্যাম'-এর নতুন দুই রিমেক। এর মধ্যে তামিল রিমেক 'পাপানাসাম' পরিচালনা করেন জিতু জোসেফ নিজেই। কমল হাসান, গৌতমী ও আশা শরৎ অভিনীত ছবিটি বিশ্বজুড়ে প্রায় ১০০ কোটি রুপি আয় করে।
ওই বছরই নিশিকান্ত কামাতের পরিচালনায় মুক্তি পাওয়া হিন্দি সংস্করণের 'দৃশ্যাম'-এ অভিনয় করেন অজয় দেবগন, শ্রিয়া সরন, তাবু ও রজত কাপুর। প্রায় ৩৮ কোটি রুপি বাজেটে নির্মিত ছবিটি বিশ্বজুড়ে ১১০ কোটি রুপিরও বেশি আয় করে। সাত বছর পর, ২০২২ সালে আসে এর সিক্যুয়েল। অভিষেক পাঠকের পরিচালনায় ৫০ কোটি রুপি বাজেটের এই ছবিটি বিশ্বজুড়ে আয় করে প্রায় ৩৪৫ কোটি রুপি।
হিন্দি ফ্র্যাঞ্চাইজির তৃতীয় ও শেষ কিস্তি 'দৃশ্যাম: দ্য কনক্লুশন' প্রেক্ষাগৃহে আসে ২ অক্টোবর। ২০২৬ সালের হিন্দি সিনেমার ইতিহাসে 'ধুরন্ধর: দ্য রিভেঞ্জ'-এর পর এটিই অর্জন করে দ্বিতীয় বৃহত্তম ওপেনিং। মুক্তির প্রথম দিনেই ভারতজুড়ে নিট ৬৬.৭৫ কোটি রুপি ঘরে তোলে ছবিটি। একইসঙ্গে ২০২৪ সালের 'সিংহাম এগেইন'কে পেছনে ফেলে এটি অজয় দেবগনের ক্যারিয়ারের সর্বকালের সেরা ওপেনিং ডে হিসেবে নতুন রেকর্ড গড়ে। ১০ অক্টোবর পর্যন্ত ৯ দিনে বিশ্বজুড়ে সিনেমাটির মোট আয় দাঁড়িয়েছে ৪৫২ কোটি রুপি। এখনও সমানতালে দর্শক ধরে রেখেছে ছবিটি।
ভারতের সীমান্ত পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ছবিটির রিমেক যাত্রা শুরু হয় ২০১৭ সালে, শ্রীলঙ্কান সংস্করণ 'ধর্মযুদ্ধয়া'র হাত ধরে। চেইয়্যর রবির পরিচালনায় ও এমটিভি-র প্রযোজনায় নির্মিত সিংহলি ভাষার এই চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন জ্যাকসন অ্যান্টনি, দিলহানি একানায়েকে ও কুসুম রেনু। মূল মালয়লাম ছবির ফ্রেম-টু-ফ্রেম রিমেক ছিল এটি। ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্রটির প্রেক্ষাগৃহগুলোতে টানা প্রায় ১০০ দিন চলেছিল ছবিটি।
এর প্রায় এক দশক পর, ২০২৬ সালে মুক্তি পায় 'ধর্মযুদ্ধয়া ২'। অরুণা জয়বর্ধনের পরিচালনায় এতে অভিনয় করেন বিমল জয়কোডি, দিলহানি একানায়েকে ও কুসুম রেনু। শ্রীলঙ্কার স্থানীয় বক্স অফিসে ৫০ কোটি লঙ্কান রুপি আয়ের মাইলফলক ছাড়িয়ে এই ছবিটিও পায় বিপুল সাফল্য।
২০১৯ সালে মান্দারিন ভাষায় আসে 'দৃশ্যাম' চীনা রিমেক 'শিপ উইদাউট আ শেফার্ড'। স্যাম কোয়া পরিচালিত এই ছবিতে অভিনয় করেন শিয়াও ইয়াং, তান ঝুও ও জোয়ান চেন। চীনের বক্স অফিসে আলোড়ন সৃষ্টি করে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৯১.৬ মিলিয়ন ডলার আয় করে নেয় ছবিটি।
আর চলতি বছরের আগস্টে মুক্তি পায় ইন্দোনেশীয় সংস্করণ 'আয়াহ, আকু মাউ চেরিতা'। দানিয়াল রিফকির পরিচালনায় এতে অভিনয় করেছেন ভিনো জি বাস্তিয়ান, নিকেন অঞ্জনী, মার্শা টিমোথি এবং জিভা ম্যাগনোলিয়া। ২০ আগস্ট ইন্দোনেশিয়ার প্রেক্ষাগৃহগুলোতে মুক্তি পায় ছবিটি।
