অভিনয়ের বাইরে নানা পাটেকার ছিলেন কৃষক, সমাজকর্মী আর রাঁধুনিও
৭৫ বছর বয়সে বৃহস্পতিবার মৃত্যুবরণ করা নানা পাটেকার হিন্দি ও মারাঠি সিনেমায় অভিনয়ের জন্য পরিচিত ছিলেন। তবে অভিনয় ও চলচ্চিত্র নির্মাণের বাইরেও তার জীবন ছিল বিস্তৃত। টেরিটোরিয়াল আর্মির সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা, দাতব্য কাজ, কৃষিকাজ ও রান্নার প্রতি ভালোবাসার পাশাপাশি সরল জীবনযাপনের জন্যও পরিচিত ছিলেন তিনি। অন্যদের সহায়তায়ও ছিল তার দীর্ঘদিনের অঙ্গীকার।
অভিনয়ের বাইরের নানা পাটেকারের জীবনের নানা দিক উঠে এসেছে তার কাজ ও জীবনযাপনে।
নানা পাটেকার ভারতীয় টেরিটোরিয়াল আর্মিতে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন এবং ক্যাপ্টেন পদমর্যাদা অর্জন করেছিলেন। ১৯৯৯ সালের কার্গিল যুদ্ধের সময় তিনি সম্মুখসারিতে থাকা সেনাদের সঙ্গে সময় কাটিয়েছেন বলে জানা যায়। সেখানে তিনি সেনাদের এবং শহীদদের পরিবারের প্রশিক্ষণ ও সহায়তায় যুক্ত ছিলেন।
কৃষক ও গ্রামীণ মানুষের পাশে নানা
তার দাতব্য কাজও জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। মহারাষ্ট্রে খরা ও ঋণের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও গ্রামীণ পরিবারগুলোর সহায়তায় নানা পাটেকার ব্যাপকভাবে কাজ করেছেন।
খরা ও ঋণের মধ্যে আত্মহত্যা করা কৃষকদের পরিবারের সদস্যদের ব্যক্তিগতভাবে আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন তিনি। ২০১৫ সালের আগস্টে বিদর্ভ অঞ্চলের ৬২টি কৃষক পরিবারের মধ্যে ১৫ হাজার রুপি করে চেক বিতরণ করেন। এক মাস পর মারাঠওয়াড়ার লাতুর ও ওসমানাবাদের আরও ১১৩টি পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়।
নানা নিজের উপার্জন ও পুরস্কারের অর্থও বিভিন্ন দাতব্য কাজে ব্যয় করেছেন। ২০১০ সালে 'পাঠশালা' সিনেমা থেকে পাওয়া পারিশ্রমিক পাঁচটি দাতব্য সংস্থায় দান করেন তিনি। এ ছাড়া দাতব্য সংস্থা অনুভূতির মাধ্যমে বিহারের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাম পুনর্গঠনের কাজেও সহায়তা করেন।
২০১৩ সালে মহারাষ্ট্র সরকারের কাছ থেকে রাজ কাপুর স্পেশাল কনট্রিবিউশন অ্যাওয়ার্ড পান নানা। পুরস্কারের ১০ লাখ রুপি নগদ অর্থের পুরোটা খরা মোকাবিলায় দান করেন তিনি।
'নাম ফাউন্ডেশন' প্রতিষ্ঠা
২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে মারাঠি অভিনেতা মকরন্দ আনাসপুরের সঙ্গে মিলে 'নাম ফাউন্ডেশন' প্রতিষ্ঠা করেন নানা পাটেকার। মহারাষ্ট্রে তীব্র খরা ও পানির সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে সহায়তার লক্ষ্যেই এই সংগঠনটি গড়ে তোলা হয়। খরা মোকাবিলায় অর্থ সংগ্রহের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারণাও ব্যবহার করেন নানা
পানি সংরক্ষণে নানা
'নাম ফাউন্ডেশন'-এর মাধ্যমে পানি সংরক্ষণেও কাজ করেছেন নানা পাটেকার। মহারাষ্ট্রের পানিসংকট মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের লক্ষ্যে সংগঠনটি খাল ও পরিত্যক্ত পানি প্রকল্প পুনরুদ্ধার, নদী পুনরুজ্জীবন, জলাশয় থেকে পলি অপসারণ এবং ভূগর্ভস্থ পানির প্রাপ্যতা বাড়ানোর মতো কাজ করেছে।
