দেশি মুরগির বাজারসংযোগ নিশ্চিত হলে বদলে যেতে পারে গ্রামীণ অর্থনীতি: বিশেষজ্ঞরা
দেশি মুরগির উৎপাদন বাড়ানোর ব্যাপক সম্ভাবনা থাকলেও দুর্বল বাজারব্যবস্থা, রোগব্যাধি, মানসম্মত বাচ্চার সংকট এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের আধিপত্যের কারণে গ্রামীণ খামারিরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, উৎপাদন থেকে বিপণন পর্যন্ত একটি সমন্বিত ভ্যালু চেইন গড়ে তোলা, খামারিদের সরাসরি বাজারের সঙ্গে যুক্ত করা এবং ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে দেশি মুরগি খাত গ্রামীণ অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত হতে পারে।
রোববার রাজধানীর টিবিএস কনফারেন্স রুমে 'বিল্ডিং অ্যা রেজিলিয়েন্ট নেটিভ চিকেন ইকোনমি ইন বাংলাদেশ' শীর্ষক জাতীয় পর্যায়ের গোলটেবিল বৈঠকে এসব মতামত উঠে আসে।
হেইফার ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ ও দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এতে সরকারি কর্মকর্তা, গবেষক, পোল্ট্রি খাতের উদ্যোক্তা, উন্নয়ন সংস্থা এবং খামারি প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
গোলটেবিল বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. মুফাজ্জল হোসেন।
তিনি বলেন, দেশের মোট পোল্ট্রি জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই দেশি মুরগি এবং গ্রামীণ পরিবারের প্রায় ৭০ শতাংশ কোনো না কোনোভাবে দেশি মুরগি পালন করে। ফলে এ খাতের উৎপাদনশীলতা সামান্য বাড়ানো গেলেও জাতীয় পর্যায়ে প্রাণিজ আমিষ উৎপাদনে বড় অবদান রাখা সম্ভব।
তিনি বলেন, দেশি মুরগির রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি এবং তুলনামূলক কম খরচে পালন করা যায়। তবে নিউক্যাসল বা রানীক্ষেত রোগ, মানসম্মত বাচ্চার সংকট, ইনব্রিডিং এবং দুর্বল বাজারসংযোগ এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
তিনি আরও বলেন, "গ্রামে খামারিরা যেখানে দেশি মুরগি ৪৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করেন, সেখানে শহরে এর দাম ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত। তাই সমবায়ভিত্তিক বিপণন ব্যবস্থা, সুপারশপের সঙ্গে সংযোগ এবং সহজ ঋণসুবিধা নিশ্চিত করা গেলে খাতটি বাণিজ্যিকভাবে আরও সম্প্রসারিত হবে।"
এ লক্ষ্যে দেশি মুরগি উন্নয়নে একটি বিশেষ সরকারি প্রকল্প গ্রহণেরও আহ্বান জানান তিনি।
খামারি প্রতিনিধি ও নাটোরের বড়াইগ্রামের বাসিন্দা রোশনি আক্তার বলেন, প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তার মাধ্যমে দেশি মুরগি পালন থেকে তার আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবে বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে খাদ্যের উচ্চ মূল্য।
তিনি বলেন, বড় বস্তায় খাদ্য বিক্রি হওয়ায় ক্ষুদ্র খামারিদের খুচরা দামে কিনতে হয়, ফলে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়।
"পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করতে না পারলে ডিম উৎপাদন কমে যায় এবং লাভজনকভাবে খামার পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ে," বলেন তিনি।
ক্ষুদ্র খামারিদের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে মানসম্মত খাদ্য সরবরাহ ও বাজার সহায়তা নিশ্চিত করার দাবি জানান রোশনি আক্তার।
বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিলের (বিপিআইসিসি) সভাপতি মো. মশিউর রহমান বলেন, পোল্ট্রি খাতের টেকসই উন্নয়নের জন্য বায়োসিকিউরিটি নিশ্চিত করা এবং দেশীয় ভ্যাকসিন দ্রুত মাঠপর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া জরুরি।
তিনি বলেন, গবেষণাগারে প্রস্তুত ভ্যাকসিন দ্রুত খামারিদের কাছে পৌঁছাতে হবে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র খামারিরা সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী ভ্যাকসিনের অপেক্ষায় রয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, দেশে ডিম ও মুরগির মাংসের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। একই সঙ্গে দেশি মুরগির প্রতি ভোক্তাদের আগ্রহও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আগে সুপারমার্কেটে দেশি মুরগি সীমিত পরিসরে পাওয়া গেলেও এখন প্রায় নিয়মিত সরবরাহ রাখা হচ্ছে।
