সামরিক-বেসামরিক সুসম্পর্ক ছাড়া শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠন অসম্ভব: ডিসি সম্মেলনে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা
একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক ও শক্তিশালী রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সুসম্পর্কের (সিভিল-মিলিটারি রিলেশন) ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের উপদেষ্টা (প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদা) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, 'যে রাষ্ট্রের সিভিল-মিলিটারি সম্পর্কে ফাটল থাকে, সেই রাষ্ট্রব্যবস্থা কখনো স্থায়ী হয় না।'
মঙ্গলবার (০৫ মে) রাজধানীতে আয়োজিত জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলনে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনীর প্রধানগণ, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার এবং প্রতিরক্ষা সচিব উপস্থিত ছিলেন।
ডিসিদের উদ্দেশে দেওয়া দীর্ঘ বক্তব্যে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা বর্তমান সরকারের প্রতিরক্ষা নীতি, জাতীয় নিরাপত্তার বহুমুখী রূপ এবং বিগত স্বৈরাচারী সরকারের রেখে যাওয়া চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা প্রদান করেন।
সশস্ত্র বাহিনী জনগণের বাহিনী
১৯৭১ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণার মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের যাত্রার কথা স্মরণ করে ড. শামছুল ইসলাম বলেন, সশস্ত্র বাহিনী এ দেশের জনগণেরই বাহিনী। তিনি বলেন, 'ঘূর্ণিঝড় বা অন্য যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে তারা জনগণের আস্থার প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি দেশের অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে দেশপ্রেমিক সামরিক বাহিনী রাজনৈতিক সমাধানের জন্য বেসামরিক প্রশাসনের ওপর আস্থা রেখে একটি ঐতিহাসিক নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করেছে।'
উপদেষ্টা উল্লেখ করেন যে, একটি অসাধু চক্র নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে সশস্ত্র বাহিনীকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এই মধুর সম্পর্কে ফাটল ধরার চেষ্টা করলেও তারা সফল হতে পারেনি।
জাতীয় নিরাপত্তার নতুন মাত্রা ও 'টোটাল পিপল ওয়ার'
নিরাপত্তা ব্যবস্থা এখন আর শুধু ভৌগোলিক অখণ্ডতা বা প্রচলিত যুদ্ধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই উল্লেখ করে উপদেষ্টা বলেন, 'সাইবার হামলা, জলবায়ু পরিবর্তন, মহামারি, তথ্যযুদ্ধ এবং অর্থনীতিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার মতো বহুমাত্রিক হুমকি এখন আমাদের নিরাপত্তার বড় অংশ।'
তিনি জানান, বর্তমান সরকার শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের 'টোটাল পিপল ওয়ার' বা সর্বাত্মক জনযুদ্ধের ধারণাকে পুনরায় সক্রিয় করছে। এর অংশ হিসেবে খুব শিগগিরই বিএনসিসি এবং আনসার-ভিডিপিকে সমন্বিত করে একটি কার্যকর প্রতিরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলার রূপরেখা বাস্তবায়িত হবে। একইসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তোলার মাধ্যমে একটি শক্তিশালী 'ক্রেডিবল ডিটারেন্স' বা বিশ্বাসযোগ্য প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরির কাজ এগিয়ে চলছে বলেও তিনি জানান।
শব্দচয়নে সতর্ক থাকার আহ্বান
বিগত ১৫ বছরে বাংলাদেশের ওপর চাপিয়ে দেওয়া কিছু পশ্চিমা বা বিদেশি পরিভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসকদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানান প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা। তিনি বলেন, 'টেররিজম, এক্সট্রিমিজম বা র্যাডিকালিজমের মতো শব্দগুলো বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর সাথে যায় না। বাংলাদেশ একটি সহনশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ, যেখানে এক গ্রামে মসজিদ ও মন্দির পাশাপাশি অবস্থান করে। তাই এই শব্দগুলো ব্যবহারের ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে ব্যক্তিগতভাবে সাবধানতা অবলম্বনের অনুরোধ করছি।'
সৈনিকদের প্রতি সংবেদনশীলতা
সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের 'ইউনিফর্ম পরিহিত নাগরিক' হিসেবে আখ্যায়িত করে তাদের প্রতি বেসামরিক পরিমণ্ডলে যথাযথ সম্মান প্রদর্শনের আহ্বান জানান উপদেষ্টা। তিনি ডিসিদের উদ্দেশে বলেন, 'সৈনিকরা সমাজের স্বাভাবিক জীবন ছেড়ে কঠোর শৃঙ্খলার জীবন বেছে নেন। আপনারা আপনাদের অবস্থান থেকে তাদের প্রতি সংবেদনশীল হলে এবং তাদের কাজগুলো নিয়মের মধ্যে থেকে সহজ করে দিলে তারা সম্মানিত বোধ করবেন, যা জাতীয় নিরাপত্তার জন্যই ইতিবাচক হবে।'
দুর্নীতিতে জিরো টলারেন্স ও ফ্যাসিবাদের পুনরাবৃত্তি রোধ
বিগত ১৭ বছরের ফ্যাসিস্ট শাসন এবং পরবর্তী দেড় বছরের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রেখে যাওয়া 'কৃত্রিম ক্ষত' গুলোর কথা উল্লেখ করে ড. শামছুল ইসলাম বলেন, 'ফ্যাসিস্ট সরকার যেভাবে আমাদের বাহিনীগুলোকে ধ্বংস করেছে, আমরা তার উল্টো পথে হাঁটব। এটাই আমাদের মূল লক্ষ্য।'
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের দুর্নীতি বিরোধী 'জিরো টলারেন্স' নীতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি ডিসিদের কঠোরভাবে সতর্ক করেন। তিনি বলেন, 'যদি নিজের স্বার্থ, দুর্নীতি এবং অপকর্মের সাথে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন, তবে আপনারা আমাদের সহযাত্রী হতে পারবেন না।'
সবশেষে তিনি প্রধানমন্ত্রীর মূল দর্শন— 'সবার আগে বাংলাদেশ' নীতি ধারণ করে একটি বিভাজনমুক্ত, ঐক্যবদ্ধ ও স্থিতিশীল রাষ্ট্র গঠনে সবাইকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান।
