ইশরাক হোসেনের উত্থান ও পতন
ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও ক্র্যাক প্লাটুনের সদস্য সাদেক হোসেন খোকার ছেলে হিসেবে পরিচয়ের পাশাপাশি নিজের রাজনৈতিক কাজের জোরেও তিনি মূলধারার রাজনীতিতে জায়গা করে নিয়েছেন।
খোকা ছিলেন অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়র, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ভাইস চেয়ারম্যান ও ঢাকা-৭ আসনের সংসদ সদস্য। ইশরাকের জন্ম ১৯৮৭ সালের ৫ এপ্রিল, ঢাকায়। স্কলাস্টিকা স্কুল থেকে ও-লেভেল ও এ-লেভেল শেষ করে তিনি যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব হার্টফোর্ডশায়ারে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েন।
শুরুতে ছাত্রদলের যুক্তরাজ্য শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তিনি। ২০১৫ সালের কাছাকাছি সময়ে দেশে ফিরে কোণঠাসা বিএনপির নেতাকর্মীদের নিয়ে রাজপথে নামেন। নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিজেও হামলার শিকার হয়েছেন, একাধিকবার হতে হয় ধরপাকড়ের মুখোমুখিও।
২০১৮ সালের একাদশ সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৬ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেলেও জয়ের দেখা পাননি। ২০২০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপি তাকে মেয়র প্রার্থী করে। গণমাধ্যমের হিসাবে তৎকালীন আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) শেখ ফজলে নূর তাপস প্রায় পৌনে দুই লাখ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন। বিএনপি নির্বাচনের ফল প্রত্যাখ্যান করে; একইসাথে আনে ভোট কারচুপি ও অনিয়মের অভিযোগ। ৩ মার্চ ইশরাক নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন।
একই বছরের নভেম্বরে মতিঝিলে গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনায় ৪২ জনের বিরুদ্ধে নাশকতার মামলা হয়। মামলায় আসামিদের একজন ছিলেন ইশরাক। ২০২২ সালের এপ্রিলে গ্রেপ্তার হলেও পরবর্তীতে আদালত তাকে জামিন দেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর ২০২৫ সালের ২৭ মার্চ ঢাকার প্রথম যুগ্ম জেলা জজ ও নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. নুরুল ইসলাম ২০২০ সালের নির্বাচনের ফল বাতিল করে ইশরাককে মেয়র ঘোষণা করেন। ২৭ এপ্রিল নির্বাচন কমিশন গেজেট প্রকাশ করে। কিন্তু পাঁচ বছরের আইনি লড়াইয়ের পর পাওয়া রায় ও গেজেটের পরও তিনি শপথ নিতে পারেননি।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। ধানের শীষ প্রতীকে ঢাকা-৬ আসনে প্রায় ৭৯ হাজার ভোট পেয়ে জয়ী হন ইশরাক।
দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে প্রায় ৫৪ হাজার ভোট নিয়ে দ্বিতীয় হন জামায়াতের আব্দুল মান্নান। ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভার ২৪ প্রতিমন্ত্রীর একজন হিসেবে শপথ নেন তিনি।
ইশরাকের সম্পদ কত?
ঢাকা-৬ আসনের প্রার্থী হিসেবে ২০২৫ সালের ২৯ ডিসেম্বরে দেওয়া সর্বশেষ হলফনামায় ইশরাক পেশা হিসেবে ব্যবসা উল্লেখ করেছেন। হলফনামা অনুযায়ী, তার অস্থাবর সম্পদের অর্জনকালীন মূল্য ৬ কোটি ১৪ লাখ ৭৬ হাজার ৯৬৫ টাকা এবং স্থাবর সম্পদের ৬৪ লাখ ৯২ হাজার ৪৫০ টাকা।
স্থাবর সম্পদের বর্তমান আনুমানিক মূল্য ১ কোটি ৬২ লাখ ৩১ হাজার ১২৫ টাকা। আয়কর রিটার্নে আয় দেখিয়েছেন ১ কোটি ২৯ লাখ ৩২ হাজার ৮১৭ টাকা। তবে, তার কোনো দায় বা ঋণ নেই।
নির্বাচনী ব্যয়ের জন্য নিজের আয় থেকে ২৫ লাখ ৫০ হাজার টাকার কথা জানিয়েছেন।
একই হলফনামায় ইশরাকের মোট ২১টি মামলার তথ্য আছে। এর মধ্যে ২০টিতে এফআরটিতে অব্যাহতি এবং একটিতে (দুদকের মামলায়) খালাস পেয়েছেন। বর্তমানে কোনো মামলা বিচারাধীন নেই। এছাড়া, আগ্নেয়াস্ত্রের জায়াগায় 'প্রযোজ্য নহে' লিখা ছিল।
মন্ত্রিসভার সদস্য ইশরাকের ভাবমূর্তি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। বিএনপির দুর্দিনে রাজপথের সাহসী নেতা হিসেবে তিনি প্রশংসিত হয়েছেন। পরবর্তী সময়ে কখনো স্যালুট দেওয়া, কখনো মেয়র হিসেবে নিজের নাম ব্যানারে রাখা, আবার তার অনুসারীদের নগর ভবন ঘেরাও করে কার্যক্রম আটকে রাখার ঘটনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
১৭ অক্টোবর (শনিবার) বিকেলে রাজধানীর গেন্ডারিয়া রেলস্টেশন-সংলগ্ন এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে যান ইশরাক হোসেন। অভিযানের ভিডিও তার নিজের পেজ থেকেই প্রকাশ হয়। ভিডিওতে দেখা যায়, গাড়ি থেকে নেমেই তিনি পিস্তল উঁচিয়ে চিৎকার করছেন। অভিযানে পিস্তল হাতে ইশরাকের চিৎকারের ভিডিও প্রকাশের পর তা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়।
এ ঘটনার পর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে তাকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এরপর পদত্যাগের ঘোষণা দিতে সোমবার (১৯ অক্টোবর) জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন ইশরাক হোসেন।
সম্মেলনে তিনি জানান, দলীয় নীতি ও সুনাম বজায় রাখতেই তিনি এই পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। একই সঙ্গে মাদকের ভয়াল থাবা থেকে তরুণ প্রজন্মকে বাঁচাতে এবং দেশের অস্তিত্ব রক্ষায় ঘোষিত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