পাশাপাশি তিনি খামার নিবন্ধনের শর্ত হিসেবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শশী আহমেদ বলেন, গ্রামীণ পর্যায়ে দেশি মুরগি উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে অধিকাংশ পরিবার গড়ে ১০টি মুরগি পালন করলেও সঠিক ব্যবস্থাপনা ও সামান্য বিনিয়োগের মাধ্যমে তা ৭০ থেকে ১০০টিতে উন্নীত করা সম্ভব।
তিনি বলেন, রোগ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত টিকাদান এবং উন্নত আবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে দেশি মুরগির বাণিজ্যিকীকরণ ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সমবায়ভিত্তিক ভ্যালু চেইন গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
স্বাগত বক্তব্যে হেইফার ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর নূরুন নাহার বলেন, দেশি মুরগি খাতের টেকসই উন্নয়নের জন্য সরকার, বেসরকারি খাত, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং উন্নয়ন সংস্থাগুলোর মধ্যে শক্তিশালী অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, বিচ্ছিন্ন প্রকল্পের পরিবর্তে দেশব্যাপী দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত কর্মসূচি গ্রহণের সময় এসেছে। উৎপাদন বৃদ্ধি, বাজার ব্যবস্থার উন্নয়ন, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ এবং খাদ্য নিরাপত্তাকে সমান গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি বায়োসিকিউরিটি ও বাজার পর্যায়ে স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করতে হবে।
তার মতে, সমন্বিত উদ্যোগ ও কার্যকর নীতির মাধ্যমে দেশি মুরগি খাতে টেকসই ও নিরাপদ উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. শাহজামান খান বলেন, দেশীয় জাতের মুরগি ও অন্যান্য স্থানীয় প্রাণিসম্পদের উন্নয়নে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ।
তিনি বলেন, "একটি দেশের নিজস্ব জাত, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য যত বেশি সমৃদ্ধ হবে, সেই দেশ বিশ্বে তত বেশি মর্যাদার সঙ্গে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে।"
তিনি আরও বলেন, গবেষণার মাধ্যমে উন্নত দেশি মুরগির জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে, যা বছরে ১৪০ থেকে ১৭০টি পর্যন্ত ডিম দিতে সক্ষম। বাংলাদেশের প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ খামারি এখনো প্রান্তিক পর্যায়ের। তাই তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আয় বাড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
"উন্নত জাত, উপযুক্ত আবাসন, সুষম খাদ্য ও নিয়মিত টিকাদান—এই চারটি বিষয় নিশ্চিত করা গেলে দেশি মুরগি পালন আরও লাভজনক হবে," বলেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে হলে প্রান্তিক খামারিদের অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম করে তুলতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে দেশি মুরগি পালনকে লাভজনক ও টেকসই খাতে রূপান্তর করা সম্ভব। এ লক্ষ্যে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সব অংশীজনকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করতে চায়।
আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা দেশি মুরগি খাতের উন্নয়নে সমন্বিত নীতি সহায়তা, সম্প্রসারণ সেবা জোরদার, মানসম্মত বাচ্চা ও টিকার সহজলভ্যতা নিশ্চিতকরণ এবং সমবায়ভিত্তিক বিপণন ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তাদের মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে দেশি মুরগি খাত গ্রামীণ কর্মসংস্থান, পুষ্টি নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।