'নাম ফাউন্ডেশন'-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত তাদের পানি সংরক্ষণ কার্যক্রমে ২ হাজার ২৪৬টি পানির উৎস পুনরুদ্ধার এবং ১৭৮টি নদী পুনরুজ্জীবিত করা হয়েছে। এ ছাড়া ৫১৫টি ঝরনা ও নালা নিয়ে কাজ করা হয়েছে এবং ৭৬৯টি পারকোলেশন ট্যাংক পুনরুদ্ধার করা হয়েছে।
সংগঠনটির দাবি, এসব প্রকল্পের মাধ্যমে ৪০ হাজার কোটি লিটারের বেশি পানি সংরক্ষণের সক্ষমতা তৈরি হয়েছে এবং সরাসরি উপকৃত হয়েছেন ৭৭ লাখের বেশি কৃষক।
২০২৬ সালের মে মাসে নাগপুর জল সংবাদে বক্তব্য দেওয়ার সময় নানা বলেন, পানি সংরক্ষণকে প্রচারণার অংশ না বানিয়ে প্রকৃত জনআন্দোলনে পরিণত করতে হবে। সম্ভাব্য প্রতিটি ফোঁটা পানি সংরক্ষণে নাগরিকদের নিজেদের দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সরল জীবনযাপন
অসংখ্য সফল হিন্দি ও মারাঠি সিনেমায় কাজ করলেও সরল জীবনযাপনের জন্য পরিচিত ছিলেন নানা পাটেকার।
শুটিংয়ের বাইরে পুনের সিংহগড় দুর্গের কাছে নিজের খামারবাড়িতে কৃষিকাজ করতেন তিনি। ২০১৫ সালে দ্য নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে খামারের জীবন নিয়ে তিনি বলেছিলেন, 'আমার প্রায় ১০ একর জমি আছে; আমি একজন কৃষকের মতো আমার জমি চাষ করি এবং মহিষগুলোর দেখাশোনা করি। সেখানে আমার ছোট বাড়িটিতে আমি যথেষ্ট সময় কাটাই।'
রান্নার প্রতিও ছিল ভালোবাসা
রান্না ছিল নানা পাটেকারের আরেকটি আগ্রহের জায়গা। সহকর্মী ও বন্ধুদের জন্য রান্না করতে এবং মানুষকে খাওয়াতে তিনি পছন্দ করতেন।
২০১৫ সালে দ্য নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নানা বলেছিলেন, 'আমি মনে করি, আমি অভিনেতার চেয়ে ভালো রাঁধুনি।'
দ্য লালানটপকে দেওয়া এক আলাপচারিতায় নানা জানান, তিনি একসঙ্গে প্রায় ২০০ জনের জন্য রান্না করতে পারতেন। সিনেমার শুটিং সেটে রান্না করার সময় তিনি সবাইকে কাজে যুক্ত করতেন। কেউ সবজি কাটতেন, কেউ খোসা ছাড়াতেন—এভাবে বিভিন্ন দায়িত্ব ভাগ করে দিতেন তিনি।
তার বিশেষ রান্নার মধ্যে ছিল নন-ভেজ খাবারের বিভিন্ন পদ, যেমন মাটন পায়া, কিমা কালেজি ও ভেজা। তিনি আরও বলেছিলেন, বাড়িতে নিজেই মসলা তৈরি করতেন।
নানার রান্নার প্রতি ভালোবাসার কথা স্মরণ করেছেন অভিনেত্রী ও সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী স্মৃতি ইরানিও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক শোকবার্তায় তিনি নানা পাটেকারের রান্না করার একটি ভিডিও শেয়ার করেন এবং তাদের একটি কথোপকথনের স্মৃতিচারণ করেন।
স্মৃতি ইরানি লিখেছেন, 'আজ, আমার সবচেয়ে প্রিয় স্মৃতিগুলোর মধ্যে একটি হলো—তিনি আমার জন্য রান্না করেছিলেন। কোনো বিশেষ উপলক্ষ ছিল না। শুধু দাদা, দাদার মতোই।'
তাদের শেষ কথোপকথনের কথা স্মরণ করে তিনি আরও লিখেছেন, 'পুনেতে এসো, কবে আসবে?'
শেষে তিনি লিখেছেন, 'আমি বলেছিলাম, "শিগগিরই" অনুমান করি, সেই শিগগিরটা যথেষ্ট শিগগির ছিল না। ওপারে দেখা হবে, দাদা।'
