রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সহায়তায় আরও ১৪ মিলিয়ন ইউরো দিচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন
বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং তাদের আশ্রয়দানকারী স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আরও ১৪ মিলিয়ন ইউরো উন্নয়ন অনুদান দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। আজ বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) ইইউ এবং জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর তাদের অংশীদারিত্ব নবায়নের মাধ্যমে এই নতুন অর্থায়নের কথা জানায়।
এই তহবিলটি ইইউ-এর নিয়মিত মানবিক সহায়তা এবং পূর্ববর্তী বহুবর্ষীয় উন্নয়ন নীতিমালার অতিরিক্ত হিসেবে দেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে কক্সবাজারে অবস্থানরত রোহিঙ্গা এবং প্রায় ৭০ হাজার বাংলাদেশি স্থানীয় বাসিন্দার জন্য দক্ষতা বৃদ্ধি এবং রান্নার কাজে ব্যবহৃত এলপিজি গ্যাস সরবরাহসহ স্বাবলম্বিতা ও সক্ষমতা বাড়ানোর বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বাংলাদেশে নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত এবং প্রতিনিধিদলের প্রধান মাইকেল মিলার বলেন, "ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং তাদের আশ্রয়দানকারী জনগোষ্ঠীর পাশে দাঁড়াতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। যেহেতু তাদের প্রয়োজনগুলো দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে, তাই আমাদের সাড়াদান পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং আয়বর্ধক সুযোগ সৃষ্টির ওপর গুরুত্ব দিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন আজ যে ১৪ মিলিয়ন ইউরো যুক্ত করছে, তা কক্সবাজারের স্থানীয় বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর জন্য সহায়ক হবে এবং রোহিঙ্গাদের জন্য শিক্ষার সুযোগ ও ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জনের পথ প্রশস্ত করবে। এটি মূলত শরণার্থীদের মর্যাদা রক্ষা, তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জীবন পুনর্গঠনের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে—যাতে অনুকূল পরিবেশ তৈরি হলে তারা স্বেচ্ছায়, নিরাপদে এবং মর্যাদার সাথে মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হতে পারে।"
বাংলাদেশে ইউএনএইচসিআর-এর প্রতিনিধি ইভো ফ্রেইসেন বলেন, "গত নয় বছর ধরে যারা চরম কষ্টের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, সেই পরিবারগুলোর মঙ্গলের জন্য নির্ভরযোগ্য ও অবিচল সমর্থন অত্যন্ত মৌলিক বিষয়। বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য এবং শরণার্থীদের সুরক্ষা পরিষেবা নিশ্চিত করা, মৌলিক চাহিদা মেটানো এবং একটি নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যতের আশা জাগিয়ে রাখার জন্য আমরা ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতি কৃতজ্ঞ।"
ইউএনএইচসিআর জানায়, ঘনবসতিপূর্ণ জীবনযাত্রা, সীমিত সম্পদ এবং দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির ফলে শরণার্থীরা অত্যন্ত ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। শরণার্থী শিবিরের ভেতরে নিরাপদ আশ্রয়, পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা এবং কার্যকর সুরক্ষা মেকানিজম গড়ে তোলা জরুরি। এটি বিশেষ করে নারী ও শিশুদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যারা লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা, পাচার ও শোষণের শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, এলপিজি সরবরাহের ফলে নারী ও শিশুদের লাকড়ি সংগ্রহের ঝুঁকি থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে। এটি একই সাথে পরিবারের সদস্যদের স্বাস্থ্য রক্ষা করবে এবং পার্শ্ববর্তী বনাঞ্চলের ওপর চাপ কমাবে। পাশাপাশি দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে ত্রাণের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে শরণার্থীদের মাঝে কর্মস্পৃহা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।
আগামী ২০ জুন বিশ্ব শরণার্থী দিবস পালন করা হবে। তার আগে এই সহায়তার ঘোষণাটি এল। ইউরোপীয় ইউনিয়ন মানবিক ও উন্নয়ন কর্মসূচির অন্যতম প্রধান দাতা সংস্থা হিসেবে শরণার্থীদের জন্য টেকসই সমাধান খোঁজার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে।
বর্তমানে ইউএনএইচসিআর বাংলাদেশ সরকার এবং দাতা সংস্থাগুলোর সাথে যৌথভাবে ২০২৫-২০২৬ সালের 'যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনা' বাস্তবায়নে কাজ করছে। এই বছরের পরিকল্পনায় ১২ লাখ রোহিঙ্গার অতি জরুরি চাহিদা মেটাতে ৭১০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বরাদ্দের আহ্বান জানানো হয়েছে, যাতে তারা স্বেচ্ছায় নিজ দেশে ফিরে না যাওয়া পর্যন্ত মর্যাদার সাথে বসবাস করতে পারেন।
