রাখি বন্ধনের বিজ্ঞাপনে কৃতি স্যাননের পোশাক নিয়ে বিতর্ক, সমালোচনার মুখে বিজ্ঞাপন সরাল নির্মাতা সংস্থা
সমালোচনার মুখে আসন্ন রাখি বন্ধন উৎসব উপলক্ষে প্রকাশ করা একটি বিজ্ঞাপন সরিয়ে নিয়েছে ভারতের একটি গয়না ব্র্যান্ড।
মূলত বিজ্ঞাপনটিতে নারী চরিত্রে অভিনয় করা জনপ্রিয় বলিউড অভিনেত্রী কৃতি শ্যাননের পোশাক নিয়ে আপত্তি ওঠে। এতে কৃতিকে ক্রপড টপ ও স্কার্ট পরা অবস্থায় দেখা যায়।
বিজ্ঞাপনটিতে কৃতিকে হিন্দু ধর্মীয় উৎসব রাখি বন্ধন উদ্যাপন করতে দেখা যায়। এই উৎসবে বোনেরা ভাইদের কবজিতে 'রাখি' নামে একটি সুতো বাঁধেন।
মঙ্গলবার বলিউডের আরেক অভিনেত্রী ও বিজেপির সংসদ সদস্য কঙ্গনা রানাউত বিজ্ঞাপনটিকে 'অত্যন্ত অস্বস্তিকর' বলে মন্তব্য করার পর বিতর্ক শুরু হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কঙ্গনা রানাউত লেখেন, 'আলমারিতে পোশাকের কমতি নেই। তার পরও বিকিনি বা অন্তর্বাস পরে ভাইকে রাখি বাঁধতে হবে কেন? বিজ্ঞাপনটি অত্যন্ত অস্বস্তিকর।'
কঙ্গনা যদিও কৃতির নাম উল্লেখ করেননি, তবে কৃতিকে উদ্দেশ্য করেই তিনি [কঙ্গনা] এ মন্তব্য করেছেন বলে নেটিজেনদের ধারণা।
কঙ্গনার মন্তব্য দ্রুত অনলাইনে আলোচনার জন্ম দেয়। কয়েকজন ব্যবহারকারীও কৃতির পোশাকের সমালোচনা করেন।
অনেকে বিজ্ঞাপনের আরেকটি দৃশ্য নিয়ে আপত্তি জানান। ওই দৃশ্যে অভিনেত্রী তার পোষা কুকুরের গলায়ও রাখি বাঁধেন।
তবে কৃতির পক্ষেও অনেকে কথা বলেন। তাদের মধ্যে অন্যতম কংগ্রেসের সংসদ সদস্য রাহুল গান্ধী। তিনি কৃতির পক্ষে অবস্থান নিয়ে বলেন, 'একজন নারী কী পোশাক পরবেন, সেটি একান্তই তার নিজের সিদ্ধান্ত।'
এছাড়া অনেকেই কঙ্গনা রানাউতের বিরুদ্ধে নৈতিকতার নামে অন্যের পোশাক নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ তোলেন।
কেউ কেউ এ কথাও উল্লেখ করেন যে, রাজনীতিতে আসার পর সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কঙ্গনা রানাউত পোশাকের ক্ষেত্রে তুলনামূলক রক্ষণশীল হলেও, চলচ্চিত্রে এবং সামাজিক অনুষ্ঠানে তিনি নিজেও প্রায়ই ছোট পোশাক ও পশ্চিমা পোশাক পরেছেন।
অবশেষে মঙ্গলবার রাতে সমালোচনার জবাবে ইনস্টাগ্রাম স্টোরিতে কৃতি স্যানন নারীর পোশাকের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার মানসিকতার সমালোচনা করেন।
সমালোচকদের উদ্দেশে তিনি লেখেন, 'উৎসবের সার্থকতা পোশাকের ওপর নির্ভর করে না, আবেগ ও অনুভূতির মধ্যেই নিহিত থাকে সবকিছু। রাখি বন্ধন মানে পরস্পরকে আগলে রাখা। আমার বোন এবং আমি পরস্পরকে রাখি পরাই। আমরা জানি, পরস্পরকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে আমরা ভাইয়ের চেয়ে কোনো অংশে কম নই। পরস্পরের সুস্বাস্থ্য, সুখী জীবন, দীর্ঘায়ু কামনা করি। বাড়ির পোষ্যকে নিয়েও একই অনুভূতি আমাদের। তারাও আমাদের পরিবারের অংশ।'
