‘খুব কষ্ট পেয়েছিলাম’: অভিষেক-ঐশ্বরিয়ার বিয়ের পর পাপারাজ্জিরা যে কারণে বচ্চন পরিবারকে বয়কট করেছিলেন
২০০৭ সালে অভিষেক বচ্চন ও ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চনের জাঁকজমকপূর্ণ বিয়েটি ছিল বলিউডের অন্যতম আলোচিত আয়োজন। তবে এই বিয়েকে ঘিরেই বলিউডের ইতিহাসে অন্যতম বড় একটি মিডিয়া বয়কটের ঘটনা ঘটে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিয়ের অনুষ্ঠান কভার করতে যাওয়া আলোকচিত্রীরা অভিযোগ করেন, বচ্চন পরিবারের ঘনিষ্ঠ বন্ধু রাজনীতিক অমর সিংয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তাকর্মীরা তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে আলোকচিত্রীরা সম্মিলিতভাবে বচ্চন পরিবারের ছবি তোলা বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেন।
নিরাপত্তারক্ষীরা আমাদের দিকে পানির পাউচ ছুড়ে মারতো
সেই ঘটনার স্মৃতিচারণ করে আলোকচিত্রী হর্ষবর্ধন পাঠক হিন্দি রাশকে বলেন, 'এটি ছিল বিশাল একটি বিয়ে এবং বড় একটি সংবাদ। আমি তার সঙ্গে আরও অনেক ফটোশুট করেছি এবং তার সঙ্গে আমার ভালো সম্পর্ক ছিল। তবে আমি পেশাজীবন শুরু করেছি সংবাদপত্রের আলোকচিত্রী হিসেবে। ফ্রিল্যান্সার হিসেবে আমি যত বেশি ছবি তুলতে পারতাম, তত বেশি আয় হতো। বিয়ের আনুষ্ঠানিক আলোকচিত্রের দায়িত্ব একজনকে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু আমাদেরও তো ছবি দরকার ছিল।'
তিনি বলেন, বিয়েটি এমন সময়ে হয়েছিল যখন পাপারাজ্জি সংস্কৃতি জনপ্রিয় হয়ে উঠছিল।
হর্ষবর্ধন পাঠক বলেন, 'বিয়ের অনুষ্ঠান চার দিন ধরে চলেছিল। আমরা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতাম, লুকিয়ে ছবি তোলার চেষ্টা করতাম। নিরাপত্তারক্ষীরা গণমাধ্যমকর্মীদের দিকে পানির পাউচ ছুড়ে মারত। খাবারের কথা বাদই দিলাম, এমনকি যেভাবে আমাদের দিকে পানি ছুড়ে দেওয়া হতো, সেটিও ছিল অসম্মানজনক। আমরা খুবই কষ্ট পেয়েছিলাম।'
তিনি আরও বলেন, 'পরে সব আলোকচিত্রী আলোচনা করে বচ্চন পরিবারকে বয়কটের সিদ্ধান্ত নিই। পুরো এক মাস আমরা তাদের কোনো ছবি তুলিনি।'
এক মাস পর অমিতাভ বচ্চন বয়কটের বিষয়টি টের পান
পাঠকের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথম দিকে বচ্চন পরিবার বুঝতেই পারেনি যে তারা বয়কটের শিকার হয়েছেন।
তিনি বলেন, 'প্রায় এক মাস পর অমিতাভ বচ্চনের প্রথম গণমাধ্যম উপস্থিতি ছিল 'চিনি কম' ছবির প্রেস শোতে। সেখানে প্রায় ১২ জন আলোকচিত্রী উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু তিনি আসার পর কেউ তাকে ডাকেননি বা তার ছবি তোলেননি। তিনি কয়েকবার হেঁটে গেলেও কেউ কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। পরে সাংবাদিকরা আমাদের কাছে জানতে চান কী হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, 'তিনি [অমিতাভ বচ্চন] আবার ফিরে এলে পরিবেশের অস্বাভাবিকতা টের পান, পরিচালক আর. বালকির সঙ্গে অল্প একটু কথা বলেন, আমাদের দিকে তাকান এবং ভেতরে চলে যান।'
বিগ বি-কে শেষ পর্যন্ত পাপারাজ্জিদের কাছে ক্ষমা চাইতে হয়েছিল
