১,১৮৩ কোটি টাকার পিএবি-টইটং মহাসড়ক প্রকল্প: কর্ণফুলী টানেল ঘিরে নতুন অর্থনৈতিক করিডোরের আশা
পিএবি-টোইটং আঞ্চলিক মহাসড়ক উন্নয়নে ১ হাজার ১৮৩ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত এ উদ্যোগের ফলে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের মধ্যে যোগাযোগব্যবস্থা উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হবে এবং চট্টগ্রামের দক্ষিণে একটি নতুন অর্থনৈতিক করিডোর গড়ে উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মঙ্গলবার (৯ জুন) প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয়।
সড়ক ও জনপথ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সড়কটি বাস্তবায়িত হলে কর্ণফুলী টানেল হয়ে দক্ষিণ চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার ও মহেশখালীর মাতারবাড়ী পর্যন্ত একটি নতুন অর্থনৈতিক করিডোর তৈরি হবে।
এতে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়কপথের দূরত্ব প্রায় ৪০ কিলোমিটার কমবে এবং ভ্রমণ সময় প্রায় এক ঘণ্টা সাশ্রয় হবে।
কর্মকর্তারা জানান, নতুন এ রুট মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরে যাতায়াতও সহজ করবে। এটি বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত। একই সঙ্গে এই রুট ওই অঞ্চলে পরিকল্পিত অর্থনৈতিক অঞ্চল ও শিল্পকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ আরও শক্তিশালী করবে।
প্রকল্পটির মেয়াদ ধরা হয়েছে চার বছর। ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে প্রকল্পের মেয়াদ শুরু হয়ে ২০৩০ সালের জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
একনেকে অনুমোদনের পর পরবর্তী ধাপে সরকারি আদেশ (জিও) জারি, প্রকল্প পরিচালক (পিডি) নিয়োগ এবং দরপত্র প্রক্রিয়ার কাজ পর্যায়ক্রমে সম্পন্ন করা হবে।
সড়ক ও জনপথ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, কালাবিবির দিঘি থেকে মাতামুহুরী (ঈদমনি) পর্যন্ত ৫৮ দশমিক ২০ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়ন ও প্রশস্তকরণের আওতায় আনা হবে। বর্তমানে যেসব অংশের প্রস্থ ১৮ ফুট, সেগুলো ৩৪ ফুটে উন্নীত করা হবে। এতে যান চলাচল আরও নির্বিঘ্ন হবে এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
পুরো প্রকল্প বাস্তবায়নে ভূমি অধিগ্রহণকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। ভূমি অধিগ্রহণের জন্য প্রকল্পে ৩৪১ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বিশেষ করে বাঁশখালীসহ বিভিন্ন পয়েন্টে যেখানে সড়কের বাঁক প্রশস্ত করা প্রয়োজন, সেখানে ভূমি অধিগ্রহণের প্রস্তাব দেওয়া হবে। প্রকল্পের বাকি অর্থ ব্যয় হবে ভৌত অবকাঠামো ও সড়ক নির্মাণকাজে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে ঢাকা থেকে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরে পণ্য পরিবহনের জন্য কর্ণফুলী টানেল হয়ে আনোয়ারা-শিকলবাহা ওয়াই জংশন-পটিয়া বাইপাস-গাছবাড়িয়া-চকরিয়া-বদরখালী-মাতারবাড়ী রুট ব্যবহার করতে হয়।
নতুন মহাসড়কটি নির্মিত হলে যানবাহন কর্ণফুলী টানেল থেকে কালাবিবির দিঘি-বাঁশখালী-টোইটং-পেকুয়া-মাতামুহুরী হয়ে সরাসরি বদরখালী ও মাতারবাড়ীতে পৌঁছাতে পারবে। এতে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ কিলোমিটার দূরত্ব কমবে এবং অন্তত এক ঘণ্টা সময় সাশ্রয় হবে।
