ক্রয় জটিলতায় গভীর হচ্ছে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সংকট, বাড়ছে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের ঝুঁকি
দেশজুড়ে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর তীব্র সংকট দেখা দেওয়ায় অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের ঝুঁকি বাড়ছে। এতে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, ২০২৪ সালের জুলাই থেকে পঞ্চম স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি সেক্টর কর্মসূচি (এইচপিএনএসপি) অনুমোদন না হওয়া এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সেক্টর প্রোগ্রাম থেকে বেরিয়ে আসার কারণে জন্মনিয়ন্ত্রণ উপকরণ কেনার কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এতে সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের ভাঙন তৈরি হয়েছে।
অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত দেশের অন্তত ৩৯৪টি উপজেলায় সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত জন্মনিরোধক পদ্ধতি কনডম পুরোপুরি স্টক-আউট রয়েছে।
একই সঙ্গে কোনো উপজেলাতেই ইমপ্ল্যান্ট নেই। ৩৩৫টি উপজেলায় ওরাল পিল এবং ৩৯৫টি উপজেলায় আইইউডির মজুত শেষ হয়ে গেছে।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মাঠকর্মীরা কনডম, ওরাল পিল, আইইউডি, ইনজেকশন ও ইমপ্ল্যান্ট—এই পাঁচ ধরনের জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি বিনামূল্যে সরবরাহ করেন। কিন্তু দুই বছরের বেশি সময় ধরে কেনাকাটা বন্ধ থাকায় উপজেলা ও মাঠপর্যায়ে মজুত প্রায় শেষ। অনেক জায়গায় চাহিদার তুলনায় ১০ শতাংশেরও কম সরবরাহ দেওয়া হয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, ৫১টি উপজেলা স্টক-আউটের ঝুঁকিতে রয়েছে। মাত্র ১৪টিতে পর্যাপ্ত মজুত আছে, ৯টিতে কম মজুত এবং ২৬টিতে অতিরিক্ত মজুত রয়েছে। গত বছরের এপ্রিল মাসে যেখানে সরবরাহ ছিল ৪ লাখ ৫৯ হাজার, তা কমে এ বছরের মার্চে দাঁড়িয়েছে ৫০ হাজারে।
ওরাল পিলের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। ৩৩৫টি উপজেলায় মজুত নেই, ৯৩টি স্টক-আউটের ঝুঁকিতে। মাত্র ১৯টিতে পর্যাপ্ত সরবরাহ, ২৬টিতে কম এবং ২১টিতে অতিরিক্ত মজুত রয়েছে। ইনজেকশন ও ইমপ্ল্যান্টের মজুত তিন মাসেরও কমে নেমে এসেছে, আর আইইউডির মজুত তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে রয়েছে।
মাঠ পর্যায়ে প্রভাব পড়ছে
মাঠ পর্যায়ে এর প্রভাব পড়ছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। দীর্ঘদিনের সংকটে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ বেড়েছে। অনেক নারী ইমপ্ল্যান্ট বা দীর্ঘমেয়াদি পদ্ধতি খুলে ফেললেও বিকল্প পাচ্ছেন না, ফলে তারা অরক্ষিত অবস্থায় পড়ছেন। দরিদ্র জনগোষ্ঠী বাজার থেকে কিনেও ব্যবহার করতে পারছেন না, এতে পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে।
সাতক্ষীরার তালা উপজেলার পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা কামাল হোসেন বলেন, প্রায় দেড় থেকে দুই বছর ধরে ক্রয় কার্যক্রম স্থবির। সেক্টর প্রোগ্রাম বন্ধ থাকায় নতুন কোনো সরবরাহ আসেনি, ফলে ধীরে ধীরে সংকট তৈরি হয়েছে।
তিনি জানান, "শুরুতে কেন্দ্রীয় মেডিকেল স্টোরস ডিপোর সীমিত মজুত থেকে রেশনিং করে সরবরাহ দেওয়া হলেও এখন পরিস্থিতি চরমে। গত ছয়-সাত মাস ধরে প্রায় কিছুই নেই। আমাদের উপজেলায় চাহিদার ১০ শতাংশেরও কম সরবরাহ পেয়েছি, যা দিয়ে সর্বোচ্চ দুই মাস চলা সম্ভব হয়েছে।"
কামাল হোসেন বলেন, এই সংকটের সরাসরি প্রভাব প্রজনন হারে পড়ছে। "অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ বেড়েছে। আমাদের এলাকায় মোট প্রজনন হার বাড়ছে, যা আগে নিয়ন্ত্রণে ছিল।"
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘমেয়াদি জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। যেসব নারীর ইমপ্ল্যান্টের মেয়াদ শেষ হচ্ছে, তাদের নতুন কোনো পদ্ধতি দেওয়া যাচ্ছে না, ফলে তারা সম্পূর্ণ অরক্ষিত হয়ে পড়ছেন।
