শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর হত্যা: আদালতে সাক্ষ্য দিলেন বাবা-মা
রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যা মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন মামলার বাদী ও ভুক্তভোগী শিশুর বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা এবং মা পারভীন আক্তার।
মঙ্গলবার ঢাকার মহানগর শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালতে আসামিদের উপস্থিতিতে তারা সাক্ষ্য দেন।
জবানবন্দি দেওয়ার সময় সাক্ষীর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে অঝোরে কাঁদেন রামিসার মা পারভীন আক্তার। এ সময় আদালতের পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে।
সাক্ষ্য দিতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা। অসুস্থ বোধ করায় আদালতের অনুমতি নিয়ে তিনি চেয়ারে বসে সাক্ষ্য দেন।
আদালতে তিনি বলেন, ঘটনার দিন ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে অফিসের উদ্দেশে বাসা থেকে বের হন। ক্যান্টনমেন্ট হয়ে বনানী কাকলীতে অফিসে পৌঁছানোর পর স্ত্রী পারভীন আক্তারের ফোন পেয়ে দ্রুত বাসায় ফিরে আসেন।
বাসায় এসে তিনি দেখেন, ভবনের সামনে অনেক লোকজন জড়ো হয়েছেন। পরে তৃতীয় তলায় আসামিদের ফ্ল্যাটের সামনে গেলে তার স্ত্রী জানান, রামিসা পাশের ফ্ল্যাটের ভেতরে আটকা রয়েছে। আশপাশের লোকজন দরজা খোলার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে তা ভাঙার উদ্যোগ নেন। একপর্যায়ে ভেতর থেকে মূল দরজার লক খুলে দেন আসামি সোহেল রানার স্ত্রী স্বপ্না খাতুন।
পরে সবাই ঘরে প্রবেশ করলে তিনি টয়লেটের সামনে রক্ত দেখতে পান। স্বপ্না খাতুন তখন সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এরপর আসামিদের ব্যবহৃত কক্ষে স্টিলের খাট উঁচু করে নিজের মেয়ের বিচ্ছিন্ন মাথা দেখতে পেয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন বলে আদালতকে জানান তিনি।
পরে পুলিশ এসে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করে। এরপর তিনি থানায় গিয়ে মামলার এজাহার দায়ের করেন।
জেরা পর্বে আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মুসা কালিমুল্যাহ ঘটনার সময়, অফিস থেকে বাসায় ফিরতে কত সময় লেগেছে এবং তিনি পুরো ঘটনা নিজ চোখে দেখেছেন কি না—এমন বিভিন্ন প্রশ্ন করেন।
জবাবে আব্দুল হান্নান মোল্লা বলেন, "আমি যতটুকু দেখেছি, তা-ই বলেছি।"
আসামিদের সঙ্গে তার কোনো পূর্বশত্রুতা ছিল কি না জানতে চাইলে তিনি তা অস্বীকার করেন। সাক্ষ্য শেষে পুলিশের সহায়তায় বিমর্ষ অবস্থায় আদালত ত্যাগ করেন তিনি।
এরপর আদালতে সাক্ষ্য দেন রামিসার মা পারভীন আক্তার।
তিনি জবানবন্দিতে বলেন, ঘটনার দিন সকালে তিনি রান্নার কাজ করছিলেন। বড় মেয়ে রাইসাকে ছোট মেয়ে রামিসাকে নিয়ে চাচার বাসায় যেতে বলেন। রান্নাঘরে বসে দুই বোনের কথাবার্তা শুনতে পেলেও কিছুক্ষণ পর আর কোনো শব্দ না পেয়ে তিনি ধারণা করেন তারা চলে গেছে।
এর মধ্যে তিনি একটি চিৎকারের শব্দ শুনতে পান, তবে সেটি দূর থেকে এসেছে বলে মনে হয়েছিল। কিছুক্ষণ পর গেটের সামনে গিয়ে দেখেন দরজা খোলা। পরে বড় মেয়ে ফিরে এলে রামিসার খোঁজ না পেয়ে ভবনের বিভিন্ন তলায় খোঁজাখুঁজি শুরু করেন।
একপর্যায়ে তৃতীয় তলায় আসামিদের ফ্ল্যাটে গিয়ে বারবার দরজায় ধাক্কা দিলেও কেউ দরজা খুলছিল না।
তিনি বলেন, দরজার নিচে রামিসার জুতা দেখতে পান। এরপর চিৎকার শুরু করলে ভবনের অন্য বাসিন্দারা জড়ো হন। একই সঙ্গে তিনি তার স্বামীকেও ফোন করেন।
আশপাশের লোকজন উঁকি দিয়ে কিছু দেখতে না পেলেও রাজু নামে এক যুবক ভিডিও করলে দেখা যায়, ভেতরে স্বপ্না খাতুন হাঁটাহাঁটি করছেন।
একপর্যায়ে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকার পর বাথরুমে রক্ত দেখতে পান সবাই। পারভীন আক্তার বলেন, তিনি বারবার স্বপ্না খাতুনকে দরজা খুলতে বললেও তিনি দরজা খোলেননি।
পরে পুলিশ এসে রক্তাক্ত অবস্থায় মরদেহ উদ্ধার করে।
আদালতে কাঠগড়ায় থাকা স্বপ্না খাতুনকে দেখিয়ে পারভীন আক্তার বলেন, "ওরে ওই সময় বলছি, বোন দরজা খুলে দে।"
এ ছাড়া আসামি সোহেল রানাকে দেখিয়ে তিনি বলেন, "ধর্ষণ ও হত্যাও করেছে।"
আসামিপক্ষের আইনজীবীর প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সোহেল রানা হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন এবং তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুন তাকে সহযোগিতা করেছেন।
এ ছাড়া সোহেল রানা গ্রিল কেটে পালিয়ে গেছেন বলে আশপাশের লোকজনের কাছে শুনেছেন বলেও আদালতকে জানান তিনি।