একইভাবে কক্সবাজারগামী যানবাহন টানেল হয়ে কালাবিবির দিঘি-বাঁশখালী-টোইটং-পেকুয়া-ঈদমনি-চকরিয়া রুট ব্যবহার করলে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরত্ব ও ৪৫ মিনিট সময় সাশ্রয় হবে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির চট্টগ্রাম বিভাগীয় আঞ্চলিক কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ মুসা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "আমরা এই প্রকল্পকে স্বাগত জানাই। এটি আমাদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে কর্ণফুলী টানেলের পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাবে। দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষ এতে ব্যাপকভাবে উপকৃত হবে।"
তিনি আরও বলেন, ঢাকা থেকে কক্সবাজারগামী পর্যটকবাহী যানবাহন যদি চট্টগ্রাম শহরে প্রবেশ না করে টানেল রুট ব্যবহার করে, তাহলে নগরীর যানজট কমবে এবং যাত্রীদের সময়ও সাশ্রয় হবে।
বাঁশখালীর মাছ ও লবণ ব্যবসায়ী আবুল কাশেম দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে পণ্য পরিবহন ও যোগাযোগব্যবস্থা অনেক উন্নত হবে। এতে এ অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য আরও গতিশীল হবে বলে আমরা আশা করছি।"
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে বাঁশখালী থেকে চট্টগ্রাম নগরে যেতে প্রায় দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা সময় লাগে। সড়কটি নির্মাণ শেষ হলে এক ঘণ্টারও কম সময়ে চট্টগ্রাম শহরে পৌঁছানো যাবে।
আনোয়ারা পেশাজীবী পরিষদের সদস্য ও ব্যাংকার এস এম মঈন উদ্দীন আজাদ দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "কর্ণফুলী টানেল নির্মাণের পরও দক্ষিণ চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার পূর্ণ সুফল পাওয়া যাচ্ছিল না। কারণ কক্সবাজারমুখী যোগাযোগব্যবস্থা এখনো পুরোনো ও দীর্ঘ পথের ওপর নির্ভরশীল। পিএবি-টোইটং সড়ক বাস্তবায়িত হলে আনোয়ারা থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক করিডোর গড়ে উঠবে এবং টানেলের প্রকৃত কার্যকারিতা নিশ্চিত হবে।"
তিনি বলেন, "একসময় এ অঞ্চলের সড়কগুলো ছিল মাত্র ১৬ থেকে ১৭ ফুট প্রশস্ত। বর্তমানে সেগুলো প্রায় ৩৮ ফুটে উন্নীত করে দুই লেনে রূপান্তর করা হচ্ছে, যা শিল্পায়ন ও বিনিয়োগের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে। এ সড়ক চালু হলে ঢাকার সঙ্গে যাতায়াতের দূরত্ব প্রায় ৫০ কিলোমিটার এবং চট্টগ্রামের সঙ্গে প্রায় ৪০ কিলোমিটার কমে আসবে।"
এস এম মঈন উদ্দীন আজাদ আরও বলেন, "টানেল নির্মিত হলেও সরু সড়ক যোগাযোগের কারণে এতদিন প্রত্যাশিত শিল্পায়ন ও আধুনিকায়ন সম্ভব হয়নি। তবে সংযোগ সড়কের কাজ শেষ হলে টানেল প্রকল্পটি পূর্ণাঙ্গ রূপ পাবে এবং ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা এর সর্বোচ্চ সুবিধা ভোগ করতে পারবেন।"
চট্টগ্রাম দক্ষিণ সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী পিন্টু চাকমা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "এটি দক্ষিণ চট্টগ্রামের বহু প্রত্যাশিত একটি প্রকল্প। বাস্তবায়ন শেষ হলে দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থায় নতুন মাত্রা যোগ হবে। পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতে সড়কটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।"
তিনি আরও বলেন, "কর্ণফুলী টানেল, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং শিল্পায়নের সম্ভাবনাকে এক সুতোয় গেঁথে দেবে পিএবি-টোইটং মহাসড়ক। ফলে দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলে নতুন বিনিয়োগ, শিল্পায়ন এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।"