মাঠপর্যায়ের কর্মীদের কাজেও এর প্রভাব পড়ছে বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, "আমাদের কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে সেবা দেন। কিন্তু হাতে কোনো সামগ্রী না থাকলে তাদের গ্রহণযোগ্যতা কমে যায়। মানুষ বাজার থেকে কিনে দীর্ঘদিন ব্যবহার করতে পারছে না, ফলে অনেকেই কোনো পদ্ধতি ব্যবহার না করে ঝুঁকিতে থাকছেন। দ্রুত মাঠপর্যায়ে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ কমানো সম্ভব হবে। তা না হলে আগের অবস্থায় ফিরতে আরও বেশি পরিশ্রম করতে হবে।"
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. আশরাফী আহমেদ বলেন, জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সংকট কাটাতে জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, "আগামী মে মাসের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে নতুন সরবরাহ পৌঁছাতে পারে।"
তিনি জানান, গত অর্থবছরে পূর্বের কিছু বিল পরিশোধ করা হয়েছে এবং বর্তমানে নতুন করে ক্রয় প্রক্রিয়া চলছে। কনডমসহ কিছু সামগ্রী এ মাসেই আংশিকভাবে মাঠপর্যায়ে পৌঁছাবে। এছাড়া প্রয়োজনীয় ওষুধ ও ডেলিভারি কিটও কেনা হয়েছে।
ডা. আশরাফী আহমেদ বলেন, সেক্টর প্রোগ্রাম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে এবং এটি পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে।
তিনি বলেন, "বর্তমানে ক্রয় প্রক্রিয়া চলছে এবং নতুন সরকার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করতে আমরা কাজ করছি, যাতে মাঠপর্যায়ে পরিবার পরিকল্পনা সেবার গতি আবার ফিরে আসে।"
আমরা কি পিছনের দিকে যাচ্ছি?
জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য সাফল্য রয়েছে। স্বাধীনতার সময়ে একজন প্রজননক্ষম নারী গড়ে ছয়টির বেশি সন্তানের জন্ম দিতেন। বর্তমানে গড়ে একজন মা দুটি সন্তানের জন্ম দিচ্ছেন। এটি সম্ভব হয়েছে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর ব্যবহার বৃদ্ধির কারণে।
তবে এক দশকের বেশি সময় মোট প্রজনন হার ২ দশমিক ৩-এ স্থির থাকলেও এখন তা বেড়ে ২ দশমিক ৪-এ দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহারের হার ৬২ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে কমে ৫৮ দশমিক ২ শতাংশে নেমে এসেছে। আধুনিক পদ্ধতির চাহিদা পূরণের হারও কমেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর ঘাটতি তৈরি হওয়ায় অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ ও প্রজনন স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিনামূল্যে সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ময়নুল ইসলাম বলেন, "পরিবার পরিকল্পনা সেবার মূল ভিত্তি হলো সহজলভ্যতা। জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী বিনামূল্যে পাওয়া না গেলে দরিদ্র মানুষ এগুলো কিনে ব্যবহার করতে পারে না। তখন অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ, এমনকি কিশোরী গর্ভধারণের ঝুঁকি বাড়ে।"
তিনি বলেন, "এর প্রভাব শুধু জন্মহারে সীমাবদ্ধ থাকবে না। মাতৃস্বাস্থ্য, শিশুস্বাস্থ্য ও সামগ্রিক প্রজনন স্বাস্থ্যে এর প্রভাব পড়বে। অনিরাপদ যৌন আচরণের কারণে যৌনবাহিত রোগের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।"
অধ্যাপক ময়নুল ইসলাম জানান, দেশে 'আনমেট নিড' ইতোমধ্যে বেড়েছে, যা ২০৩০ সালের মধ্যে শূন্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্য ছিল।
তিনি বলেন, "এখন দেখা যাচ্ছে, আনমেট নিড বাড়ছে, জন্মনিয়ন্ত্রণ ব্যবহার কমছে এবং প্রজনন হার বাড়ছে—এটি উদ্বেগজনক পরিস্থিতি। আমরা পিছনের দিকে যাচ্ছি কিনা সেটি বড় প্রশ্ন।"
তিনি মনে করেন, এই সংকট কাটাতে শুধু সরবরাহ বাড়ালেই হবে না; পরিবার পরিকল্পনা কৌশলের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন জরুরি। লক্ষ্যভিত্তিক পরিকল্পনা, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সেবার সহজলভ্যতা নিশ্চিত না করলে অর্জিত সাফল্য ধরে রাখা সম্ভব হবে না।