প্রবীণ তারকা আলোকচিত্রী বরিন্দর চাওলাও একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, 'আমি তাদের বাড়ির বাইরে অবস্থান করছিলাম। আমরা জানতাম কোথা থেকে ছবি তোলা সম্ভব, বিশেষ করে প্রবেশপথের কাছে। কিন্তু সেখানে একটি বাস দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছিল, যা পুরো দৃশ্য আড়াল করে দেয়। পরিবারের সদস্যরা এক বাংলো থেকে আরেক বাংলোতে যাতায়াতের সময় অমর সিংয়ের নিরাপত্তাকর্মীরা খুবই আক্রমণাত্মক আচরণ করতেন।'
তিনি আরও বলেন, 'গণমাধ্যমকর্মীরা এক ঝলক দেখার চেষ্টা করলে তাদের ওপর হামলা করা হতো। এতে কয়েকজন আলোকচিত্রী আহত হন।'
পরে এই ঘটনা নজিরবিহীন এক মিডিয়া বয়কটে রূপ নেয়।
চাওলা বলেন, 'এত বড় বয়কট আমি আগে কখনো দেখিনি। অমিতাভজি, জয়াজি, অভিষেক ও ঐশ্বরিয়া—সবার ওপরই নিষেধাজ্ঞা ছিল। বচ্চন পরিবার কোনো অনুষ্ঠানে গেলে আলোকচিত্রীরা প্রতিবাদ হিসেবে ক্যামেরা নামিয়ে রাখতেন বা ওপরে তাক করে রাখতেন। অমিতাভ বচ্চনকে যদি গ্রুপ ছবির জন্য ডাকা হতো, তাহলে আলোকচিত্রীরা তার পাশের ব্যক্তির ছবি তুলতেন অথবা তার ছবি তুলতেই অস্বীকৃতি জানাতেন।'
প্রতিবেদন অনুযায়ী, অমিতাভ বচ্চন ব্যক্তিগতভাবে বিষয়টি নিয়ে কথা বলে আলোকচিত্রীদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করার পরই এই অচলাবস্থার অবসান ঘটে।
এর আগেও ১৫ বছর বয়কটের মুখে ছিলেন বিগ বি
তবে গণমাধ্যমের বয়কটের মুখে পড়ার ঘটনা অমিতাভ বচ্চনের জীবনে এটিই প্রথম ছিল না। ২০১৭ সালে লেখা এক ব্লগে তিনি জরুরি অবস্থার সময়ের কথা স্মরণ করে দাবি করেন, তখন গণমাধ্যমের একটি অংশ বছরের পর বছর তাকে নিয়ে কোনো সংবাদ প্রকাশ করেনি।
তিনি লিখেছিলেন, 'আমাকে নিয়ে কিছুই ছাপা হতো না। আমার চলচ্চিত্র বা কাজের কোনো খবর প্রকাশ করা হতো না। আমি কোনো অনুষ্ঠানে গেলে আলোকচিত্রীরা ক্যামেরা নামিয়ে রাখতেন এবং একটি ছবিও তুলতেন না। চলচ্চিত্রের ক্রেডিটে, যেমন 'নাস্তিক' ছবিতে লেখা হতো—'হেমা মালিনী, (,) এবং প্রাণ।' আমি ছিলাম সেই কমা।'
'দিওয়ার' ছবির সাফল্যের পর পুরস্কার মৌসুমে ঘটে যাওয়া আরেকটি ঘটনার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
অমিতাভের দাবি, অনেক সমালোচক ও গণমাধ্যমের সদস্যরা মনে করেছিলেন যে, আমাকে ইচ্ছাকৃতভাবে অপমান করা হয়েছিল। কারণ সেরা অভিনেতার পুরস্কারটি সঞ্জীব কুমারকে দেওয়া হয়, আর আমাকে সেই পুরস্কারটি তার হাতে তুলে দেওয়ার জন্য মঞ্চে আমন্ত্রণ জানানো হয়।
অমিতাভ বচ্চনের মতে, 'কুলি' ছবির শুটিংয়ের সময় তার প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার পর পরিস্থিতির পরিবর্তন শুরু হয়। তাকে বয়কট করা একটি প্রকাশনা তার সুস্থতার সময় সহানুভূতিশীল একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
পরে ওই সাময়িকীর সম্পাদকের সঙ্গে সাক্ষাতের স্মৃতিচারণ করে অমিতাভ লেখেন, 'খুবই খোলামেলা ও সৎভাবে তিনি আমাকে বলেছিলেন, 'গণমাধ্যমের সঙ্গে আপনার আচরণে আমরা ক্ষুব্ধ ছিলাম এবং চেয়েছিলাম আপনি ব্যর্থ হোন। কিন্তু আমরা চাইনি আপনি মারা যান। তাই আপনি সুস্থ হওয়ার পর আমরা সেই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করি।'
তিনি বলেন, 'এটি ছিল আবেগঘন একটি মুহূর্ত এবং এরপর থেকে আমাদের সম্পর্ক আবার স্বাভাবিক হয়ে যায়।'
ঘটনাটি আজও বলিউডের সবচেয়ে প্রভাবশালী পরিবার এবং বিনোদন সাংবাদিকতার জগতের মধ্যে সংঘটিত সবচেয়ে আলোচিত দ্বন্দ্বগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়। এটি তারকাদের সঙ্গে গণমাধ্যমের ক্ষমতার সম্পর্কের এক বিরল চিত্রও তুলে ধরে।
