ঈদে ঢাকায় ৫১,০০০ টন বর্জ্য অপসারণ: সক্ষমতা বাড়লেও নির্ভরতা আউটসোর্সিং কর্মীদের ওপর
ঈদুল আজহার তিন দিনে রাজধানী ঢাকা থেকে ৫১ হাজার টনের বেশি কোরবানির বর্জ্য অপসারণ করেছে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন।
স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি বর্জ্যের চাপ সামাল দিতে প্রায় ২৪ হাজার কর্মী এবং কয়েক হাজার যানবাহন মাঠে নামানো হয়।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) তথ্য অনুযায়ী, তিন দিনে তারা ৩২ হাজার ৬৬২ টন কোরবানির বর্জ্য অপসারণ করেছে। অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) জানিয়েছে, একই সময়ে তারা ১৮ হাজার ৩৪৪ টন বর্জ্য অপসারণ করেছে।
তবে এই বিশাল কর্মযজ্ঞের আড়ালের চিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, দুই সিটির বর্জ্য ব্যবস্থাপনার একটি বড় অংশ এখনো আউটসোর্সিং শ্রমিক এবং বেসরকারিভাবে পরিচালিত সংগ্রহব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল—যা ভবিষ্যতে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ঈদে বর্জ্য অপসারণে বিপুল জনবল ও যানবাহন মোতায়েন
ঢাকা দক্ষিণ সিটির তথ্য অনুযায়ী, তাদের নিজস্ব পরিচ্ছন্নতাকর্মী আছেন ৪ হাজার ৯৫০ জন। ঈদের সময় বর্জ্য অপসারণে মোট ১৩ হাজারের বেশি কর্মী যুক্ত করা হয়েছিল, যার মধ্যে প্রায় ৮ হাজার জন আউটসোর্সিং, বাসাবাড়ির বর্জ্য সংগ্রহকাজে নিয়োজিত এবং অনানুষ্ঠানিক শ্রমিক। এ ছাড়া বর্জ্য অপসারণে ২ হাজার ১১৭টি যানবাহন মোতায়েন করা হয়।
ঢাকা উত্তর সিটিতে ঈদের সময় বর্জ্য অপসারণে প্রায় ১১ হাজার জনবল মাঠে কাজ করেছে। এর মধ্যে নিজস্ব আড়াই হাজারের বেশি কর্মী থাকলেও বাকি বড় অংশই আউটসোর্সিং ও ভাড়াকৃত যানবাহনের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিক।
উত্তর সিটি করপোরেশন প্রায় ৭০০টি যানবাহন মোতায়েন করে। এর মধ্যে নিজস্ব বহরের প্রায় ৩৫০টি যানবাহনের পাশাপাশি প্রায় ৪০০টি ভাড়াকৃত পিকআপ ট্রাক ছিল।
স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কয়েক গুণ বেড়েছে বর্জ্যের পরিমাণ
ডিএসসিসির তথ্য অনুযায়ী, স্বাভাবিক সময়ে দক্ষিণ সিটি এলাকায় প্রতিদিন গড়ে ৩ হাজার ২০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ টন বর্জ্য অপসারণ করা হয়। সেই হিসাবে ঈদের প্রথম দিনেই বর্জ্যের পরিমাণ স্বাভাবিক দিনের তুলনায় চার গুণেরও বেশি ছিল।
তবে ব্যাপক জনবল ও যানবাহন মোতায়েনের পরও পরিচালনাগত বিশ্লেষণে দেখা যায়, দুই সিটি করপোরেশনই এখনো আউটসোর্সিং শ্রমিক এবং বেসরকারিভাবে পরিচালিত বর্জ্য সংগ্রহব্যবস্থার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অতিরিক্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা আরিফুর রহমান টিবিএসকে জানান, ঈদের প্রায় দেড় থেকে দুই মাস আগে থেকেই প্রস্তুতি শুরু করা হয়।
তিনি বলেন, "আমাদের বর্জ্য অপসারণের যথেষ্ট সক্ষমতা ও পূর্বপরিকল্পনা ছিল। তবে চ্যালেঞ্জও ছিল উল্লেখযোগ্য। ঈদের ছুটির কারণে অতিরিক্ত শ্রমিক পাওয়া কঠিন ছিল। পাশাপাশি নির্ধারিত সীমানার বাইরে পশুর হাট ছড়িয়ে পড়ায় অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়।"