তবে কঙ্গনা রানাউতের মতো তিনিও সরাসরি কারো নাম উল্লেখ করেননি।
পোষা কুকুরের গলায় রাখি বাঁধার বিষয়ে কৃতি বলেন, রাখিবন্ধন ঐতিহ্যগতভাবে ভাই-বোনের বন্ধন উদ্যাপনের উৎসব হলেও, এর মূল চেতনা হলো প্রিয়জনদের সুরক্ষা করা।
বিজ্ঞাপন সরিয়ে নেওয়া হলো সব প্ল্যাটফর্ম থেকে
কৃতি শ্যানন নিজের অবস্থানের পক্ষে জোরালো বক্তব্য দেওয়ার পরও বুধবার গয়না ব্র্যান্ড 'গিভা' বিজ্ঞাপনটি সরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দেয়।
ইনস্টাগ্রামে দেওয়া এক বিবৃতিতে গিভা বলেছে, 'ভারতীয় সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও উৎসবের প্রতি আমাদের সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা ও গভীর সম্মান রয়েছে। ব্র্যান্ড হিসেবে আমরা সব সময় পুরো পরিবারের সঙ্গে এসব আনন্দের মুহূর্ত উদ্যাপনে বিশ্বাস করি। এবার আমরা এই ভালোবাসা ও উদ্যাপনের অংশ হিসেবে আমাদের পোষা প্রাণীদেরও যুক্ত করতে চেয়েছিলাম।'
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, 'আমাদের সাম্প্রতিক বিজ্ঞাপনটি যদি সমাজের কোনো অংশের মানুষের অনুভূতিতে আঘাত দিয়ে থাকে, তাহলে সেটি একেবারেই অনিচ্ছাকৃত। আমরা এটা কখনও চাইনি। সবার প্রতি সম্মান জানিয়ে সমব প্ল্যাটফর্ম থেকে আমরা ওই বিজ্ঞাপনটি সরিয়ে নিলাম। আনন্দের সঙ্গে উৎসব পালন করুন।'
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার পর বিজ্ঞাপন প্রত্যাহার করা গিভাই প্রথম ভারতীয় ব্র্যান্ড নয়। ২০২০ সালে জনপ্রিয় গয়না ব্র্যান্ড তানিষ্কও অনলাইনে ডানপন্থীদের সমালোচনার মুখে একটি আন্তঃধর্মীয় দম্পতিকে নিয়ে তৈরি বিজ্ঞাপন প্রত্যাহার করেছিল।
ভারতে বারবার নারীদের কী পোশাক পরা উচিত এবং কী পরা উচিত নয়—এ নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।
গত বছর একটি সৌন্দর্য প্রতিযোগিতার প্রতিযোগী পোশাক নিয়ে কটাক্ষের জবাব দিয়ে আলোচনায় আসেন। একদল পুরুষ ওই প্রতিযোগী ও অন্য প্রতিযোগীদের পরা স্কার্ট ও পশ্চিমা পোশাক নিয়ে তাদের হেনস্তা করার চেষ্টা করেছিলেন।
২০২১ সালে ১৯ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী পরীক্ষায় শর্টস পরে আসার পর তাকে পায়ে কাপড় জড়িয়ে বসতে বাধ্য করা হয়। শিক্ষক তার পোশাক নিয়ে আপত্তি জানানোর পর এ ঘটনা ঘটে। এতে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
একই বছর উত্তরাখণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী এক নারীকে ছেঁড়া জিনস পরার জন্য সমালোচনা করার পর, হাজারো নারী ও কিছু পুরুষ ছেঁড়া জিনস পরা নিজেদের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করেন।