তিনি আরও বলেন, বাসাবাড়ির বর্জ্য সংগ্রহকারী ভ্যানসেবাগুলো সিটি করপোরেশনের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে না থাকায় অনেক এলাকায় নিয়মিত বর্জ্য জমে থাকে, যা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়।
"তবে আমরা পদক্ষেপ নিয়েছি, যাতে ভবিষ্যতে আরও ভালোভাবে এ কার্যক্রম সম্পন্ন করা যায়," যোগ করেন তিনি।
দীর্ঘমেয়াদি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সংস্কারের দাবি
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মাহবুব রহমান টিবিএসকে জানান, অনেকেই ঈদের দিন নিয়মিত কাজের পরিবর্তে অন্য কাজে যুক্ত হয়ে পড়েন। এতে কার্যত বড় ধরনের জনবল ঘাটতি তৈরি হয়।
তিনি বলেন, "ফলে প্রায় ৬ হাজার কর্মীর ঘাটতি তৈরি হয়। আমরা মাঠে থেকে এবং সিআইসিওর মাধ্যমে মনিটর করেছি। কিন্তু এত বড় এলাকায় শুধু মনিটরিং দিয়ে শতভাগ ফল পাওয়া কঠিন।"
মাহবুব রহমানের মতে, নিজস্ব জনবল বাড়ানো গেলে পুরো ব্যবস্থাপনা আরও নিয়ন্ত্রিত ও চাপমুক্তভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হতো।
এবার উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলিয়ে ২৩টি পশুর হাট পরিচালিত হয়েছে। তবে এর বাইরে অবৈধ ও নির্ধারিত সীমানার বাইরে হাট বসায় অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়।
নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, জনসংখ্যা ও কোরবানির পশুর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বর্জ্যের চাপও বাড়ছে। তাই দীর্ঘমেয়াদে শুধু অস্থায়ী ব্যবস্থা নয়, নিজস্ব জনবল বৃদ্ধি, আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজন এবং ট্রান্সফার স্টেশন শক্তিশালী করা জরুরি।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনার স্থায়ী সমাধানে আধুনিক প্রযুক্তি ও নাগরিক সম্পৃক্ততার ওপর জোর দিয়ে নগর পরিকল্পনাবিদ আদিলুর রহমান খান বলেন, "সারা বছর একটি পরিচ্ছন্ন নগরী বজায় রাখতে হলে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা ও কমিউনিটিভিত্তিক নজরদারি নিশ্চিত করা জরুরি। সিসিটিভি ক্যামেরা ও স্যাটেলাইট ইমেজ ব্যবহার করে অনানুষ্ঠানিকভাবে বর্জ্য ফেলার স্থানগুলো চিহ্নিত করতে হবে। পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দাদের নিয়ে কমিটি গঠন করা যেতে পারে, যারা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অনিয়ম দ্রুত সিটি করপোরেশনকে জানাবে।"
তিনি আরও বলেন, "শুধু সিটি করপোরেশনের ওপর নির্ভর না করে নাগরিক পর্যায়ে দায়িত্ববোধ তৈরি করতে হবে। প্রতিটি পরিবার বা হোল্ডিং মালিককে তাদের আশপাশের পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে সামাজিকভাবে দায়বদ্ধ করা উচিত।"
"একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সফল মডেলগুলোর মতো নিয়মিত কমিউনিটি ক্লিনআপ কার্যক্রম চালু করা গেলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সমাধান পাওয়া সম্ভব," যোগ করেন তিনি।
